• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 4 June, 2026

অবসরের পর ফুটবলার তৈরির কাজে মন দিতে চাই: সৌভিক চক্রবর্তী

নিউটাউনে নিজের বাড়িতে বসে ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই সাফল্য থেকে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বললেন অনেক কিছু

রাজীব ঘোষ: ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেরই অভিযোগ, ভারতীয় ফুটবলে বাঙালি ফুটবলাররা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেন। রয়েছেন কয়েকজন মাত্র। তাঁদেরই একজন ইস্টবেঙ্গলের নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার সৌভিক চক্রবর্তী। ২২ বছর পর ইস্টবেঙ্গলকে জাতীয় স্তরের খেতাব এনে দেওয়ায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নিউটাউনে নিজের বাড়িতে বসে ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই সাফল্য থেকে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বললেন অনেক কিছু।

প্রশ্ন:  ২২ বছর পর জাতীয় স্তরের কোনও টুর্নামেন্টে ইস্টবেঙ্গলকে ঐতিহাসিক সাফল্য এনে দেওয়ার পর অনুভূতিটা ঠিক কেমন?

সৌভিক: খুবই স্পেশ্যাল। যে আবেগের বিস্ফোরণটা আমরা স্বচক্ষে দেখতে পেয়েছি, সেই অভিজ্ঞতাটা দারুন। এর জন্য নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি আমি। কলকাতার বুকে মরশুমের শেষ ম্যাচে জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে ভাল আর কীই বা হতে পারে? সেই মুহূর্তটার কথা ভাবলে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দেয়।

প্রশ্ন: কলকাতার দুই প্রধান ছাড়াও অনেক বড় দলের হয়েই খেলেছেন। আইএসএল-এর এই সফরে এটাই কি সেরা মুহূর্ত?

সৌভিক: আইএসএলে এর আগে হায়দরাবাদ এফসি-র সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। কিন্তু দুই সাফল্যের মধ্যে আকাশ ও পাতালের দূরত্ব রয়েছে। যখন আমরা হায়দরাবাদকে চ্যাম্পিয়ন করে হায়দরাবাদ বিমানবন্দরে নেমেছিলাম, তখন আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে জনা পঞ্চাশ লোক ছিল। কিন্তু এ বার যেখানে যাচ্ছি, লোকের উচ্ছ্বাস দেখছি। খেতাব এনে দেওয়ার জন্য সবাই ধন্যবাদ দিচ্ছে। এই যে এত পরিশ্রমের পর এত ভালবাসা ও সন্মান পাচ্ছি, এটা একজন খেলোয়াড়ের কাছে বিশাল ব্যাপার। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এটাই সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত।

প্রশ্ন: ব্যক্তিগত এই সাফল্যকে কী ভাবে দেখছেন?

সৌভিকনিজের পারফরম্যান্সের চেয়ে দলের পারফরম্যান্সই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চিরকালই এই কথা ভেবেই পরিশ্রম করেছি। এখন আমি ফুটবল জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গিয়েছি। হয়তো আগামী মরশুমের পর অবসর নেব। এখনও দলের পারফরম্যান্সই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: সমর্থকদের জন্যও নিশ্চয়ই ভাল লাগছে?

গত ২২ বছর ধরে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা অনেক কষ্ট পেয়েছেন। প্রায় প্রতিবারই আশা জাগিয়েও দল শেষ পর্যন্ত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত এই কষ্ট থেকে যে তাদের মুক্তি দিতে পারলাম, এটাই সবচেয়ে আনন্দের।

প্রশ্ন: গত চার মরশুমে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন।তা সত্ত্বেও সাফল্য আসেনি। এই টানা ব্যর্থতা কতটা কষ্টকর ছিল?

সৌভিক: গত চার মরশুমে একটা সুপার কাপ জয়ের স্মৃতি ছাড়া আর কোনও ভাল স্মৃতি ছিল না। বড় ক্লাবের ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন না হতে পারাটাই ব্যর্থতা। দুনম্বর বা আট নম্বরে থাকলে কিছুই এসে যায় না। গত তিন-চার বছর সত্যিই খুব কষ্টে কেটেছে। বারবার তীরে এসে তরী ডুবে যাচ্ছিল। মরশুমের শেষ দিকে চোট-আঘাত পেয়ে যাচ্ছিল অনেকে। সমর্থকদেরও অভিমান হত। প্রচুর ট্রোল করত তারা। মাঝে মাঝে নিন্দার সীমা ছাড়িয়েও গিয়েছে। কিন্তু বড় ক্লাবে এটাই স্বাভাবিক। সাফল্য পেলে এরাই তো আবার সীমাহীন ভালবাসাও দেয়। খারাপ লাগত, ওদের জন্য কিছু করতে পারছি না, এই ভেবে।

প্রশ্ন: সেই সময়ে কখনও এমন হয়েছে, হতাশায় রাতে ঘুম আসেনি বা চোখে জল এসে গিয়েছে?

