• facebook
  • twitter
Monday, 19 January, 2026

মানুষের রূপকথা

রাত হলে তার ঘুম ভাঙল। দেখে, নদী তখনও কুলকুল করে বয়ে চলেছে। তাতে ছায়া ফেলেছে রুপোলি চাঁদ। চাঁদকে বুঝতে পারে না সে।

কাল্পনিক চিত্র

সংহিতা বন্দ্যোপাধায়

অনেক অনেক বছর আগের কথা, পৃথিবী সৃষ্টির পর কয়েকশো বছর ধরে চলল লাগাতার বৃষ্টি আর বৃষ্টি। তৈরি হল বড় বড় সমুদ্র। এই বৃষ্টি থেমে গেলে, তার মধ্যে জেগে উঠল প্রথম প্রাণের স্পন্দন। জলের মধ্যে থেকে জন্ম নিল প্রাণী আর উদ্ভিদ, জেগে উঠল ডাঙা।

Advertisement

তারপর আরও বহু বছর কেটে গিয়েছে, প্রথম মানুষ যখন জন্মাল, সে কিন্তু এ সবের কিছুই জানত না। সে ছিল বড় একা। সবার থেকে আলাদা, নিজের এই দেহটার প্রয়োজন মেটাতে সে খিদে, তেষ্টা বুঝতে শিখল, শীতকালে তৈরি করল পাতার পোশাক, আর কৌতূহল মেটাতে গিয়ে একদিন চিনে ফেলল আগুন। কিন্তু হলে কী হবে, দুঃখকে সে বুঝতে পারেনি তখনো, আনন্দকেও নয়! মন খারাপ হলে কী করতে হবে, তার জানা নেই। মাঝে মাঝে একা লাগে ভীষণ। আঘাত লাগলে, শরীরে ব্যথা পেলে বা শরীর খারাপ লাগলে কান্না পায়! চোখ দিয়ে নোনতা নোনতা জল পড়ে, সে চেটে দেখেছে। গলা ধরে আসে, অকারণেও অনেক সময় কষ্ট হয়, সে বড় গোলমেলে ব্যাপার। বুকের ভিতরটা কেন কে জানে, হু-হু করে ওঠে।

