কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ের হ্যাটট্রিক। টানা তৃতীয়বার কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়। চলতি গেমসে ভারতের প্রথম সোনা—এ সবের সঙ্গেই এখন একটাই নাম জুড়ে রয়েছে, মীরাবাই চানু।
মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে ১৯০ কেজির (৮৫+১০৫) ওজন তুলে কমনওয়েলথ গেমসে রেকর্ড ভেঙে সোনা জিতেছেন ভারতের এই অলিম্পিক পদকজয়ী ভারোত্তোলক। তবে পদক জয়ের কৃতিত্বের সঙ্গে চর্চা শুরু হয়েছে জাতীয় সঙ্গীতের সময় তাঁর কান্না নিয়েও। কেন এই কান্না? এ কি শুধুই সোনা জেতার আনন্দে, না কি অন্য কোনো কারণও লুকিয়ে রয়েছে এর পিছনে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিকের পর আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসিকেও কাঁদতে দেখা গিয়েছিল। তিনিও বলেছিলেন, সে শুধু আনন্দাশ্রু ছিল না। রবিবার অসাধারণ সাফল্যের পর চানুও বললেন, এমন কিছুই, যা তাঁর আবেগের বহিপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই না।
কিন্তু কেনই বা এতটা আবেগে ভেসে গেলেন চানু? এক সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘জীবনে আমি যা যা পেরিয়ে এসেছি, চোখে জল এসে গিয়েছিল সে সব ভেবেই, শুধু সোনা জয়ের আনন্দে নয়। এত কষ্ট, এত ত্যাগ, এত কঠিন সময়—সব কিছু মনে পড়ে গিয়েছিল’।
গত কয়েক বছর ধরে চোট, ওজন নিয়ন্ত্রণের লড়াই এবং প্রবল মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। সেই প্রসঙ্গ টেনেই চানু বলেন, ‘অনেক সময় মনে হয়েছে সবকিছু খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি জানতাম, আমাকে ফিরে আসতেই হবে। দেশের জন্য সোনা জেতাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য’।
ওজন ঠিক রাখতে যে কী ভয়ঙ্কর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তাও অকপটে জানিয়েছেন ভারতের তারকা ভারোত্তোলক। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিন দিন ধরে ঠিকমতো কিছু খাইনি, জলও প্রায় খাইনি। ওজন কমানোর জন্য এটা করতেই হয়েছিল। শরীরের জন্য বিষয়টা খুব কঠিন ছিল’।
নজির গড়া পারফরম্যান্সের পর মিডিয়া জোনে পৌঁছে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল ‘তাড়াতাড়ি করুন, আমি দু’দিন ধরে কিছু খাইনি!’ — হাসতে হাসতেই সাংবাদিকদের বলেন চানু।
টানা তিনটি কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ের কৃতিত্ব নিয়ে মীরাবাই বলেন, ‘এটা আমার তৃতীয় কমনওয়েলথ গেমসের সোনা। আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না কতটা খুশি। ভারতের হয়ে, ভারতীয় ওয়েটলিফটিং ফেডারেশনের হয়ে এই পদক জিততে পেরে আমি ভীষণ গর্বিত’।
সাক্ষাৎকারে পরিবারের অবদানের কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘আমার পরিবার সবসময় আমাকে সমর্থন করেছে। আমি অনেক চোট পেয়েছি, অনেক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। কিন্তু ওরা সব সময় আমার পাশে থেকেছ’।
নিজের কোচ বিজয় শর্মার কথাও আলাদা করে উল্লেখ করেন মীরাবাই। তাঁকে নিয়ে সোনাজয়ী তারকা বলেন, ‘আমার কোচ এবং পরিবার না থাকলে আজ আমি এখানে পৌঁছতে পারতাম না। ওঁরা সবসময় আমাকে বিশ্বাস করেছেন, আমিও সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেছি’।
পদক মঞ্চে জাতীয় সঙ্গীত বাজতে শুরু করার মুহূর্তটাই ছিল সবচেয়ে আবেগঘন। দেশের জাতীয় পতাকা ওঠার সময় আর তাঁর চোখের জল বাধ মানেনি। সেই অনুভূতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মীরাবাই বলেন, ‘জাতীয় সঙ্গীত বাজতে শুরু করলে চোখে জল চলে আসে। সে আনন্দের কান্না। কারণ, আমি ভারতের জন্য প্রথম সোনা জিততে পেরেছি। কিন্তু আজ চোখে জল শুধু আনন্দে আসেনি, অতীতের লড়াইয়ের কথা ভেবেও চোখে জল চলে আসে আমার। এত কষ্ট করার পরে সাফল্য এলে তো এমন হবেই’।
প্যারিস অলিম্পিকে মাত্র এক কেজি কম ওজন তোলার জন্য পদক হাতছাড়া হয়েছিল। সেই হতাশা কাটিয়ে গ্লাসগোয় আবার সোনার মঞ্চে ওঠা মীরাবাই চানুর কাছে তাই এই জয় শুধুমাত্র একটি পদক জেতা নয়, বরং নিজের প্রতি বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য মানসিক শক্তির সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।




