• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 10 June, 2026

এসআইআর প্রক্রিয়া বৈধ এবং সংবিধাসম্মত জানাল সুপ্রিম কোর্ট

কোথাও কোনও বেআইনি কিছু নেই বলে বুধবার জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বৈধ ও সংবিধানসম্মত বলে জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়া আইনসম্মত এবং কমিশন নিজেদের সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যেই কাজ করছে। ফলে দেশজুড়ে চলতে থাকা এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনও স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে না।
এই মামলাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে হঠাৎ করে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল অভিযোগ তোলে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিরোধীদের দাবি ছিল, নির্বাচন কমিশন আইনের সীমা অতিক্রম করছে এবং এই প্রক্রিয়া সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এই সমস্ত অভিযোগ নিয়েই সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
বুধবার রায়ে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দেয়, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে পুনর্বিবেচনা বা সংশোধনের। সেই ক্ষমতা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৪ ধারায় দেওয়া হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সাধারণ ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতির থেকে আলাদা হলেই কোনও প্রক্রিয়াকে বেআইনি বলা যায় না। কমিশন এই প্রক্রিয়ায় আইনে নির্ধারিত ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতিকে বাতিল করছে না, বা বদলে দিচ্ছে না। যখন আইন নিজেই কমিশনকে বিশেষ পুনর্বিবেচনা করার ক্ষমতা দেয়, এবং কী ভাবে সেই কাজ হবে তা নির্ধারণ করার স্বাধীনতা দেয়, তখন শুধুমাত্র এই কারণে এসআইআরকে বেআইনি বলা যাবে না। এও বলা যাবে না যে এটি সাধারণ ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়ম পুরোপুরি অনুসরণ করেনি। আদালত জানিয়েছে,  সঠিক, নির্ভুল এবং বিশ্বাসযোগ্য ভোটার তালিকা তৈরি করাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল ভিত্তি।
সুপ্রিম কোর্ট আরও স্পষ্ট করেছে, ভোটার তালিকায় নাম থাকা নাগরিকত্বের একটি প্রাথমিক স্বীকৃতি হলেও, প্রয়োজন হলে আইন মেনে তার যাচাই করা যেতেই পারে। নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য সেই প্রক্রিয়া ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে করা অত্যন্ত জরুরি। আদালত বলেছে, নির্দিষ্ট নথি চাওয়া বেআইনি নয়। নির্বাচন কমিশনের সেই ক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি কমিশন যে নথিগুলি চাইছে সেগুলি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছে আদালত।
আদালত তার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন কারও নাগরিকত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কমিশনের ক্ষমতা শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কোনও ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলেই তাঁকে বিদেশি নাগরিক বলা যাবে না। নাগরিকত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নাগরিকত্ব আইনমাফিক সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে।
আদালত আরও জানিয়েছে, যদি ভুলবশত কারও নাম বাদ পড়ে যায়, তবে তিনি আবার আবেদন করার সুযোগ পাবেন এবং নির্বাচন কমিশনকে আইন মেনে সেই আবেদন বিবেচনা করতে হবে। বুধবার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, যাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, তাঁদের বিস্তারিত তথ্য চার সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জমা দিতে হবে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে কমিশনের ভূমিকা সীমিত হলেও, সংশ্লিষ্ট তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর দায়িত্ব তাদের রয়েছে।  সুপ্রিম কোর্ট আরও জানিয়েছে, ভোটারদের মৌলিক অধিকার খর্ব হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভই হল সঠিক ভোটার তালিকা। তাই কোনও পদক্ষেপকে শুধুমাত্র কাগজে-কলমে বিচার করলে চলবে না। সেই প্রক্রিয়া বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হচ্ছে এবং নাগরিকদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকছে, তার উপরই শেষ পর্যন্ত সেই পদক্ষেপের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে।

শীর্ষ আদালতের এই রায়ের ফলে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একই সঙ্গে এই দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই রায় দেওয়ার পর বিরোধীদের একের পর এক অভিযোগও কার্যত খারিজ হয়ে গেল।