ফুটবল দুনিয়ায় চারবার বিশ্বকাপজয়ী জার্মানির দাপট কি এখন অতীত? সোমবার রাতে প্যারাগুয়ের কাছে তাদের হার ও বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর সারা বিশ্বেই উঠছে এই প্রশ্ন। পশ্চিম জার্মানি হিসেবে খেলার সময় ধরলে, তারা যেমন চারবার বিশ্বকাপ জিতেছে, তেমনই আরও চারবার ফাইনালে উঠে রানার্স-আপ হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ছয়টি ফাইনালে খেলে তিনবার খেতাব জিতেছে।
কিন্তু সত্যিই সেই দিন এখন অতীত। বিশ্বকাপের শেষ-৩২-এর রাউন্ডে প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে ৩-৪-এ হেরে বিদায় নেওয়ার পর মঙ্গলবার জার্মানির জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘বিল্ড’-এর প্রথম পাতার শিরোনাম ছিল— ‘জার্মান ফুটবলের আর এক দুঃস্বপ্ন’। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচের স্কোর ছিল ১-১, এরপর টাইব্রেকারে হেরে যায় জার্মানি।
২০১৪-য় শেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে জার্মানির বিশ্বকাপ যাত্রা আর আগের মতো সফল হয়নি। এরপর দু’বার তারা গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথম নকআউট ম্যাচেই বিদায় নিতে হল তাদের।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফার বিশ্ব ক্রমতালিকায় প্যারাগুয়ে ছিল ৪১ নম্বরে, আর জার্মানি ছিল ১০ নম্বরে। কিন্তু সোমবারের ম্যাচে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। দক্ষিণ আমেরিকার দলটি জার্মানিকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাইব্রেকারে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ে ফেলে।

বোস্টনে এই ম্যাচে এ দিন ৭৫ শতাংশ বলের দখল নিজেদের কাছে রেখেও সুসংগঠিত, লড়াকু কিন্তু তুলনামূলক সীমিত সামর্থ্যের প্যারাগুয়ে রক্ষণভাগ ভাঙতে হিমশিম খেতে হয় জার্মানিকে। বরং ম্যাচে প্রথমে এগিয়ে যায় প্যারাগুয়েই। হুলিও এনসিসোর গোলে চমকে ওঠে জার্মানি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আর্সেনালের কাই হাভার্টজ হেডে গোল করে সমতা ফেরান। কিছুক্ষণ পর জনাথান তাহও হেডে বল জালে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু তার কয়েক সেকেন্ড আগে এক সতীর্থের ফাউলের অভিযোগে ভিএআরের পর সেই গোল বাতিল করে দেন রেফারি, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
একেবারে ফাঁকায় থাকা তাহ দূরের পোস্টের কাছে উঠে দুর্দান্ত হেডে বল পাঠিয়েছিলেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের নাগালের বাইরে। কিন্তু তার কয়েক সেকেন্ড আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোলটি বাতিল করে দেওয়া হয়। যা দেখে প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার ঘটনাটিকে “হাস্যকর” বলে মন্তব্য করেন।
কর্নার থেকে বল আসার সময় জার্মানির ভালদেমার আন্তন গোলরক্ষক গিলকে বাধা দিয়েছেন বলে মনে করেন রেফারি। সেই ধাক্কায় গিল মাটিতে পড়ে যান। পরে উঠে দাঁড়িয়ে তাহর হেড ঠেকানোর চেষ্টা করলেও ততক্ষণে বল জালে জড়িয়ে যায়।
তবে ভিএআরের পরামর্শে রেফারি জালাল জায়েদ মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে রিপ্লে দেখেন এবং শেষ পর্যন্ত গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর বিবিসি টিভির ধারাভাষ্যকার, ইংল্যান্ডের প্রাক্তন তারকা ফরোয়ার্ড অ্যালান শিয়ারার বলেন, “গোলরক্ষক রেফারিকে বোকা বানিয়েছে। সামান্য স্পর্শেই গোলরক্ষক মাটিতে পড়ে গেছে। এটা বুঝতে হবে যে ফুটবল একটি শারীরিক সংঘর্ষের খেলা। গোলরক্ষক রেফারি এবং ভিএআর— দু’জনকেই বোকা বানিয়েছে। যেভাবে সে মাটিতে পড়ে গেল, তা সত্যিই হাস্যকর।”

জার্মানির কোচ নাগেলসম্যান বাতিল হওয়া গোলের সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরে তিনি বলেন, “আমার মতে, এটা কোনোভাবেই ফাউল ছিল না। আসলে গোলটি বাতিল করা পুরোপুরি হাস্যকর একটি সিদ্ধান্ত।” গোলটি বাতিল হওয়ার পর তীব্র প্রতিবাদ করায় নাগেলসম্যানকে হলুদ কার্ডও দেখান রেফারি।
তবু জার্মানির ভরসা ছিল টাইব্রেকার। কারণ, বিশ্বকাপে এর আগে চারটি টাইব্রেকারে অংশ নিয়ে চারটিতেই জিতেছিল তারা— একশোভাগ সাফল্যের রেকর্ড ছিল তাদের।
