• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 30 June, 2026

বাঁধবাঙা উচ্ছ্বাস ‘জায়ান্ট কিলার’-দের দুই শিবিরে, জাতীয় ছুটি প্যারাগুয়েতে, ফের ফ্রান্স-ম্যাচের দিকে তাকিয়ে মরক্কো

তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ এই বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক কানাডাকে মরক্কো হারাতে পারলে এবং ফ্রান্স যদি সুইডেন ও পরে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছয়, তাহলে শেষ আটে ফের ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে তারা।

বাঁধবাঙা উচ্ছ্বাস ‘জায়ান্ট কিলার’-দের দুই শিবিরে, জাতীয় ছুটি প্যারাগুয়েতে, ফের ফ্রান্স-ম্যাচের দিকে তাকিয়ে মরক্কো

অবিশ্বাস আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে তখন ভাসছে গোটা প্যারাগুয়ে। বরফ-শীতল স্নায়ু বজায় রেখে জোরালো শটে জালে জড়িয়ে দেন হোসে কানালে। এই গোলেই সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনটি ঘটিয়ে ফেলে প্যারাগুয়ে। টাইব্রেকারে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নেয় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।

শেষ পেনাল্টি কিক জালে জড়াতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা। সবাই দৌড়ে যান ম্যাচজয়ী ডিফেন্ডার হোসে কানালের দিকে। তারপর আনন্দে একসঙ্গে জড়ো হয়ে সেলিব্রেশনে মেতে ওঠেন। মুহূর্তটি হয়ে থাকে প্যারাগুয়ের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা।

স্টেডিয়ামে উপস্থিত সব প্রজন্মের প্যারাগুয়ে সমর্থকরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। অনেকের চোখ বেয়ে নেমে আসে আনন্দাশ্রু। চারদিকে শুধু ধ্বনিত হতে থাকে, ‘ভামোস!’ (চলো এগিয়ে যাই)।

দু’ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে টানটান উত্তেজনা ও বিতর্কে ভরা দ্বৈরথের পর অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখায় ‘লা আলবিরোহা’। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ৪১ নম্বরে ছিল প্যারাগুয়ে। জার্মানির চেয়ে ৩১ ধাপ পিছিয়ে। তারাই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা শক্তিকে বিদায়ের রাস্তা দেখিয়ে দিল!

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ম্যাচপ্রতি গড়ে মাত্র ০.৭৮ গোল করা দলটি, যা মূলপর্বে ওঠা দলগুলোর মধ্যে যৌথভাবে সর্বনিম্ন, তাদের অদম্য লড়াই আর দৃঢ় মানসিকতার কাছে ২০১৪-র পর এই প্রথম বিশ্বকাপ নকআউট ম্যাচেই জার্মানিকে হার মানতে হয়। তৈরি হয় এক নতুন ইতিহাস। এই ঐতিহাসিক জয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশের প্রেসিডেন্ট জাতীয় ফুটবল দলের এই সাফল্য উদ্‌যাপনে আরও একটি জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেন।

বোস্টন স্টেডিয়ামের বাইরে পরিবারের সঙ্গে উপস্থিত ১৬ বছর বয়সি এক প্যারাগুয়ে সমর্থক বলেন, “আমাদের দেশের জন্য এই জয়ের অর্থ বিশাল। অনেকেই আমাদের নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আমরা সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছি। সারা বিশ্বে খুব বেশি মানুষ জানত না প্যারাগুয়ে কী বা কারা। এখন সবাই প্যারাগুয়েকে চিনবে!”

