নিজেকে কোনও নাম্বার দেওয়াই আমার সাজে না : দেবাদৃতা

Written by Sunita Das June 13, 2024 3:51 pm

সুনীতা দাস এবং দিয়াশা রায় বণিক 
‘জয়ী’,‘শ্রী কৃষ্ণ ভক্ত মীরা’, ‘আলোছায়া’ র পর  ‘মিঠিঝরা’ ধারাবাহিকে ‘নীলাঞ্জনা’-র চরিত্রে নিজের আলাদা পরিচয় সৃষ্টি করেছেন সকলের প্রিয় দেবাদৃতা বসু৷ ছোট পর্দার আগে অবশ্য থিয়েটারে হাতে খড়ি৷ থিয়েটারে বাবার হাত ধরে পথ চলা শুরু করার পর আজ একটু একটু করে নিজের কর্মজীবন এর শিখরে পৌঁছচ্ছেন সঞ্জয় বসুর জ্যেষ্ঠ কন্যা দেবাদৃতা৷ নাচ, থিয়েটার, অভিনয়, সমান তালে প্রাণোচ্ছল, চোখে অফুরন্ত স্বপ্ন সঙ্গে ঘোর আশাবাদী দেবাদৃতা দৈনিক স্টেটসম্যানকে জানালেন তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র, মূল লক্ষ৷

১. গত  বছর শেষ থেকে তোমায় ‘মিঠিঝরা’ ধারাবাহিকে দেখা যাচ্ছে  মেজো বোন নীলাঞ্জনার চরিত্রে৷ কেমন লাগছে এই চরিত্রে অভিনয় করতে ?
— আমি যে চরিত্রই পাই না কেন প্রতিটা চরিত্রে খুব আনন্দের সঙ্গে কাজ করি এবং আমার এখন পর্যন্ত করা চরিত্রগুলি একে অপর থেকে আলাদা সেক্ষেত্রে প্রতিটা চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলাই অভিনেতার কাজ৷ খুবই ভালো লাগে, প্রচন্ড উত্তেজিত  থাকি৷ অভিনেতা হওয়ার সব থেকে বড়ো সুবিধা হলো যেকোনো চরিত্রকে প্রচন্ড এক্সপ্লোর করতে পারা৷ নীলাঞ্জনা চরিত্র তা এতোটাই  সুন্দর যে আমার খুব ভালো লাগছে এমন একটা চরিত্র করতে পেরে৷
২. অফস্ক্রিনে তোমাদের ধারাবাহিকের তিন বোনের মধ্যে কতটা টক ঝাল মিষ্টি সম্পর্ক ?
— বাস্তবে সব রকম মিলিয়ে মিশিয়ে৷  আমরা ডেফিনেটলি খুব ভালো বন্ধু যখন একসঙ্গে কাজ করি, মজায় কাজ করি এবিং কাজের বাইরে একে অপরের সাথে দেখা বা কথা খুব একটা না হলেও ফ্লোরে একসঙ্গে কাজ খুব মিলমিশ করে হয়৷ ফ্লোরে প্রত্যেকেই খুব ভালো, সুমন ও সপ্তর্ষি, যারা আমাদের মেল কাস্ট রয়েছে তাদের সঙ্গে খুব ভালো কাজ হচ্ছে এবং সবার খুব ভালো লাগছে এটাই খুব বড়ো ব্যাপার৷

৩. ‘জয়ী’ , ‘শ্রী কৃষ্ণ ভক্ত মীরা’, ‘আলোছায়া’, আরো বহু চরিত্র এবং এখন ‘মিঠিঝরা’ তে, এসবের মধ্যে নিজের বৃদ্ধি কতটা লক্ষ করেছো ?
— সেটা দেখো, নিজেকে আমি কতটা বিচার করতে পারবো জানিনা৷ কিন্ত্ত আমার মতে অভিজ্ঞতা খুব প্রভাব ফেলে৷ আমার মনে হয় আমি আমার কর্ম জীবনে চলার পথে অনেক কিছু শিখেছি৷ সেখানে আমার আগের থেকে উন্নতি হয়েছে কিনা জানিনা তবে সেটা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে৷

৪. বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে বাড়ির বেশ কিছু দায়িত্বও তোমার ওপরে বর্তায়৷ তারপর কিভাবে ঘর ও বাইরে দুটো একসঙ্গে টেক্কা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছ?
— আমার মতে বড়ো বা ছোটো ঠিক অতটা প্রভাব ফেলে না৷ আমাদের পরিবারে সংসার চালানোর দায়িত্বটা তা উভয়ের উপরই রয়েছে তো সময় দেওয়ার কথা যদি মনে হয়, অব্যশই, হয়ে ওঠে না কিন্ত্ত চেষ্টা সবাই করি, ইচ্ছে থাকে না, তা একেবারেই নয় কিন্ত্ত যেহেতু আমার ফ্যামিলি আমার কাছে প্রায়োরিটি, সবসময় নিশ্চই চেষ্টা করি৷