কিন্তু এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে যায়। প্রথম শট নিতে এসে ব্যর্থ হন কাই হাভার্টজ; তাঁর শট ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক গিল। নিক ভল্টেমাডের শটও রুখে দেন তিনি। প্যারাগুয়ের দুই খেলোয়াড়ও সুযোগ নষ্ট করায় জার্মানি ম্যাচে ফেরার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু জনাথান তাহ নিজের শট বারের অনেক ওপর দিয়ে মারেন। এর পর ডিফেন্ডার হোসে কানালে সফল স্পট-কিকে প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন।
ম্যাচের শেষে হতাশ জার্মান কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যান বলেন, “প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া খুবই তিক্ত অভিজ্ঞতা। এটা ভীষণ কষ্টের। এই নিয়ে টানা তৃতীয়বার আমরা বিদায় নিলাম। তাই এখন আর নিজেদের প্রথম সারির দল বলতে পারি না।”
নাগেলসম্যান ২০২৩-এ জার্মানির জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। তবে তাঁর অধীনে ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে জার্মানির যাত্রা শেষ হয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালেই। এ বার বিশ্বকাপে জার্মানির শুরুটা দারুণ ছিল। প্রথম বিশ্বকাপ খেলা কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেয় তারা। এরপর পিছিয়ে পড়েও আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারায়।
তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের কাছে ২-১ গোলে হারে। তবে তাতে তাদের নক আউটে ওঠা আটকায়নি। কিন্তু শেষ-৩২ পর্বে প্যারাগুয়ের কাছে যেভাবে বিদায় নিতে হয়েছে, তাতে নাগেলসম্যানের চাকরিই এখন প্রশ্নের মুখে। সামাজিকমাধ্যমে ইতিমধ্যেই অনেকেই প্রাক্তন লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপকে তাঁর উত্তরসূরি করার দাবি তুলেছেন।
বিবিসি রেডিওয় প্রাক্তন জার্মান ডিফেন্ডার আর্নে ফ্রিডরিখ বলেন, “পুরো টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্স বিচার করলে বলতে হবে, এই হার প্রাপ্যই ছিল। নাগেলসম্যানকে এর পরিণতি ভোগ করতেই হবে। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক, কিন্তু খেলাধুলায় এমনটা হয়। আমার মতে, নাগেলসম্যানকে ছাড়াই জার্মানির এখন এগিয়ে যাওয়া উচিত।”
আর নাগেলসম্যান নিজে কী বলছেন?
ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই জার্মান কোচকে বারবার তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমি পালিয়ে যাওয়ার মানুষ নই।” তবে একই সঙ্গে স্বীকার করেন, “আজ যদি জার্মানিতে একটি জনমত সমীক্ষা করা হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমার সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য খুব বেশি পাওয়া যাবে না। তবে আজ স্টেডিয়ামে আমি সমর্থন পেয়েছি। তাই বলে জার্মানির সবাই কোচ হিসেবে আমার থেকে যাওয়ার পক্ষে মত দেবে, এমনটাও মনে করি না।”
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, “শুধু আমরা বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছি বলেই আমি সরে দাঁড়াব না। যদি ডিএফবি (জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) চায় আমি দায়িত্বে থাকি, তাহলে আমি থাকব। এই ফুটবল জগৎ কীভাবে চলে, সেটা আমি জানি। এখন অনেকেই চাইবে আমি দায়িত্ব ছেড়ে দিই। কিন্তু জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন যদি আমাকে রাখতে চায়, তাহলে আমি কাজ চালিয়ে যেতে চাই।”
জার্মান টেলিভিশনের বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করা ইয়ুর্গেন ক্লপ ইকুয়েডরের বিপক্ষে জার্মানির পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এই ম্যাচে আমরা ভুল কৌশল বেছে নিয়েছিলাম। আক্রমণাত্মক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমরা সম্পূর্ণ ভুল ধরনের ফুটবল খেলেছি। কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারেনি জার্মানি। শারীরিকভাবে শক্তিশালী, লড়াকু এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্যারাগুয়ে নিজেদের অর্ধে অনেক খেলোয়াড় নিয়ে রক্ষণ গড়ে জার্মানিকে বারবার হতাশ করে।”
এই জয়ের ফলে শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ের প্রতিপক্ষ হবে ফ্রান্স অথবা সুইডেন। অন্যদিকে, জার্মানিকে আরও একটি হতাশাজনক বিশ্বকাপ বিদায়ের ধাক্কা সামলাতে হবে।




