রনজিৎ দাস
কলকাতার ময়দান এখন আর ফুটবলার তৈরির কারখানা নয়, বরং প্রতিভা দমনের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। যে রাজ্যে নার্সারি লিগ থেকে শুরু করে পাড়ায় পাড়ায় কোচিং ক্যাম্পের জাল বিছানো, সেখানে মহামেডান স্পোর্টিংয়ের মতো ক্লাবের অনূর্ধ্ব-লিগে ৭৫ গোল খাওয়া শুধু লজ্জার নয়, এটি বাংলার ফুটবল কাঠামোর মৃত্যুঘণ্টা। ৫ ম্যাচে ৭৫ গোল খাওয়া মানে প্রতি ৬ মিনিটে একটি করে গোল হজম করা। এটি কোনও খেলার ফলাফল হতে পারে না; বলতে পারা যায় একটি সুপরিকল্পিত অপেশাদারিত্বের প্রতিফলন।
Advertisement
আর্থিক সংকটের অজুহাতে দল গড়ে মাঝপথে নাম তুলে নেওয়া ফুটবলারদের মানসিকতা এবং খেলার জীবনকে ধ্বংস করার শামিল। যখন ছোট রাজ্যগুলো পরিকাঠামো গড়ে তুলছে, তখন কলকাতার তথাকথিত ‘বড়’ ক্লাবগুলো তাদের জুনিয়র টিম নিয়ে ছেলেখেলা করছে। মণিপুর বর্তমানে ভারতের ফুটবলের পাওয়ার হাউস। অথচ সেই রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অস্থিরতা চরম পর্যায়ে। তা সত্ত্বেও তারা মাঠের লড়াইতে সেরা। কারণ সেখানে ফুটবলে রাজনীতি নয়, মেধার মূল্যায়ন হয়।
Advertisement
অন্যদিকে, বাংলায় নার্সারি ও বয়সভিত্তিক লিগের আধিক্য থাকলেও সেখানে স্বচ্ছতার অভাব এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব প্রকট। আমাদের লিগগুলো এখন কেবল ‘ফরমালিটি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের মতো ক্লাবগুলোর জুনিয়র টিমে এখন ভিনরাজ্যের ফুটবলারদের ভিড়। তৃণমূল স্তরে বিনিয়োগের অভাব আছে বটে।তবে, বাংলার স্কাউটিং ব্যবস্থা মৃতপ্রায়। পাড়ায় পাড়ায় প্রতিভা খোঁজার বদলে ভিনরাজ্যের তৈরি ফুটবলার তুলে এনে চটজলদি ট্রফি জেতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সাব-জুনিয়র স্তরে বাংলা চ্যাম্পিয়ন হওয়া সত্বেও সেই ছেলেগুলো কেন বড় ক্লাবে জায়গা পাচ্ছে না? কেন তাদের ধারাবাহিক সুযোগ না দিয়ে বাইরের ফুটবলার আনা হচ্ছে? এটি পরিষ্কারভাবে বাঙালি ফুটবলারদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার একটি চক্রান্ত। আমরা নিজেদের পিঠ চাপড়াচ্ছি এই ভেবে যে কেরল বা মণিপুরের পরেই আমরা আছি। কিন্তু বাস্তব হলো, আমরা লড়াইয়ে টিকে নেই, আমরা খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। বয়সভিত্তিক এত লিগ থাকার পরেও যদি মানসম্পন্ন ফুটবলার উঠে না আসে, তবে বুঝতে হবে গলদ গোড়াতেই। ভিনরাজ্যের ফুটবলার এনে সাময়িক সাফল্য মিললেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বাংলার ফুটবলের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিচ্ছে।
সাব-জুনিয়র স্তরে চ্যাম্পিয়ন হওয়া প্রমাণ করে বাংলায় প্রতিভা আছে। ক্লাবগুলোর কর্মকর্তাদের সস্তা জনপ্রিয়তার মোহ ত্যাগ করে যদি এখনই একাডেমি এবং স্কাউটিংয়ে নজর না দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে আইএসএল-এ বাঙালি ফুটবলারের সংখ্যা ১৫ থেকে শূন্যতে নামতে সময় লাগবে না।
আইএসএলের ১০ ম্যাচে ১৬০ জন ভারতীয় ফুটবলার মাঠে নেমেছে। তাতে বাঙালি ফুটবলারদের সংখ্যা ১৫! এর মধ্যে প্রীতম কোটাল থেকে শুভাশিস বসুরা ফুটবল কেরিয়ারের শেষ লগ্নে, এমন ফুটবলার ৭জন। তবে নতুন মুখ কোথায়? তৃণমুল স্তরের ফুটবল আছে কিন্তু ফুটবলার বাজার কর্তা নেই।
Advertisement