৫. তুমি যেহেতু এতোদিন ধরে এতোগুলো চরিত্রে কাজ করেছো, নিজেকে ১০ এর মধ্যে কত দেবে ?
— এইটা একেবারেই আমার বলা সাজে না, আমি তো বিচার করার একেবারেই কেউ নই, তবে আমি আমার চরিত্রতে প্রাণ ঢেলে দি, সাফল্যের বিচার দর্শকরাই করুক৷ আমি নিজেকে বিচার করি কিন্ত্ত আমার সেটা চার দেয়ালের মধ্যেই থাকে৷ আমি প্রতিটা চরিত্রে সমান কষ্ট করি, এবার তারমধ্যে কোনওটা দর্শকদের বেশি ভালো লাগে কোনওটা কম৷

৬. এখন পর্যন্ত তোমার নিজের সব থেকে পছন্দের অভিনীত চরিত্র কোনটা?
— আমার সব থেকে পছন্দের বলা হলে প্রতিটি আমার সন্তানের মতো, ফলে আমার কাছে কোনটা বিচার করটা সত্যি খুব কঠিন৷

৭. নিজেকে কি ভাবে মোটিভেটেড রাখো?
— মোটিভেটেড রাখি বলতে আমি কাজ করতে এতোটাই ভালোবাসি যে আমায় কাজটাই আমাকে খুব ভালো রাখে, আমার আলাদা করে উৎসাহের প্রয়োজন পড়ে না৷ কাজ তা নিজেই আমার কাছে খুব বড় একটা মোটিভেশন৷ যখন আমি স্ক্রিপ্ট হাতে পাই, বা চরিত্রের মধ্যে ঢুকি তখন মনে হয় আরো ভালো করে কাজটা করি, তখন নিজের থেকেই সেই ভালো বাসার ফলে মোটিভেশন টা নিজের থেকেই চলে আসে৷

৮. তোমার সব থেকে প্রিয় মোটিভেশনাল উক্তি কি?
— কোথায় শোনা নয়, আমার নিজের একটা বিশ্বাস আছে৷ যে ঠিক জিনিস কখনো সহজে আসে না৷ নিজের কাজ এর প্রতি ফোকাস, চেষ্টা করে যেতেই হবে যাই হয়ে যাক না কেন৷ সব থেকে বেশি প্রয়োজন হলো ছোট-খাটো ইমপ্রুভমেন্ট এর দিকে লক্ষ রাখা, বড় ইমপ্রুভমেন্টে  পৌঁছানোর জন্য, যেকোনো ছোট ছোট জিনিসের দিকে লক্ষ রাখাটা খুব প্রয়োজন৷ ছোট যেকোনো কৃতিত্বেও খুশি হওয়া খুব প্রয়োজন৷

৯. আমারা সকলেই জানি যে সঞ্জয় স্যার, মানে তোমার বাবা, খুব বড় অভিনেতা৷ বাবা ও মেয়ে মিলে কখনো ট্রেনিং সেশন হয় বাড়িতে?

— আসলেই হয়, বাবাও আমায় নিজের অভিনয় দেখায়, থিয়েটারে ও নিয়ে যায়, কোনটা কেমন হয়েছে, বাবা আমায় বলে এইটা ঠিক করলে বেটার হয়, আমিও বাবাকে দেখিয়ে দি কোন কোন জায়গাটা ঠিক করবার প্রয়োজন৷ আমার মতে সৎভাবে বিচার একমাত্র বাড়ির লোকেরাই করে, কে কোথায় বসে কি মন্তব্য করলো সেটার থেকেও বেশি যদি ফ্যামিলির সকলে নিজেরা বসে বিচার করে তাহলে সেটা আরো অনেক বেশি কার্যকরী হয়৷

১০. বাংলার শ্রেষ্ট সম্মান-এ ফ্যাশন অ্যাওয়ার্ড এ মোস্ট ভার্সাটাইল ক্রিটিক্স-এর অ্যাওয়ার্ড পেয়েছো, সেটা তোমায় কতটা মোটিভেটেড রাখছে?

