• facebook
  • twitter
Saturday, 10 January, 2026

‘দ্য স্টেটসম্যান ভিন্টেজ ও ক্লাসিক কার র‍্যালি’র ইতিহাসে মহারাজার প্রতিশোধের গল্প

মহারাজা প্রভাকর ওই গাড়ি নির্মাতা সংস্থাকে ক্ষমা করে দেন। সেই সঙ্গে আবর্জনা সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত গাড়িগুলিকে আবার আগের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনেন।

মহারাজা প্রভাকর। ফাইল চিত্র

আগামী ১১ জানুয়ারি ‘স্টেটসম্যান ভিন্টেজ ও ক্লাসিক কার র‍্যালি’র ৫৫তম সংস্করণ কলকাতায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এই র‍্যালি শুধু পুরনো গাড়ির প্রদর্শনী নয়, ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ১৯২০ সালের আগে নির্মিত রোলস রয়েস ফ্যান্টমের মতো গাড়িগুলোও এই র‍্যালিতে উপস্থিত থাকবে। ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনামলে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল। একশো বছরেরও বেশি পুরনো একাধিক রাজকীয় গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে ঔপনিবেশিক যুগের এমন কিছু কাহিনী, যা আজও বিস্ময় জাগায়। সেইসব গল্পের অন্যতম আলওয়ারের মহারাজা জয়সিংহ প্রভাকরের উল্লেখযোগ্য প্রতিশোধ।

প্রসঙ্গত, ভারতীয় রাজপরিবারগুলির ভিন্টেজ গাড়ির প্রতি দুর্বলতা নতুন নয়। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে লন্ডনের মেফেয়ারের একটি নামী গাড়ির শোরুমে আলওয়ারের মহারাজাকে যে অপমানের মুখে পড়তে হয়েছিল, তা ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। শোনা যায়, সাধারণ পোশাকে শোরুমে ঢোকায় কর্মীরা তাঁকে গুরুত্ব দেননি। তাঁকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, তাঁর পক্ষে ওই দামী গাড়ি কেনা সম্ভব নয়। এই অপমান মহারাজার মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল।

Advertisement

এর পরেই পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে ঘটে সেই নাটকীয় ঘটনা। রাজকীয় পোশাকে, বিশাল অনুচরবর্গ নিয়ে মহারাজা ফের শোরুমে হাজির হন। সেদিন একসঙ্গে সাত থেকে দশটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনেন তিনি। এর মধ্যে ছ’টি গাড়ির দাম তিনি তখনই মিটিয়ে দেন। বাকি কয়েকটির মূল্য ভারতে পৌঁছনোর পর তিনি পরিশোধ করেন। এরপর সমস্ত গাড়ি পাঠানো হয় ভারতে, আলওয়ারে।

Advertisement

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ব্রিটিশ গর্বের প্রতীক সেই রাজকীয় গাড়িগুলিকে মহারাজা ব্যবহার করতে শুরু করেন শহরের আবর্জনা তোলা ও রাস্তা পরিষ্কারের কাজে। বিশ শতকের প্রথম দিকের একাধিক ফ্যান্টম মডেলের গাড়ি রাজপথে নামতে থাকে ঝাড়ু ও ময়লার বাক্স নিয়ে। রাজকীয় আভিজাত্য ছিনিয়ে নিয়ে সেগুলিকে সাধারণ ব্যবহার্য যানবাহনে পরিণত করা হয়। আলওয়ারের রাস্তায় সারি সারি রাজকীয় গাড়িকে আবর্জনা সংগ্রহ করতে দেখা যায়— সে যুগে এই দৃশ্য ছিল একবারে অভূতপূর্ব।

মহারাজা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, বিশ্বের দামি ব্র্যান্ডের এই গাড়ি তাঁর রাজ্যে নিছক ময়লা আবর্জনা ফেলার কাজে লাগে! রাজার সেই উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল। এই দৃশ্য দেখে আলওয়ারের মানুষের মধ্যে হাসির হিল্লোল ওঠে। সেই খবর সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়। তৎকালীন সময়ে বিশ্ববিখ্যাত এই অভিজাত গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থার নামে রীতিমতো বদনাম শুরু হয়ে যায়।

এই খবর ইউরোপে পৌঁছতেই সংশ্লিষ্ট গাড়ি নির্মাতা সংস্থার ভিতরে যথেষ্ট অস্বস্তি তৈরি হয়। তাদের আশঙ্কা ছিল, এই ঘটনায় তাদের সুনাম ও বিক্রি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শেষ পর্যন্ত মহারাজা জয়সিংহ প্রভাকরের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়ে ওই শোরুমের কর্মীর আচরণের জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়। শুধু তাই নয়, সম্মান ফিরিয়ে আনতে তাঁকে আরও কয়েকটি নতুন গাড়ি বিনামূল্যে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

মহারাজা প্রভাকর ওই গাড়ি নির্মাতা সংস্থাকে ক্ষমা করে দেন। সেই সঙ্গে আবর্জনা সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত গাড়িগুলিকে আবার আগের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনেন। সেদিন অপমানের জবাব তিনি নিজের মতো করেই দিয়ে দিয়েছিলেন—শান্ত, অথচ রাজকীয় ভঙ্গিতে।

এই ধরনের ইতিহাসই ‘স্টেটসম্যান ভিন্টেজ ও ক্লাসিক কার র‍্যালি’কে আলাদা গুরুত্ব দেয়। আগামী ১১ জানুয়ারি এই র‍্যালির সূচনা হবে হেস্টিংসের রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব থেকে। সকাল ন’টা দশ মিনিটে পতাকা নেড়ে যাত্রা শুরু হবে। র‍্যালির পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও ব্যবস্থা থাকছে। পুরনো গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর রাজকীয় স্মৃতির মেলবন্ধন দেখতেই ভিড় জমাবেন কলকাতার মানুষ— এমনটাই আশা আয়োজকদের।

Advertisement