ফুটবল কি শুধুই মাঠের খেলা, নাকি এক চরম পুঁজিবাদী ব্যবসা? বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ‘ফিফা’ থেকে শুরু করে ভারতের সর্বোচ্চ মঞ্চ ‘এআইএফএফ’ — সর্বত্রই এখন টাকার অঙ্কে খেলা নিয়ন্ত্রণের এক মরণকামড় স্পষ্ট।
গত কয়েকদিনে ফুটবল বিশ্বে ঘটে যাওয়া দু’টি বড় ঘটনা প্রমাণ করে দিল, মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে ফুটবলের নিয়তি এখন অনেক বেশি নির্ধারিত হচ্ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বোর্ডরুমের সিদ্ধান্তের ওপর।
একদিকে বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপ বেসরকারীকরণের বিতর্কিত পরিকল্পনায় প্রতিরোধ। আর ঠিক সেই সময়েই ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘জামশেদপুর এফসি’-র ইন্ডিয়ান সুপার লিগ থেকে আকস্মিক নাম তুলে নেওয়া। আসলে একই মুদ্রার দুটি পিঠ।
বিশ্ব ফুটবলকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকীকরণের এক নজিরবিহীন খেলায় মেতেছিলেন ফিফা প্রধান জিয়ানি ইনফান্তিনো। জোশ কুশনারের নেতৃত্বাধীন মার্কিন স্থায়ী হোল্ডিং কোম্পানি ‘থ্রাইভ ইটারনাল’-এর সাথে হাত মিলিয়ে তিনি ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামে একটি বাণিজ্যিক সাবসিডিয়ারি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:ময়দানে প্রাণহীণ ফুটবল খেলা চলছে , হায়রে গ্যালারিতে হাতে গোনা দর্শক
উদ্দেশ্য ছিল, বিশ্বকাপের মতো মেগা টুর্নামেন্টের সম্প্রচার ও স্পনসরশিপ স্বত্বের একটি বড় অংশ বেসরকারি পুঁজির হাতে চিরতরে তুলে দিয়ে ২০ বিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহ করা। বিনিময়ে বিশ্বের ২১১টি সদস্য দেশকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় অঙ্কের অর্থ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনও দেখান ইনফান্তিনো।
কিন্তু ফুটবল বিশ্ব এই আগ্রাসী বাণিজ্যিকীকরণ মেনে নেয়নি। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা ‘উয়েফা’ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ফুটবল ফিফার একার সম্পত্তি নয় যে, তারা তা বাজারে বিক্রি করে দেবে। নজিরবিহীনভাবে ফিফার অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, সিনিয়র অ্যাডভাইজার কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেন এবং উয়েফা বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দেন।
তীব্র জনরোষ ও প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়ে অবশেষে গত ৩১ জুলাই গভীর রাতে ইনফান্তিনো এই বিতর্কিত বেসরকারীকরণের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাতিল বা ইউ-টার্ন নেওয়ার ইংগিত দিয়েছেন।বিশ্বমঞ্চে যখন কর্পোরেট পুঁজির এই প্রতিরোধ চলছে, ঠিক তখনই ভারতীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা এআইএফএফ-এর নতুন মডেল এক চরম সংকটের জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক পার্টনার এফএসডিএল -এর সাথে মাস্টার রাইটস চুক্তি শেষ হওয়ার পর, চলতি জুলাই মাসেই এআইএফএফ এবং আইএসএল ক্লাবগুলোর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ লিগ পরিচালনার সমস্ত বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সরাসরি ক্লাবগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
কাগজে কলমে এই মডেলকে স্বাবলম্বী মনে হলেও, বাস্তবে এটি ক্লাবগুলোর ওপর তীব্র আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। এআইএফএফ প্রতিটি ক্লাবের জন্য বার্ষিক ১.১ কোটি টাকার প্রশাসনিক ও পার্টিসিপেশন ফি ধার্য করে, যা দুটি কিস্তিতে পরিশোধ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০ জুলাইয়ের ডেডলাইন বাড়িয়ে ৩১ জুলাই করা হলেও, অনেক ক্লাবের পক্ষেই এই বিপুল অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এই নতুন ক্লাব-চালিত ব্যবস্থার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় শিকার হলো টাটা স্টিলের মালিকানাধীন জামশেদপুর এফসি। ২০১৭ সালে পথ চলা শুরু করা এই ক্লাবটি ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে স্থিতিশীল, সুশাসিত এবং পরিকাঠামোগতভাবে শক্তিশালী ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের আইএসএল শিল্ড জয়ী এই দলটির নিজস্ব স্টেডিয়াম ও দেশের অন্যতম সেরা ফুটবল একাডেমি ।
ক্লাবটি জানিয়েছে, তারা সিনিয়র স্তরের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল ছেড়ে এখন শুধুমাত্র তৃণমূল স্তরের প্রতিভা অন্বেষনে মনোযোগ দেবে।
বাজার নেই, বোঝা মসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে ফুটবল দুনিয়ার এক মারাত্মক বৈপরীত্য সামনে আসে।
ফিফা যেখানে উয়েফার তীব্র বিরোধিতার কারণে ফুটবলকে সরাসরি পুঁজিবাদের বাজারে ‘পণ্য’ হিসেবে বিক্রি করা থেকে সাময়িকভাবে বিরত থেকেছে, সেখানে এআইএফএফ-এর দুর্বল বানিজ্যিক দূরদর্শিতা ভারতীয় ফুটবলে বিপর্যয় ডেকে আনল।
টাটা গ্রুপের মতো দেশীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্তম্ভের সিনিয়র দল তুলে নেওয়া ভারতীয় ক্লাব ফুটবলের অন্ধকার ভবিষ্যৎকে স্পষ্ট করল। যখন লিগ চালানোর সমস্ত আর্থিক দায়ভার ক্লাবগুলোর উপর বর্তায় ।




