• facebook
  • twitter
Saturday, 7 March, 2026

‘আমারও একটা নির্জন বারান্দা ছিল–’

এভাবেই এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় কবি স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁর নিজস্বতার, যা একজন মনস্ক পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ না করে পারে না।

বিশ্বনাথ গরাই

সেই কবিতাই রসোত্তীর্ণ বা সার্থক যা কালোত্তীর্ণ, বহুকাল পরেও যা পাঠকের মনে সাড়া জাগাতে পারে। কবি তাঁর সৃষ্টিকুশলতায় পলাতক কোনো মুহূর্তকে চিরন্তনের মহিমায় উত্তরণ ঘটানোয় সর্বদাই সচেষ্ট থাকেন। তাঁর হৃদিমাঝে যত্নলালিত একটি কল্পনাকুসুম উঁকি মারে, হয়তো বা জাগরণে-ঘুমে-স্বপ্নে: আমি কি এই সার্থকতা অর্জন করেছি নাকি ভবিষ্যৎ তার বিচার করবে।

Advertisement

আমার হাতের কাছে ‘অসমাপ্ত কনসার্ট’, কবি শ্যামাশ্রী মুখোপাধ্যায়। অতিপ্রজ এই কবির দেশে আরও একজন কবি! তা ভেবেই এই কাব্যগ্রন্থটি সংগ্রহ করেছিলাম নভেম্বরে এক লিটল ম্যাগাজিন মেলায়। পরবর্তীকালে একান্তে পাঠাবস্থায় তাঁর সম্পর্কে দু’চার কথা গোচরে আসে চতুর্থ প্রচ্ছদে তাঁর পরিচিতির মাধ্যমে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করি। এরপর কবিতায় মনোনিবেশ। প্রথম কবিতা ‘কথারা’— টানটান বাক্যবন্ধে শেষের দুটি অনুচ্ছেদ যে কোনও পাঠককে পরবর্তী কবিতাপৃষ্ঠায় মনোনিবেশ করবে বলে আমার বিশ্বাস:
‘শুধু জানতে চাই তোমার এই চুপ হয়ে যাওয়া কথাদের…
যে কথার আওয়াজ শুনতে পাই এখনও
যে আওয়াজের কাছে আমি ঋণী
যে শব্দরা আমায় স্নান করায় রোজ
আর নাভিকুন্ডে ফুটিয়ে তোলে বেনামী গোলাপ’

Advertisement

কবির জীবন সরলরৈখিক নয়— আছে কত যে উথালপাথাল আঁকাবাঁকা পথ: ‘গোলকধাঁধার মধ্যে খুঁজে ফিরি তোমায়…’ , আর তাই তো উদ্দিষ্ট আলোর বৃত্ত কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে যায়:
‘রাত্রি গভীর হলে তুমি হারিয়ে যাও কোথায়!
ঘন কুয়াশার ভেতর, তার গভীর ভেতরে
খুঁজে পাই তোমার প্রতিচ্ছবি’
কবি খুঁজে পান শুধুমাত্র প্রতিচ্ছবি— তাই তো তাঁরও সুখ-দুঃখ আলাদা। যিনি অনুধাবন করবেন, তাঁর কাছে কি পৌঁছুবে আলাদা দুঃখ একটা যন্ত্রণার মহানদী হয়ে?
‘একটা সুতীব্র যন্ত্রণা অনুভব করছি
মাত্র একদিনের সংলাপে এতটা ঘোর!’
কিংবা
‘অপরিশোধনীয় ঋণের মতো
প্রতিটি ছেড়ে ‘যাওয়া’ শিখিয়ে নেয় অনেক কিছু…’
সংগীত এই কবির জীবনচর্যায়, মননে, সাধনায়। তাই সেই অনুষঙ্গ বারবার ফিরে আসে তাঁর কবিতায়:
‘আহেরি ভৈরব শেষ হওয়ার আগে ছুঁয়ে গেল অস্পষ্ট ভোর
সমস্ত বন্দিশ শেষ হয়নি তখনও…’
কবির ‘নির্জন বারান্দা’য় পায়চারি করতে করতে, বহির্বিশ্বের পূর্ণতায় দৃষ্টিপাত করতে করতে কখন যে আত্মীভূত অপূর্ণতায় মন উদাস হয়ে যায়:
‘মনে পড়ে শত শত জন্ম আগে
আমারও একটা নির্জন বারান্দা ছিল—
শোক-তাপ সমস্ত কান্না পেরিয়েও
সোহাগি রোদ মেখে নিত সময়’
তখনই মনে হয়
‘সব অঙ্কের হিসাব মেলাতে নেই
শূন্য থেকে শুরু, শূন্যে শেষ সব প্যারাস্যুটই
অস্তিত্বহীন সীমারেখা’

মূলত সংগীতময় জীবন এই কবির। রবীন্দ্রসংগীতের জন্য পেয়েছেন দুটি উল্লেখযোগ্য পুরস্কারও। কবিতায় নিবেদিত হয়েছেন এই তো সেদিন— এই শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরু থেকে। এই স্বল্প সময়েই প্রেম-বিরহ-বিচ্ছেদ-প্রকৃতি ও প্রতিবাদের এই সুদৃঢ় বুনোটে সাজিয়েছেন তাঁর কবিতা। তিনি আশাবাদে বিশ্বাসী, হতাশা তাঁর প্রার্থিত নয়—
‘তোমার প্রতিটা আঘাত আমায় সজীব করেছে’

এভাবেই এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় কবি স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁর নিজস্বতার, যা একজন মনস্ক পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ না করে পারে না।

কবির ভিতর যে শক্তি তাকে চেতনার স্তর থেকে স্তরান্তরে নিয়ে যায় কবির তীব্রতম সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক অনুভবযোগ্য পর্যবেক্ষণ, অবিভাজ্য স্তরান্তর। খণ্ডিত ও বৈচিত্র্যমণ্ডিত উদ্ভাসনে কবিকৃতি টাল খায় নিঃসন্দেহে। এই কবির বীক্ষণ, বিশ্লেষণ ও সৃজনশীলতা এক বিশিষ্টতা অর্জন করেছে এই কাব্যগ্রন্থে।

প্রথম অনুচ্ছেদে যে কথা বলেছি, তারই রেশ টেনে বলি এই কবি অনেক দূর যাবেন, আমার বিশ্বাস। এবং ছন্দে মনোনিবেশ করবেন পরবর্তী পর্যায়ে, এই আশায় রইলাম।

অসমাপ্ত কনসার্ট
শ্যামাশ্রী মুখোপাধ্যায়
কৃতি এখন
প্রচ্ছদ: পিনাকী রায় (কণিষ্ক)
মূল্য: ১৫০.০০

Advertisement