কেরলে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভি ডি সতীশনের নাম ঘোষণা করল কংগ্রেস নেতৃত্ব। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এবং কেরল দায়িত্বপ্রাপ্ত দীপা দাশমুন্সি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অজয় মাকেন, মুকুল ওয়াসনিক এবং জয়রাম রমেশ-সহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব।
দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট মোট ১০২টি আসনে জয়লাভ করে। তবে ফল ঘোষণার পর প্রায় ১০ দিন কেটে গেলেও মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে দলীয় অন্দরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনার পর পরিষদীয় দলের নেতা হিসেবে ভি ডি সতীশনকেই বেছে নেওয়া হয়।
মুখ্যমন্ত্রীত্বের দৌড়ে ছিলেন আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কংগ্রেস সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল এবং প্রবীণ নেতা রমেশ চেন্নিতালা। প্রাথমিকভাবে কংগ্রেস পরিষদীয় দলের একাংশ বেণুগোপালের নাম প্রস্তাব করলেও, অন্য একটি অংশ সতীশনের পক্ষে মত দেয়। তাঁদের যুক্তি ছিল, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ইউডিএফের বিপর্যয়ের পর সংগঠনকে পুনর্গঠন করে নির্বাচনী সাফল্যের পথে ফিরিয়ে এনেছেন সতীশনই।
দলের ভিতরে দীর্ঘ টানাপোড়েন এবং একাধিক দফার বৈঠকের পর অবশেষে তাঁর নামেই সিলমোহর পড়ে। এর আগে দিল্লিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গের বাসভবনে রাহুল গান্ধী-সহ শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায় ৪০ মিনিট বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পরই সিদ্ধান্ত হয় যে, পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর নাম বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হবে।
ঘোষণার পর জানানো হয়েছে, ভি ডি সতীশন কেরলের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তবে তাঁর শপথ গ্রহণের নির্দিষ্ট তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কংগ্রেস কেরলে সংগঠনকে আরও সুসংহত করার বার্তা দিল।
ভিডি সতীশনের রাজনৈতিক উত্থানের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে তাঁর ধারাবাহিক লড়াই এবং তথ্যভিত্তিক রাজনীতি। বিরোধী দলনেতা হিসেবে বিধানসভার ভিতরে ও বাইরে তিনি যেভাবে সরকারকে চাপে রেখেছিলেন, তা কংগ্রেস হাইকমান্ডের বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছিল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তিনির্ভর বক্তব্য, সংযত রাজনৈতিক ভাষা এবং তথ্যসমৃদ্ধ আক্রমণের কৌশল কেরলের তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণের এই আস্থাই শেষ পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
১৯৬৪ সালের ৩১ মে এর্নাকুলাম জেলার নেত্তুরে জন্ম সতীশনের। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। কেএসইউ-এর হাত ধরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। পরবর্তীতে ছাত্র সংগঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে দক্ষ সংগঠক ও বক্তা হিসেবে দ্রুত পরিচিতি পান। এনএসইউআই-এর জাতীয় সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন কৃতী। থেভারা স্যাক্রেড হার্ট কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর রাজাগিরি কলেজ থেকে এমএসডব্লিউ এবং এর্নাকুলাম গভর্নমেন্ট ল’ কলেজ থেকে এলএলবি করেন। পরে তিরুবনন্তপুরমের কেরালা ল’ অ্যাকাডেমি থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেন।
১৯৯৬ সালে প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হলেও ২০০১ সালে পারাভুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে রাজনীতিতে শক্ত ভিত গড়ে তোলেন। এরপর ২০০৬, ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১— প্রতিটি নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে জয় পান তিনি।
২০২১ সালে এলডিএফ টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর কংগ্রেস ‘প্রজন্মগত পরিবর্তন’-এর পথে হাঁটে এবং সতীশনকে বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব দেয়। সেই সময় ইউডিএফ জোট ছিল চরম হতাশার মধ্যে। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ বছরে সতীশন বিরোধী রাজনীতিকে নতুন রূপ দেন।
ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে তিনি জোর দেন জবাবদিহিতা, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের মতো ইস্যুতে। তাঁর নেতৃত্বেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ইউডিএফ ১০২টি আসন জিতে নিরঙ্কুশ জয় পায়। রাজনৈতিক মহলের মতে, শান্ত অথচ দৃঢ় নেতৃত্ব, সংগঠন গঠনের দক্ষতা এবং তৃণমূল স্তরের কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগই সতীশনকে কেরলের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে দিয়েছে।




