কলকাতায় আসার আগে কুয়েতের আল আরাবির এসসি-র প্রস্তুতির বহরের কথা শুনে অনেকেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। বুধবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ইস্টবেঙ্গলকে তারা চার গোল দেবে, না ছ’গোল এই জল্পনায় মেতে ছিলেন বেশিরভাগ ফুটবল বোদ্ধাই।
বুধবার যুবভারতীতে আল আরাবিকে হারিয়ে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২-এর গ্রুপ পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করাটা যে মোটেই সোজা কাজ হবে না, তা সবাই জানতেন। ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলাররা ও তাদের স্প্যানিশ গুরু আন্তোনিও লোপেজ হাবাসও জানতেন। কিন্তু কঠিন ম্যাচে কী ভাবে খেলা ঘুরিয়ে দিতে হয়, তা জানেন বলিভিয়ার প্রাক্তন জাতীয় কোচ হাবাস। বুধবার রাতে সেটাই করে দেখান তিনি।
নিঃসন্দেহে এটি অঘটন। শুধুমাত্র বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল খেলে কুয়েতের দলের বড় বড় চেহারার দক্ষ ফুটবলারদের পরিশ্রান্ত করে দিয়ে শেষ মুহূর্তে গেরিলা আক্রমণের ধাঁচে হানা দিয়ে গোল করে বাজিমাত করার কৌশলেই জিতে শেষ হাসি হাসলেন হাবাসের শিস্যরা।
কুয়েতের গোটা দলটা যখন ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোলটি করে জিতে মাঠ ছাড়বেন, ঠিক সেই সময়ে তাদের বিস্মিত করে পরপর জালে বল জড়িয়ে দেন রশিদ, ডেভিড ও রোহিত-রা। এটাই হাবাসের মারণ কৌশল, যা তিনি আগেও দেখিয়েছেন।
প্রতিপক্ষ অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী হলে কী ভাবে সেই ম্যাচে বাজিমাত করতে হবে, তা জানেন স্প্যানিশ ফুটবল গুরু। আগের দিনই বলেছিলেন, ‘আমাদের বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল খেলে ম্যাচটা জিততে হবে’। পরের দিনই বোঝা গেল, এই সেই বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল।
এই ম্যাচে যে শারীরিক শক্তি বা প্রতিপক্ষের চেয়ে ভাল স্কিল দিয়ে সফল হওয়া যাবে না, তা ভাল করেই জানতেন আন্তোনিও লোপেজ হাবাস। কিন্তু প্রতিপক্ষের ফুটবলাররা যে মানুষ, আর্দ্র আবহাওয়ায় তারাও যে ক্লান্ত হবেন, তা তো জানতেন। সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়ে সাফল্যের পাঠ দেন দলের ছেলেদের। কোচের সেই পাঠই অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন রশিদ, রামিরেজ, বিষ্ণু, ডেভিড, জয়-রা।
বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন যেমন দেখিয়ে দেয়, আন্ডারডগ হিসেবে নামলে দক্ষতা ও ক্ষমতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সঠিক কৌশল রচনা ও তার নিখুঁত বাস্তবায়ন, বুধবার হাবাস-বাহিনীও সেটাই দেখিয়ে দিল।
এ ভাবে একটা ফাইনাল নয়, বিশ্বকাপে একাধিক ম্যাচে অঘটন ঘটিয়েছে আন্ডারডগরা। সেভাবেই এ দিনও ম্যাচ বের করে নিল ইস্টবেঙ্গল এফসি। হাবাসের এই কৌশল যে কোনো উঠতি কোচের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ ‘চ্যাপটার’ হয়ে উঠতে পারে। যাঁরা কোচ হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাঁরা এই ম্যাচের ভিডিও সংরক্ষণ করে রেখে দিতে পারেন। কাজে লাগবে আজীবন।
আর সেটপিস যে ফুটবলের অমূল্য রত্ন, তা তো জয় গুপ্তার গোল দেখেই বোঝা গিয়েছে। হাবাসের কাছে সেটপিসের তালিম নিয়ে যে কতটা দক্ষ হয়ে উঠেছেন, তা এই ম্যাচেই বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। শুধু একটাই খামতি দেখা গিয়েছে এই ম্যাচে। গোলের সুযোগ নষ্ট করার দোষ। অবশ্য ভারতের ক্লাব দলগুলির প্রত্যেকেরই এই দোষ আছে। জাতীয় সিনিয়র দলের তো এটাই প্রধান রোগ।