— সত্যি বলতে যেকোন অ্যাওয়ার্ড, পুরস্কার বা সম্মান যেকোনো মানুষকেই খুব বুস্টআপ করে, আরো অনেক ভালো করার জন্য৷ তবে কোনো অ্যাওয়ার্ড এর পরির্বতে আমায় যদি কেউ বলে যে তোমার অভিনয় আমার খুব ভালো রাখে তবে সেটা একই রকম ভাবে আমার খুব ভালো লাগার জায়গা৷ পুরস্কার পাওয়ার পর আলাদাই একটা এনার্জি পাওয়া যায় যে আমায় আরো অনেক ভালো করে কাজ করে যেতে হবে, আরো অনেক উন্নতি করতে হবে নিজের৷ আমার আরো অনেক ভালো কাজ উপহার দেওয়ার ইচ্ছা আছে আমার অনুরাগীদের-সুভাকাঙ্কীদের জন্য৷

১১. এই  প্রজন্মকে তুমি কি পরামর্শ দিতে  চাইবে?

—  পরামর্শ  বলতে , পরবর্তী প্রজন্মকে বলবো যে, এই প্রজন্ম থেকে এই চিন্তা টা পুরোপুরি উধাও হয়ে যাচ্ছে যে আমায় সবকিছু পরিশ্রম করে পেতে হবে৷ সবকিছু তাকে প্লেট এ সাজিয়ে কেউ দেবে না৷ কারণ জীবনে কোনও কিছুই সাজিয়ে গুছিয়ে আসে না৷ ‘নেপোটিজম’ যতই থাকুক, তোমার যদি নিজের চেষ্টা , কিছু করার ইচ্ছে না থাকে তাহলে কেউ কিছুই করতে পারবে না সে ক্ষেত্রে৷ প্রতিভা ও প্রচেষ্টা চাই৷ তুমি যে কেউই হও না কেনো, যার মাধ্যমেই কাজ করোনা কেনো, নিজের একটা ব্যক্তিত্ব থাকা খুব প্রয়োজন৷ কোনো কিছুই  ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’ হওয়া উচিত না৷

১২. বহু সুপরিচিত কলাকুশলীদের মতো না হয়ে, রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরেই রাখো তোমার জীবনটাকে৷ এভাবেই আলাদাভাবেই কি নিজের জীবন সাজিয়ে নিচ্ছ?

— রাজনীতি করাটা সকলের ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্ত্ত সেটা করছে মানেই যে সে সকলের থেকে আলাদা নয়৷ পরবর্তী সময় যদি আমার ইচ্ছা হয় তবে রাজনীতিতে ঢুকবো নিশ্চই৷ কিন্ত্ত রাজনীতি সকলের কাছে ভিন্ন অর্থের৷  কারোর যদি কাউকে পছন্দ না হয় তবে সে বলবে যে তার সাথে রাজনীতি হচ্ছে৷  রাজনীতি শব্দ তাকেই খুব ভুল অর্থ দিয়ে ভুল ভাবে ধরা হয়৷ কোনো ঠিক নেই আমি রাজনীতিতে পরবর্তী সময় যোগ দেব, তবে এই মুহূর্তে আমার কোনো আপত্তি নেই৷

১৩. রাজনীতির ফলে মানুষের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে চলেছে নাকি মানুষের মনুষত্বের ঘাটতির ফলে ?

— রাজনীতির জন্য হয়তো একেবারেই না, সেটা একটা ভাবনামূলক বিষয়৷ রাজনীতির অর্থ হলো মানুষ এবং সমাজের জন্য কাজ করা৷ কিন্ত্ত যদি মানুষের মধ্যে ভেদ হয় তাহলে তো সেটা মনুষত্বের এ বেপার৷  রাজনীতিতে বহু দল আছে, যেমন আমি চাইবো আমার দল শ্রেষ্ট হোক, সেরকম প্রতিটা রাজনৈতিক দলেরও একই মত থাকবেই৷ রাজনীতি বলে না, কিন্ত্ত মানুষ হয়তো নিজেই রাজনীতির ভিন্ন অর্থ বার করছে বলেই হতো মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরী হচ্ছে৷

১৪. রাজনীতির অর্থ যেমন তুমিও বললে বিভিন্ন অর্থ আছে, তোমার কাছে সেটা কি?

— রাজনীতির অর্থ আমার কাছে একেবারেই ডিকশেনারীর অর্থের মতোই৷ সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করা৷  প্রতিটা মানুষ এবং  সমাজ যাতে ভালো থাকে, সেটাই আমার কাছে রাজনীতির মানে৷

১৫. সোশ্যাল মিডিয়া, এ আই, প্রযুক্তি দিনের পর দিন খুব উন্নতি করেই চলেছে, তোমার কাছে সোশ্যাল মিডিয়া কতটা উপকারী ?