Advertisement

আবার কখনো মজাও হয়। ধরো, ভীষণ খিদে পেয়েছে, হঠাৎ সে পেয়ে গেল দারুণ সুস্বাদু এক ফলের সন্ধান! ব্যাস! মানুষকে আর পায় কে! পেট ভরে খেয়ে, তখন তার কী আনন্দ, কী আনন্দ।
আবার যখন সে প্রথম আগুন আবিষ্কার করে ফেলল! কী পেল তার মধ্যে কে জানে! খিদে-তেষ্টা ভুলে, খালি আগুন জ্বালিয়েই তার কেটে গেল কতগুলো দিন। খালি চকমকি ঠোকে আর আগুন জ্বালে! কী কাণ্ড বল দেখি! এবার শুরু হল সেই আগুনের ব্যবহার। এই সময়ে তার খুব আনন্দ হতো। কেমন অদ্ভুত ধুকপুক করত বুকের মধ্যে। দু-হাত তুলে নাচতে ইচ্ছে করত। মনে হতো সে এখন এই জল, জঙ্গল, মাটি, গাছ, আর অন্য সবকিছুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এরপর সে খুঁজে পাবে আরও নতুন কিছু, আগুনে মাংস পুড়িয়ে খাবে, শীতে কাঁপবে না। নিশ্চিন্ত হল অনেকটা, খুশিও হল, কিন্তু তার মন এখানেই থামল না। সেখানে চলছে নানা অদ্ভুত অদ্ভুত খেলা। ফুল ফুটলেও আনন্দ হয় তার, পাখি ডেকে উঠলেও মনটা বেশ খুশি খুশি লাগে। মেঘ করলে কখনও দুঃখ জাগে তার, আবার যখন বৃষ্টি আসে, মন বলে, আর একটা মানুষ থাকলে বেশ হত! পাখিকে নকল করে, সে গাইতে শিখল গান। বাতাসের শব্দে, সে চিনতে শিখল সুর। পেখম সাজিয়ে নিয়ে ময়ূর যখন নাচে, সেও দুলে দুলে নাচে। শুধু কী তাই? ফুলের রঙ, গাছের রঙ দেখে তার পাপড়ি আর পাতা থেকে সে তৈরি করল রঙ। তার মনের মধ্যে কী হল কে জানে? সে ছবি আঁকতেও শিখে গেল একদিন। দুঃখের দিনে তার ছবি থেকে জন্ম নিত নীল আর গাঢ় সবুজবরণ মেঘ, যা দেখত সবটা তো সে আঁকতে পারত না! অনেকটাই থেকে যেত ইচ্ছেয়, কিন্তু চারিদিকের পৃথিবীতে সে সব খুঁজে পেত না, কিন্তু সেই রঙগুলো তাকে ঘুমের মধ্যেও তাড়া করে বেড়াতে লাগল, তাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগল আরও রঙের সন্ধানে। সে তখন কী করে! গাছের ডাল কেটে সে তৈরি করল বাঁশি, তাতে ফুঁ দিতে সেই সুর তাকে ব্যথার সীমানায় পৌঁছে দিল। সেখানে দুঃখ আর সুখ মিলেমিশে একাকার। সেই না-পাওয়া রঙগুলো ফুটে উঠল তার গানের কথা আর সুর মূর্ছনায়, আর ছড়িয়ে গেল নাচের ছন্দে। মানুষ ভাবল, এ সব কেন হয়? তার মতো আর কারও তো হয় না, কারও নয়! সে ঠিক করল, পাহাড়ের কাছে যাবে। এত বড় পাহাড়, নিশ্চয়ই সব জানে। পাহাড়কে সে জিজ্ঞাসা করল সব কথা, কেন এমন হয় তার! সব শুনে পাহাড় বলল, ‘এ আর নতুন কথা কী? আমারও তো দুঃখ আছে অনেক, সে সব দুঃখ জমতে জমতে পাথর! সেই থেকেই তো অচল হয়ে আছি কত হাজার বছর!’
‘এত দুঃখ নিয়ে কী কর তুমি? তুমি তো কাঁদ না?’
জানতে চাইল সেই মানুষটি।
‘নাহ! কাঁদব কেন? কেঁদে কি দুঃখ লাঘব হয়? কাঁদি না আমি। তবে খুব কষ্ট হলে ফুঁপিয়ে উঠি, তখন আমার জন্য কাঁদে মেঘ, কাঁদে বৃষ্টি, আমি তখন পাথর সরিয়ে দিই, আমার মন খুলে জন্ম নেয় নদী, ছোট ছোট ব্যথায় নামে ঝরনা! ওরা আমার দুঃখ নিয়ে ছুটে যায় সমতলের দিকে, আমার কষ্ট কমে যায়।’
‘হুঁ।’
বলল মানুষ।
‘কিন্তু আমার দুঃখে কাঁদবে কে, আমার তো কেউ নেই! তোমার কাছে উত্তর পেলাম না, মন ভরল না আমার।’ পাহাড়ের কাছ থেকে সরে এল সে, এবার নদীর পালা। নদী এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তার সময় কোথায়! শুধু খিলখিল করে হাসতে হাসতে, ছুটে চলেছে পাহাড় থেকে সমতলে।
‘তোমার দুঃখ হয় না, নদী-ই-ই-ই—’
তবু তার কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল সেই মানুষ। দূর থেকে চেঁচিয়ে ডাকল সে।
‘কখনও আনন্দ হয় কি-ই-ই-ই-ই-ই—’
আর যায় কোথায়, নদী লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে উথলে উঠে উত্তর দিল,
‘হয় তো, হয় তো! আলবাত হয়! তবে কোনটা দুঃখ, কোনটা আনন্দ, আমি অতো বুঝতে পারি না!’
এই বলে, পাথরের ওপর ফেনা তুলে লাফিয়ে উঠল সে।
‘কেন এমন হয় জানো?’
মানুষের প্রশ্নে এবার নদী ঢেউ তুলে হেসে উঠল।
‘এ তো ভারী অদ্ভুত কথা! এসব তো হবেই, তবে কী জানো, এই সব কিছুর চেয়ে বড় হচ্ছে চলা, পাথর ডিঙিয়ে, পাহাড় ছাপিয়ে, কূল উপচে চলা—’
চেঁচিয়ে বলল সে।
‘এ আবার কী!’