বুধবার রাতে ম্যাচের পর হাবাস বলেন, ‘জানতাম এই ম্যাচ জিততে হলে বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল খেলতে হবে। আজ প্রচণ্ড আর্দ্র আবহাওয়াও ছিল। যার ফলে ক্লান্তি আসার সম্ভাবনা ছিল যথেষ্ট। তাই ছেলেদের বলেছিলাম, ম্যাচের শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত আত্মবিশ্বাস হারালে চলবে না এবং মনঃসংযোগ বজায় রেখে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ছেলেরা আমার কথামতোই বুদ্ধি করে ফুটবল খেলেছে এবং ১২০ মিনিট সমান তীব্রতা বজায় রেখে ভাল খেলে গিয়েছে। এটাই ওদের কৃতিত্ব আর সেই কৃতিত্বেরই ফল পেলাম আমরা’।
বুধবার যুবভারতীতে নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে জয় গুপ্তা সমতা আনার পর থেকে প্রতিটি গোলেই সমান ভাবে উল্লাসে মেতে উঠতে দেখা যায় হাবাসকে। সাংবাদিক বৈঠকে অবশ্য তিনি ছিলেন বরাবরের মতোই শান্ত ও নির্বিকার। কনফারেন্স রুমের বাইরে থেকে যখন ভেসে আসছিল সমর্থকদের উল্লাসের শব্দ, তখন ভিতরে বরফশীতল কোচকে দেখে ও তাঁর কথা শুনে দুটো ছবিকে মেলানো যাচ্ছিল না।
স্প্যানিশ মহাগুরু বলেন, ‘এটাই ফুটবল। কখন যে কী হবে, কী ভাবে খেলা ঘুরে যাবে, কেউ বলতে পারে না। ১-১ হয়ে যাওয়ার পর দলের ছেলেদের বলেছিলাম, শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করতে হবে। গত ৯০ মিনিটে প্রচুর সুযোগ তৈরি করতে পেরেছি আমরা। এটাই আসল কথা। এই সুযোগ তৈরি করা থামালে চলবে না। সুযোগ তৈরি করে যাও, গোল আসবেই’। শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়।
যাঁর গোলে প্রথম এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল, সেই মহম্মদ রশিদ বলেন, ‘আমার গোলটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঠিকই। এই গোলটার পরেই আমাদের আত্মবিশ্বাস এক লাফে অনেকটা বেড়ে যায়। তবে দলের জয়টাই আমার কাছে আসল কথা। এই আত্মবিশ্বাস আমাদের সারা মরসুম কাজে লাগবে’।
মরসুমের শুরুতেই কোচ যে আস্থা অর্জন করে নিলেন দলের ফুটবলারদের, ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলাররা এই কোচের অধীনে খেলে যে আত্মবিশ্বাস অর্জন করে নিলেন, এর প্রভাব সূদূরপ্রসারী। সারা মরসুম এই একটা ম্যাচকে মাথায় রেখেই নিজেদের উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন লাল-হলুদ বাহিনীর ফুটবলাররা এবং এই একটা ম্যাচই তাঁদের কাছে হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের পাসওয়ার্ড।
এ বার নিশ্চয়ই অনেকে বুঝতে পারছেন, কেন আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের টিশার্টে আইএসএলের ইতিহাসে সেরা কোচের তকমা এঁটে দেওয়া হয়েছে? তিনি সত্যিই এ দেশের ফুটবলে মহাগুরু। এর পরেও কেন ফেডারেশন কর্তারা তাঁকে ভারতীয় দলের কোচ করে আনার কথা ভাববেন না, সেটাই আশ্চর্যের।
মাস দুয়েকের মধ্যেই ভারতীয় দল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলতে নামবে এই যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনেই। অন্তত সেই ম্যাচের জন্য ভারতীয় দলকে হাবাসের হাতে ছেড়ে দেওয়াই বা হবে না কেন?
শোনা যায়, সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে নাকি গলায় গলায় ভাব ইস্টবেঙ্গলের কর্মকর্তাদের। দেশের ফুটবলের জন্য ভারতীয় দলকে তালিম দেওয়ার জন্য তাঁরা হাবাসকে এক মাসের জন্য ছাড়তে পারবেন না? আইএসএল যদি অক্টোবরে শুরু হয়, তা হলে তো আরও সম্ভব। শক্তিশালী ব্রাজিলের সঙ্গে লড়াই করার জন্য হাতের কাছে হাবাস ছাড়া ভাল ওষুধ আর আছেই বা কে?




