দুটি কবিতা
সুভাষ সরকার
জীবিত কঙ্কাল
এই নৈঃশব্দ্য চুপকথা কয়। চুপচাপ দ্যাখে
এক মানুষের গর্হিত জুলুমে কীভাবে নিঃস্ব হয় আরেক মানুষ।
এই নৈঃশব্দ্যের মুখে, এই পতনের মুখে আমি
বুদ্ধিজীবী মানুষের ভূমিকায় কদর্য দেখেছি।
Advertisement
সৃষ্টির ধ্বংসকালে স্রষ্টার নীরবতা নরকের দরজা খুলে দেয়।
অভ্যাসে কুলীন যদি, অনভ্যাসে না-হয় চণ্ডাল।
তবেই মানুষ জাগে, অধিকারে দাবি তোলে সভ্যতার জীবিত কঙ্কাল।
Advertisement
সেই মুখ
নিমিত্ত ফুরিয়ে গেলে পৃথিবীতে সব আবাহন
বিসর্জনে যায়।
স্তিমিত আলোতে ফোটে সূর্যাস্তের অপলক চোখ
আদিগন্ত অন্ধকার ঘরে।
আবাহনে যতটা আনন্দ খুঁজি, ততটা কি বিসর্জন মুহ্যমান করে?
নিমিত্ত ফুরিয়ে গেলে সব জন্ম ছাই হয়ে অগ্নিশিখাস্রোতে
যে-মুখ ভাসিয়ে দেয় পারানির ঘাটে,
একমাত্র জল ছাড়া সেই মুখ আর কারো নজরে আসে না।
শ্মশান
সুনীল শর্মাচার্য
মরদেহ পোড়ে
চিতায়
দাউ দাউ
চণ্ডাল দাঁড়িয়ে একা
হাতে তার
দণ্ড প্রহার
শব পোড়ে আগুনে
থরথর কাঁপে বাতাস
চণ্ডাল
মদে মাতাল
সারারাত
শব নিয়ে খেলে
আগুনের উদ্ধার!
পর্ণমোচী শরীরে জন্মান্ধ ছায়া
বিকাশ চন্দ
কে কবে শুনেছে জন্মদশায় আগুন ফেরির গল্প
চাঁদের আলোয় উঠোন ভেজায় নিঃস্ব কান্নার নিঃশব্দ প্রপাত
নিশুতি রাত জানে প্রিয় অক্ষরের কলরোল
বুকের জমানো বাষ্পে উড়ে যায় আশাহত যৌবন
জ্যান্ত মমির শরীর উবে যায় উড়ে যায় গুঁড়ো-গুঁড়ো ছাই
জল আর মেঘের উৎপত্তি জানে না অনন্ত লাভাস্রোত
সিঁদুররাঙা বল লাফাচ্ছে উঠোন থেকে দেশ দেশান্তরে
কখন যেন বাঁধা পড়ে গেছি যাদু অক্ষের বলয়ে
এলোমেলো ভবিষ্যের পাতা ভেজায় প্রাণরস
ছায়াচ্ছন্ন ক্ষমতায় তাসের খেলা দেখায় সাহেব বিবি গোলাম
আহত শরীরের পাঁজরে ঝুলে থাকে বিক্ষত অক্ষরমালা
শ্রুতিস্বরে ডানা মেলে উড়ে যায় আত্মার পাখি
অস্তিত্বের আলো আজও ঠিকরে বেরোয় চোখের কোটরে
মৌলিক তালিকায় ঝুলে আছে অজস্র যৌগিক জীবন
ত্রিশঙ্কু চেহারায় দোল খায় শংসিত জীবনের প্রতিলিপি
পায়ে পায়ে মাড়িয়ে যায় পর্ণমোচী শরীরের জন্মান্ধ ছায়া
মধ্যবর্তী
সুনন্দ ভৌমিক
রাস্তা পার হওয়ার
আনন্দ উপলব্ধি করতে পারিনি কখনও
শরীর বাঁচিয়ে
ক্ষতের আস্বাদ খুঁজেছি বহুবার