সৌভিক: অনেকবারই এমন হয়েছে।কিন্তু হতাশা কখনও আমাকে গ্রাস করতে পারেনি। আমি আমার কাজ করে গিয়েছি।

প্রশ্ন: ভারতীয় ফুটবল থেকে বাঙালি ফুটবলাররা হারিয়ে যাচ্ছে, এই অভিযোগ উঠছে। কী বলবেন?

সৌভিক: সত্যিই, এটা খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। আমি ফুটবল জীবনের শেষ দিকে চলে এসেছি। হয়তো আর এক বছর খেলব। আমাদের প্রজন্মে অনেক বাঙালি ফুটবলার খেলেছে জাতীয় ক্লাব স্তরে। সেই হিসেবে এখন বাঙালি ফুটবলারের সংখ্যা ভীষণ ভাবে কমে আসছে। তৃণমূল স্তর থেকে ফুটবলার তৈরি করতে না পারলে পাঁচ বছর পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

প্রশ্ন: অবসরের পরে কি সেই উদ্যোগ নেবেন?

সৌভিক: হ্যাঁ, অবশ্যই নেব। ফুটবল ছাড়ার পর আমার ফুটবল প্রশাসনে যোগ দেওয়ার খুব ইচ্ছে আছে, যাতে তৃণমূল স্তরে খেলোয়াড় গড়ে তোলার কাজ করতে পারি। যদি কোচিংয়ে যাই তা হলেও খুদে ফুটবলারদের গড়ে তুলতে চাই। এই জায়গাটাতে নজর দেওয়া খুব দরকার। গ্রাম, মফস্বল থেকে ফুটবলার উঠে আসছে না, অথচ শহরের বাইরে থেকেই ফুটবলার তুলে আনতে হবে। আমার খুব ইচ্ছা, এই জায়গাটায় কাজ করার।

প্রশ্ন: ইস্টবেঙ্গলের কোচেরা মাঝমাঠে আপনাকে বরাবরই মাঝমাঠে আপনাকে যে কঠিন দায়িত্ব দিতেন, তা যথাযথ ভাবে পালন করতে গিয়ে প্রচুর কার্ড দেখতে হয়েছে। এই ভূমিকা আপনার পছন্দের ছিল?

সৌভিক: আমি বরাবরই খুব টিমম্যান। দলের জন্য যেটা আমাকে করতে বলা হয়, সেটাই করি আমি। কোচেরা আমাকে যা যা ভূমিকা পালন করতে বলেছেন, কঠিন হলেও আমি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করেছি। তাতে আমার কখনও সমস্যা হয়নি।

প্রশ্ন: নিন্দুকেরা অনেকে বলছেন এ বারের লিগে কম ম্যাচ ছিল বলে আপনারা চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছেন। তাদের কী বলবেন?

সৌভিক: আমার তো মনে হয় লিগ যদি আরও দীর্ঘ হত, তা হলে আমরা আরও ভাল খেলতাম। কারণ, এ বার দলের গভীরতা অনেক বেশি ছিল। ভেবে দেখুন, সউল, মহেশ, রশিদ, আনোয়ার অনেক ম্যাচ খেলেনি। কেভিন প্রথম ছটা ম্যাচ খেলেনি। মিগুয়েল মাঝখানে কার্ডের জন্য তিনটে ম্যাচে খেলতে পারেনি। দলের নামী খেলোয়াড়রা এরকম অনেক ম্যাচেই খেলতে পারেনি। তা সত্ত্বেও সফল হয়েছি। তাই লিগ যদি লম্বাও হত, তা হলেও আমরা সফল হতাম।

প্রশ্ন: মহমেডানকে ৭-০-য় হারানোটাই কি এ বার আইএসএলে আপনাদের টার্নিং পয়েন্ট ছিল?

সৌভিক: না। আমার মনে হয় দশ জনে লড়ে বেঙ্গালুরু এফসি-র বিরুদ্ধে ৩-৩ ড্র করাটাই টার্নিং পয়েন্ট। তিন বার পিছিয়ে পড়েও আমরা বারবার সমতা এনেছি। সেই পারফরম্যান্সের পর আমাদের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে সেই আত্মবিশ্বাসই আমাদের কাজে লেগেছে।

প্রশ্ন: মোহনবাগানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে কি জয়ের আনন্দটা দ্বিগুন হত?

সৌভিক: অবশ্যই। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য, শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে গেলাম। তবে ডার্বিতে এরকম হতেই পারে। এ বার লিগের শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল চ্যাম্পিয়ন হওয়া। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ড্রয়ের পরেও আমাদের দমানো যায়নি।