— সোশ্যাল মিডিয়া ভুল মানুষের হাতে পড়ে সেটা খুব নোংরা মান পাচ্ছে৷ যে যা খুশি বলে দিচ্ছে কোনো কিছু না ভেবেই, আজ আমি যদি একটা পাবলিক ফিগার হই, আমায় যদি কেউ  ফলো করছে, কমেন্ট বক্স বা মেসেজ বক্সে যা নয় তাই অনৈতিক জিনিস বলছে বা পাঠাচ্ছে৷ তবে যাকে বলছে সে কোথায় বসে আছে বা কোন পরিস্থিতিতে রয়েছে তা একবারও ভেবে দেখছে না৷ যে যা খুশি লিখছে কিন্ত্ত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু নিয়মও তো থাকে সেটা কে লঙ্ঘণ করছে৷ প্রযুক্তি দিনের পর দিন উন্নতি হলেও, মানুষের মাথাটা উন্নতমানের চিন্তায় লাগানো উচিত৷

১৬. সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে, রাতারাতি কারোর জীবন তৈরী হচ্ছে আবার কারোর জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেটায় তোমার কি মতামত?

— নিজের জীবন তৈরী হচ্ছে একদমই, জীবন নষ্টও হয়ে যায়, কিন্ত্ত রাতারাতি ষ্টার হয়ে যাচ্ছে সেটা একেবারেই সত্যি না৷ সোশ্যাল মিডিয়র ব্যবহার করে কত মানুষ নিজের জীবন চালাচ্ছে, যেমন ন্যান্সি ত্যাগী, সে সেলাই-এর কাজ এর সাহায্যে নিজেকে এতো বড়ো একটা প্লাটফর্মে নিয়ে গেছে, সেরকমই নিজের প্রতিভা সে এক প্রকার বিক্রি করেই আ এই জায়গায়৷ কিন্ত্ত রাতারাতি ষ্টার হয়ে যাওয়া তা ক্ষণিকের৷ কাঁচা বাদামের গায়ক এর সাথে নেসা বা রিলস বানিয়ে হয়তো আমার ফলোয়ার্স বাড়বে কয়েকটা কিন্ত্ত সেটা কি সত্যিই গ্রোথ ? সেটা দীর্ঘায়ু নয়৷

১৭. তোমার স্কীন কেয়ার এর রহস্য কি ?

— জল ও ফল৷  এই দুই এর সাহায্যে নিজেকে হাইড্রেটেড রাখা৷

১৮. নাচের পাশাপাশি অভিনয়, কি ভাবে বজায় রেখেছো ?

— সবটাই মা-বাবার জন্য, আমি ভেঙে পড়লেও ঠিক আবারো মোটিভেটেড করে দেওয়া, পুরোপুরি ওনারাই করেন৷ নাচের পরীক্ষা সামনে ছিল সঙ্গে অভিনয়, তো সেখানে ভালো করে সাপোর্ট করেছে মা-বাবা৷

১৯. তোমায় যদি ৩টি স্বপ্নপূরণ এর কথা বলা হতো তবে তুমি কি চাইতে?

— প্রথম নিজের মা-বাবা ও বোনের খুশি ও ভালো থাকা কামনা করবো৷  দ্বিতীয়ত আমার জীবনসঙ্গী রাহুল ও এবং ওর ফ্যামিলি যেন খুব ভালো থাকে এবং একে ওপরের সাথে যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেখা করে অনেক সময় কাটাতে৷ তৃতীয়ত আরো অনেক বেশি কাজ করা৷

২০. তোমার কর্ম জীবনের কোনো ভালো মুহূর্ত ?

— বহু ঘটনা আছে , পার্থ সারথি দেব, উনি যখন আমার শশুরের চরিত্রে অভিনয় করতেন তখন প্রতিদিন যা খাবার আনতেন আমাদের সকলকে ডেকে খাওয়াতেন৷ জয়ী চলাকালীন সকলে মিলে যে লাঞ্চ করতাম সেটা খুব আনন্দের ছিল, ওইটুকু সময় খুব মজার ছিল প্রতিদিন আমাদের কাছে৷ আমার জীবনের খুব কাছের মহুর্ত সেগুলো এবং এতো বড়মাপের বিখ্যাত ব্যক্তি উনি, ওনার হাতে খাবার অভিজ্ঞতাটাই আলাদা ছিল, সেটা বড় মিস করি, খুব বড় আশীর্বাদ সেটা৷