প্যারাগুয়ের ডিফেন্ডার গুস্তাভো গোমেজ বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা যা অনুভব করছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই খুব কঠিন। আমি আমার সতীর্থদের নিয়ে, পুরো দলকে নিয়ে ভীষণ গর্বিত। আমাদের আরও অন্তত একটি ম্যাচ খেলার অধিকার ছিল, আর আমরা সেই অধিকার অর্জন করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “প্যারাগুয়ে দল হিসেবে আমাদের আসলে ঠিক কেমন, সেটাই প্রমাণ করার ছিল আমাদের। জার্মানি জানত, এই ম্যাচটা তাদের পক্ষে মোটেই সহজ হবে না। ওরা জানত, আমরা হার এড়াতে শেষ পর্যন্ত লড়াই করব। এই জয় আমরা প্যারাগুয়ের প্রতিটি মানুষের উদ্দেশে উৎসর্গ করলাম।”

এটাই যেন এখন গুস্তাভো আলফারোর প্যারাগুয়ের পরিচয়। ৬৩ বছর বয়সি এই আর্জেন্টাইন কোচ বাছাইপর্বের ছ’টি ম্যাচের পর দলের দায়িত্ব নেন। তার পরের ১২ ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে হেরে সহজেই বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা নিশ্চিত করে প্যারাগুয়ে।

ফের ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় মরক্কো

চার বছর আগে স্পেন ও পর্তুগালকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছিল মরক্কো, যেখানে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল। এবারও তারা ইউরোপের আরেক সেরা শক্তি নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে নিজেদের ক্ষমতার প্রমাণ দিল।
ফিফা বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ষষ্ঠ স্থানে থাকা মরক্কো—যারা নেদারল্যান্ডসের চেয়ে এক ধাপ ওপরে—বর্তমানে এক অসাধারণ প্রতিভাবান প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে খেলছে। আশরাফ হাকিমি, ইসমাইল সাইবারি এবং ব্রাহিম দিয়াজের মতো তারকারা নিজেদের কেরিয়ারের সেরা ছন্দে রয়েছেন।

অন্যদিকে, মাঝমাঠে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ১৮ বছর বয়সি আইয়ুব বুয়াদ্দি ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় তরুণ প্রতিভা হয়ে ওঠার পথে। নিজের জন্মভূমি ফ্রান্সের পরিবর্তে কয়েক মাস আগে তিনি মরক্কোর হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রধান কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি দায়িত্ব নিয়েছেন চার মাসও হয়নি। কিন্তু তাঁর সুনাম দ্রুতই বাড়ছে। গত বছর তাঁর কোচিংয়েই মরক্কোর অনূর্ধ্ব-২০ দল বিশ্বকাপ জিতেছিল। আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য ইতিমধ্যেই স্মরণীয় হয়ে ওঠা এই বিশ্বকাপে ফের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠল মরক্কো। মহাদেশের প্রথম দল হিসেবে তারা শেষ ষোলোয় জায়গা নিশ্চিত করে নিল।

এদিনও তারা নিজেদের স্বকীয় ধাঁচেই জয় তুলে নেয়। বলের দখলে আধিপত্য দেখিয়েছে, একের পর এক সুযোগ নষ্ট করলেও মনোযোগ হারায়নি, সংযুক্ত সময়ে প্রাপ্য সমতাসূচক গোলটি আদায় করে নিয়েছে। এরপর টাইব্রেকারেও পিছিয়ে পড়ার পর অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়ে ম্যাচ জিতে ইতিহাস গড়েছে।

মরক্কোর ডিফেন্ডার নুসাইর মাজরাউই মনে করেন, টুর্নামেন্টের এত শুরুর দিকে দুই শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হওয়াটা “ঠিক নয়”। তবে তিনি বলেন, “আমরা বিনয়ীই থাকব, কারণ এই মানসিকতার জন্যই আমরা আজ এখানে পৌঁছেছি। আজ আমরা যে লড়াকু মানসিকতা দেখিয়েছি, সেটা না থাকলে কোনও ম্যাচই জেতা সম্ভব নয়।”

তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ এই বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক কানাডাকে মরক্কো হারাতে পারলে এবং ফ্রান্স যদি সুইডেন ও পরে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছয়, তাহলে শেষ আটে ফের ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে তারা। সেই লড়াইও যে বে জমে উঠবে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

নিঃসন্দেহে সেটাই হবে মরক্কোর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তবে কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ২-০ গোলে হারের পর গত চার বছরে মরক্কো কতটা এগিয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য এমন একটি লড়াই অবশ্যই দারুণ আকর্ষণীয় হবে।