চর্চায় জমেছে
আত্মগোপনের অভ্যেস
বরফকুচির মতো জ্যোৎস্নার মায়া
যন্ত্রণা গেঁথে
যে কাব্য হেঁটে যায় আজও
মেঠো আলপথে
ঘুম চোখে
তার হাত
ছুঁয়ে দেয় মালকোষ রাগ।
নৈশ অপেরা
রঞ্জন চক্রবর্তী
যতটা নেপথ্যে তুমি দৃষ্টির অগোচর ততদিন
শেষ দৃশ্যের পরেও ভেসে আসে আবহসংগীত
কুয়াশার চেয়েও ঘন এই অন্ধকার
ঢেকেছে নিবিড় রাত্রি, ছেয়েছে প্রান্তর
তবু কি বোঝোনি কিছু নীরব ইশারায়,
বৃষ্টির অভাবে জল শুকিয়ে গেলেও, বুকের ভেতর
অন্তঃসলিলা ফল্গু বয়ে যায়
তুমি নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে
স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে দেখ,
কালপুরুষের মৃতদেহ হয়ে উঠবে প্রত্যক্ষগোচর
এই নৈশ অপেরা এই একান্ত অনুভব
আমাদের জন্য কোন রহস্য রেখে যায়?
অমিল পয়ারে
শ্যামলকান্তি মজুমদার
না-কবিতা থেকে কবিতার দিকে যেতে
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি
পথে পড়ে থাকা অজস্র শিমুল ফুল
থ্যাঁতলানো মিয়ানো পায়ে মাড়ানো—
এই কি বসন্ত তবে?
ধুলো ধোঁয়ায় বিবর্ণ দু’চোখ
অবাঞ্ছিত রাকা আঁকা প্রচ্ছদ
বিদায়বর্ষের ডায়েরির পাতা
ভরে তুলি অমিল পয়ারে।
জলশব্দ
সন্তর্পণ ভৌমিক
রাত্রে এখন শব্দ শুনি অবাক মানসিকতার
এবং দেখি রাত্রেচরা পশু
আমার পাশে ঘুমিয়ে থাকে
অবাক দেহে, স্বপ্ন বিবরণে
এ যে আমার রক্তশুদ্ধ
মেহনপ্রিয় রাজরাজন্যের অন্ধতম বিকার
রাত্রে এখন সময় হয় না
জলের গল্প শোনার
আমি রাত্রিশেষে শব্দ শুনি গূঢ়
আওয়াজগুলো নিরেট কিছু গুহা ও গর্তের
মৃত্যুদিনে কেমন হলো জন্মপরিচিতি
আমি মূল্য দিয়ে মানুষ কিনি, পঙ্গু অতিথি।
দৈর্ঘ্য
কিরণময় পাত্র
ব্যাসার্ধ বেড়ে গেলে বৃত্তের বহর
যায় বেড়ে।
বিশ্বটাও যেতে পারে ঢুকে,
কেন্দ্র থেকে ব্যাসার্ধ যতো যায় মাত্রা ছেড়ে ছেড়ে।
বৃত্তের সীমা ব্যাসার্ধের হাতে,
সম্পর্কের বৃত্তেও এই গাণিতিক মতে।
ব্যাসার্ধ কমে কমে বিন্দু হয়ে যায়,
আমাদের সম্পর্ক আজ অসহায়।
বৃত্ত হেরে গিয়ে বিন্দু হয়ে গেছে,
অনন্ত সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করে আছে।
বিন্দু ছেড়ে ব্যাসার্ধের দৈর্ঘ্য যদি বাড়ে—
বসন্তবাতাস এলে গাছের হৃদয় যেমন নড়ে।
Advertisement