গজগজ করতে করতে নদীর সঙ্গে চলতে গিয়ে মানুষ পৌঁছে গেল উপত্যকায়। সেখানে ঘন সবুজ গাছপালারা ছায়া ফেলেছে নদীর জলে। নদীর বুকে জমে উঠেছে অনেকখানি পলি, নানা রঙের বালি আর পাথর। তার মধ্যে খেলা করছে রঙিন মাছ, শামুক, সাপ, শুশুক, ব্যাঙাচি, আরও অনেক প্রাণী। উড়ে আসছে মাছরাঙা, আর নানা পাখির দল। নদী এখানে অনেক শান্ত হয়ে এসেছে। সে এখন কিছুটা গভীর আর স্থিমিত।
‘তোমার ক্লান্ত লাগছে না?’
জিজ্ঞাসা করল সেই মানুষটি।
‘কই না তো! বরং আনন্দ হচ্ছে! দেখছ না আমার আনন্দ ছড়িয়ে আছে পলিতে? সবুজ হয়েছে গাছপালা আমার আনন্দে! পাড় ভাঙছে খুশির বনের মাটির, ঝাঁপিয়ে পড়ছে আমার জলে, দেখছ না ওই মাছগুলো, সাপ, শুশুক, কাছিম, সবাই এমনকী পাখিরা কত আনন্দ করছে আমি এলাম বলে!’
মানুষ কিছুই বুঝতে পারল না।
‘তাতে আমার কী? আমার দুঃখ কে নেবে?’
মনে মনে ভাবল সে।
‘কে আসবে আমার আনন্দের ভাগ নিতে?’
চলতে চলতে বনের ধারে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল এক সময়।

রাত হলে তার ঘুম ভাঙল। দেখে, নদী তখনও কুলকুল করে বয়ে চলেছে। তাতে ছায়া ফেলেছে রুপোলি চাঁদ। চাঁদকে বুঝতে পারে না সে। তবু চাঁদকে দেখলে তার আনন্দ হয়। তার চেয়েও ভালো লাগে চাঁদের আলো। বড় স্নিগ্ধ সেই আলো, বড় সুন্দর। চাঁদ সেই কোন কাল থেকে জেগে আছে!
‘ওর আনন্দ হয় না? আর দুঃখ!’ মানুষ ভাবল জিজ্ঞাসা করা যাক।
চাঁদকেও জিজ্ঞাসা করল সে। সব শুনে চাঁদ চোখ টিপলো।
‘জানতে চাও? তবে সূর্যের কাছে যাও। ওই তো আমায় আলো দেয়, আর তারারা সবাই তো ওরই সঙ্গী। খুশি আমি হয়েই থাকি’—
একটু হেসে বলল সে।
‘এই যে!’
বলতেই ওর অনেকখানি জ্যোৎস্না ঝরে পড়ল।
‘আর দুঃখ? কাঁদো না তুমি?’
‘ওরে বাবা! দুঃখ হলে তখন আমি অন্ধকারে। এক্কেবারে লুকিয়ে পড়ি। কেউ তখন, মানে সূর্য তখন আমায় আলো দেয় না যে!’
‘সূর্যের কাছে কে যাবে!’
গজগজ করল মানুষটি।
‘যা রাগ! আগুনে গনগন করছে কেন কে জানে!’

ভাবতে ভাবতে রাত পার হয়ে সূর্য উঠে গেল, প্রথমে হাল্কা গোলাপি, তারপর হলুদ আকাশ, শেষমেশ কমলা লাল হয়ে গেল। শেষকালে ঝলমলে সোনালি আর সাদা আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল। গেয়ে উঠল পাখি, ফুটে উঠল ফুল।
‘এই তো দারুণ আনন্দ! খুব মজায় আছে সূর্য, মনে হল তার। সকালবেলার নরম আলোয় কত আনন্দ!
‘আর দুঃখ?’
‘কেন, দেখতে পাচ্ছ না?’
গমগমে গলায় উত্তর দিল সূর্য। কত যন্ত্রণায় জ্বলে উঠে আলো দিয়ে যাচ্ছি আমি আর শুধু সেই আলোর জন্য সবাই আমায় কেমন খুশি মনে ডাকছে!’
‘যাচ্চলে! এও দেখি সেই একই কথা বলে! তা হলে আমি যাই কোথায়! ভাবল মানুষ। আমার তো কেউ নেই! ভাবতে ভাবতে আবার চলতে লাগল। চলতে চলতে তার সামনে পড়ল মরুভূমি। মরুভূমির গরম দেখে তাকে ভয়ের চোটে আর প্রশ্ন করল না সে, কে জানে, কিছু জানতে চাইলে হয় তো বলবে, ‘এই বালিই আমার দুঃখ আর কাঁটা গাছ, সেই গাছেও কেমন সুন্দর ফুল ফুটেছে, ওটাই তো আনন্দ! আর আছেই তো ময়ূরের দল, উট, এই সব ভাগ করে নেওয়ার জন্য!’
তাহলে? এবার তাহলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া যাক। সবচেয়ে বুড়ো আর সবচেয়ে বিশাল সে। নিশ্চই সব জানে! আর তাছাড়া, সে তো একদম একা, কে আর আছে ওর? আমার মতো— ভাবল মানুষ। তারপর চলল সমুদ্রের সঙ্গে দেখা করতে। সব শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সমুদ্র, বালির ওপর তার ঢেউগুলো আছড়ে পড়ল, বহুদূর এপার ওপার দেখা যায় না তার। নীলচে সবুজ জল, শুধু ঢেউ আর ঢেউ! বালির উপর ছড়িয়ে আছে শামুক, ঝিনুক, দেখেই মনটা শান্ত হয়ে গেল মানুষের।

