বাংলার বিভিন্ন দলের কোচ বাছাইয়ের জন্য এ বছর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের ধাঁচে যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা সিএবি, তা নিয়ে সংস্থার অন্দরমহলেই ছিল অনেক প্রশ্ন। রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে বাংলার সিনিয়র দলের পাশাপাশি অনূর্ধ্ব ২৩, অনূর্ধ্ব ১৯, অনূর্ধ্ব ১৬ ও মহিলাদের দলের কোচ ও সাপোর্ট স্টাফ, ফিজিও, ট্রেনার পদেও আবেদনপত্র চাওয়া হয়। শোনা গিয়েছিল প্রায় ৮০ জন আবেদন করেছিলেন এবং সেই আবেদনকারীদের মধ্যে নাকি ছিলেন বিদেশি কোচেরাও!
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিনিয়র দলের জন্য সেই লক্ষ্রীরতন শুক্লাকেই বেছে নেওয়া হয়, যিনি এর আগেও বাংলার কোচের দায়িত্বে ছিলেন। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এত দেশীয়-বিদেশি কোচের আবেদন পাওয়া সত্ত্বেও কেন সেই লক্ষ্মীর ওপরই আস্থা রাখল সিএবি? সংস্থার সভাপতি ও প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যোগ্যতা ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে লক্ষ্মীই এগিয়ে ছিলেন। সে জন্যই বাংলার সিনিয়র দলের কোচের পদে তাঁকেই বহাল রাখা হয়।
‘দৈনিক স্টেটসম্যান’-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সৌরভ এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘লক্ষ্ণী গত বছর কোচ হিসেবে ভাল কাজ করেছে। ওর প্রশিক্ষণেই বাংলা গত বছর অপরাজিত থেকে রনজি ট্রফি সেমিফাইনালে খেলেছে। সেমিফাইনালে শুধুমাত্র একটা ইনিংসে পিছিয়ে যাওয়ার জন্য পুরো টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যেতে হয় আমাদের। এর পরে তো কাউকে সরিয়ে দেওয়া যায় না। আমি লক্ষ্মীকে কাছ থেকে দেখেছি। ও খুব পরিশ্রমী। দলের খেলোয়াড়দেরও ও খুব পরিশ্রম করায়, যেটা এই স্তরের ক্রিকেটে খুবই জরুরি। এ রকম একজনকে হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়া যায় না। তাই ওকেই বহাল রাখা হয়েছে’।
লক্ষ্মীরতন গত চার মরশুম ধরেই বাংলার কোচ হিসাবে যুক্ত ছিলেন। গত মরসুমে বাংলাকে রনজির সেমিফাইনালে তুলেছিলেন লক্ষ্মী। এর আগেও ২০২২-২৩ মরসুমে এই প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার ও প্রাক্তন বঙ্গ অধিনায়কের কোচিংয়ে রনজি ট্রফির ফাইনাল খেলেছিল বাংলা দল।
গত মরসুমে অনূর্ধ্ব ২৩ বাংলাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া ঋদ্ধিমান সাহাকেও সেই দলেরই কোচের পদে রাখা হয়। তবে অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচ করা হয় মনোজ তিওয়ারিকে এবং অনূর্ধ্ব ১৬ বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয় অনুষ্টুপ মজুমদারকে।
লক্ষ্মী ও ঋদ্ধিকে যখন বহাল রাখাই হল, তা হলে বিসিসিআই-এর ধাঁচে কোচের পদের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল কেন, জানতে চাইলে সৌরভ বলেন, ‘অন্যান্য বয়সভিত্তিক দলগুলোর হেড কোচ ও সহকারী কোচ বাছাইয়ের জন্য। এর আগে ঋদ্ধি, সৌরাশিস, অরুণলালদের সরাসরি বলে দেওয়া হত তোমরা দায়িত্ব নাও। কিন্তু এটা সঠিক প্রক্রিয়া নয়। বিসিসিআই, ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড এই প্রক্রিয়ায় কোচ বাছাই করে।
এর ফলে কারা কোচ হতে চায়, কারা আগ্রহী, কাদের যোগ্যতা কী রকম, তা জানা যায়। এই প্রক্রিয়া খুব স্বচ্ছ। বাইরে থেকে, এমনকী ফুটবল জগতে কাজ করা অনেকেই আবেদন করেছিল। সাপোর্ট স্টাফ বাছাই করেছে জাতীয় দলের ফিজিও কমলেশ জৈন। এনসিএ-র স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচও বাছাই প্রক্রিয়ায় ছিল। আমার মনে হয়েছে এই প্রক্রিয়াটাই সবচেয়ে কার্যকরী ও স্বচ্ছ’।
বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক মনোজ তিওয়ারিকে অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনি প্রথমে এই দায়িত্ব নিতে চাননি বলে জানান সিএবি সভাপতি। বলেন, ‘যখন মনোজকে অনূর্ধ্ব ১৯ কোচ বাছা হয়, তখন প্রথমে ও এই দায়িত্ব নিতে চায়নি। কিন্তু ওকে বোঝাই, আমাদের সবচেয়ে বড় ফোকাস রয়েছে জুনিয়র লেভেলে। আর মনোজ একজন অসাধারণ ক্রিকেটার। ওর হাতেই জুনিয়র ক্রিকেটাররা ভাল তৈরি হবে। তবেই তো ওরা পাঁচ-ছ’বছর পরে রঞ্জি ট্রফিতে গিয়ে ভাল পারফরম্যান্স করতে পারবে’।
মনোজকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে সৌরভের আরো যুক্তি, ‘যে কোনও বড় ক্রিকেটারই অনূর্ধ্ব ১৯ থেকে উঠে এসেছে, সে আমার কথাই বলুন বা বিরাট কোহলি, শচীন তেন্ডুলকর, রাহুল দ্রাবিড়, অনিল কুম্বলে- প্রত্যেকেই। তাই এই বয়সের ক্রিকেটারদের যদি একজন সেরা গাইড দেওয়া না হয়, তা হলে ওরা সিনিয়র লেভেলে গিয়ে ভাল খেলতে পারবে না। মনোজের চেয়ে ভাল কোচ আর কে হতে পারে’?
সিএবি-র নতুন ‘ভিশন ২০২৮’ প্রকল্পের সঙ্গেও এই কোচেরা সারা বছর যুক্ত থাকবেন বলে জানান সৌরভ। বলেন, ‘যে ছ’জন হেড কোচকে বাছা হয়েছে, তারা সবাই এই প্রকল্পে জড়িত থাকবে।সবার মধ্যেই যোগাযোগ থাকবে। এরা সবাই মিলে বসে ঠিক করবে বাংলার ক্রিকেটকে কী ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে’।
মনোজকে এই প্রকল্পে ব্যাটিংয়ের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়ে দেন সৌরভ। বলেন, ‘ওর সঙ্গে আমাদের ১২ মাসের চুক্তি রয়েছে। অনূর্ধ্ব ১৯ মরসুম শেষ হওয়ার পর ও ভিশনে ব্যাটসম্যানদের প্রশিক্ষণ দেবে। যখন অনূর্ধ্ব ১৬ দলের প্রস্তুতি শিবির হবে, তখন সেখানে উৎপল থাকবে’। এভাবেই বাংলার ক্রিকেটকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছেন বাংলার ক্রিকেট প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা সৌরভ।