তোমায় বলি শোন, দুঃখ আমার অনেক, তাই তো আছড়ে পড়ছে এই ঢেউ আমার বালুচরে নিরন্তর! আমি কেঁদেই চলেছি, কারণ আমার বুকে ওদের দুঃখ ঢেলে দিচ্ছে হাজার হাজার নদী প্রতিদিন। তাদের ব্যথায় বেজে উঠছে ঝড়, তবে আনন্দও আছে। তাই তো আমি এত ব্যাপ্ত! ছড়িয়ে গিয়েছি আকাশ আর মাটির সীমা ছাড়িয়ে সমস্ত আড়াল ভেঙে অনন্তের দিকে! নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পারলে তবেই আনন্দ, যন্ত্রণা যখন তখন সুপ্তি ভাঙা মুক্তো হয়ে যাবে। যাও মানুষ, সবার সঙ্গে দুঃখ আর আনন্দ ভাগ করে নাও। আমাদের দেখে শেখো, সাদা ফেনার দাড়ি নেড়ে মানুষকে আশীর্বাদ করল সমুদ্র। মানুষটি এতক্ষণে শান্ত হয়ে ফিরে এল নিজের ডেরায়। এইবার তার জ্ঞানচক্ষু খুলে গেছে। সত্যি তো, এরা সবাই তো তার আপনার জন, কেমন করে সে এসব ভুলতে বসেছিল! এই জন্যই তো গাছের কাছে দোল শিখেছে সে, ফুল ফোটানোর রহস্য শিখেছে। আকাশে দেখেছে রঙ। তার মানে, দুঃখের রঙ যদি মেঘের মধ্যে থাকে, মেঘেরও দুঃখ নিশ্চই আছে তাহলে!

খুশি যদি ফুল ফুটলে হয়, তাহলে ফুলও তো হাসছে! এই সহজ কথাটা কেন এতদিন বুঝতে পারেনি সে! সে তো একা নয়, এরা সবাই তো তার বন্ধু। লাফাতে লাফাতে পথ চলতে লাগল সে, চলার পথে গাছের পাতায় হাত বাড়িয়ে আদর করে দিল। খুশিতে দুলে উঠল গাছ, গান গাইল হাওয়া, মৌমাছি গুনগুন করে উঠল, তার সঙ্গ নিল পাখিরা। বনে দেখা হতে, আলতো করে হরিণের কান নাড়িয়ে দিল মানুষ। হরিণ শিং নেড়ে কাছে এসে দাঁড়াল। বাঘের পিঠেও হাত বোলাল সে, বাঘ আলতো করে চেটে দিল তাকে। ফুলেরা হেসে উঠল এক সঙ্গে! বৃষ্টি নামল হঠাৎ খুব, আকাশ উপুড় করে। বৃষ্টিতে সবাই ভিজল একসঙ্গে। রোদে আবার শুকিয়ে নিল নিজেদের। মানুষ দেখল, তার আর কোনও দুঃখ নেই। নেই কোনো একার আনন্দ! সবটাই সকলের সঙ্গে সবার মধ্যে ভাগ করে নিতে সে এখন শিখে গেছে। এই হল মানুষের রূপকথা! যদি ভালো করে তাকিয়ে দেখো, চারপাশে, মন খারাপের সময়, দেখবে— আকাশ, বাতাস, বিড়াল, কুকুর, এমনকী পাখি আর গাছরাও তা জানে। আর আনন্দ? সে তো ছড়িয়ে আছে সবার মাঝখানে, তাই না?

Advertisement