ধর্ষণের ফলে অবাঞ্ছিত গর্ভাবস্থার পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নির্যাতিতা ও তাঁর পরিবার, গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের। ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া এক নাবালিকার গর্ভপাতের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই মন্তব্য শীর্ষ আদালতের। আদালত জানিয়েছে, এমন সংবেদনশীল ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত নির্যাতিতা ও তাঁর পরিবারের।
বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, ‘ধর্ষণের ফলে তৈরি হওয়া অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব কাউকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আদালত প্রশ্ন তোলে, ‘একজন শিশুর যখন পড়াশোনার বয়স, তখন তাকে কেন এই অবস্থায় বাধ্য করা হবে ?’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, ধর্ষণের ফলে তৈরি হওয়া গর্ভাবস্থা কাউকে জোর করে বহন করানো যায় না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা শুধুমাত্র স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঝুঁকির কথা ও সম্ভাব্য সমস্যা ব্যাখ্যা করবেন। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন নির্যাতিতা ও তার অভিভাবকরাই।
Advertisement
প্রসঙ্গত, ১৫ বছরের এক নির্যাতিতা নাবালিকার গর্ভাবস্থা ৩১ সপ্তাহ কেটে গিয়েছিল। তারপর গর্ভপাত করাতে চেয়ে আবেদন করে ওই নাবালিকা। আদালত অনুমতি দিলেও তার বিরোধিতা করে কেন্দ্র। যেহেতু ভারতীয় আইনে ২৪ সপ্তাহের পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ, সেই বিষয়টিই তুলে ধরা হয়। কিন্তু ১৫ বছর বয়সের ওই নির্যাতিতার ক্ষেত্রেও কেন্দ্র যেভাবে যুক্তি সাজায়, তাতেই ক্ষুব্ধ হয় সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘যদি ধর্ষণের কারণে কেউ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন, তাহলে কোনও সময়সীমা থাকাই উচিত নয়।’
Advertisement
কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটিকে কার্যত তিরস্কার করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘ধর্ষণের পরে ওই কিশোরীকে যে মানসিক এবং শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, কোনও কিছুই তার সেই ক্ষতিপূরণ করতে পারবে না। নাগরিককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিন ম্যাডাম। আপনার কোনও অধিকার নেই এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার। যদি কেউ করতে পারে, সেটা হলো পরিবার।’
প্রধান বিচারপতির এই পর্যবেক্ষণের পরেও আগের নির্দেশ খারিজের আর্জি জানিয়েছিলেন ঐশ্বর্য। আদালতে এইমসের রিপোর্টও তুলে ধরেন তিনি। জানান, চিকিৎসকরাই বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গর্ভপাত সম্ভব নয়। কেন্দ্রের আইনজীবীর বিকল্প প্রস্তাব, ওই কিশোরী সন্তানের জন্ম দিক। তার পর সেই সন্তানকে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। ঐশ্বর্য বলেন, ‘আর চার সপ্তাহ অপেক্ষা করলেই হবে।’
তার প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি কান্ত বলেন, ‘এটা এক নাবালিকাকে ধর্ষণের ঘটনা। তাকে সারাজীবন এই ক্ষত নিয়েই বাঁচতে হবে। একবার তার কষ্টের কথাটা ভাবুন। কী পরিমাণ যন্ত্রণা ওকে সহ্য করতে হচ্ছে। এই ভ্রূণ বহন করার যন্ত্রণা কতটা সেটা একবার ভাবুন। যদি প্রাপ্তবয়স্ক কেউ হতেন, তা হলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত।’ প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের আর এক সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও বলেন, ‘চিকিৎসকদের রিপোর্ট পরিবারকে দেখান। তারপর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার, ওরাই নেবে। কিন্তু আপনারা এ ব্যাপারে আর নাক গলাবেন না।’
গত সপ্তাহে বিচারপতি বিভি নাগরত্ন এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার বেঞ্চ ওই কিশোরীকে গর্ভপাতের অনুমতি দিয়েছিল। সেই সময়ে পরিবার আদালতে জানিয়েছিল, পরিস্থিতির চাপে দু’বার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিল ওই কিশোরী। তা নজরে রেখে প্রধান বিচারপতি কান্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কিশোরীর জীবন না ভ্রূণ, এটা যদি তর্কের বিষয়বস্তু হয়, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ওই কিশোরীকে বেছে নেওয়া হবে। প্রধান বিচারপতির কথায়, ‘ওই কিশোরীর জীবন নিয়ে অনেক স্বপ্ন রয়েছে। সে ওই স্বপ্ন পূরণ করবে, নাকি এই বয়সে মা হবে? বিচারের জন্য প্রয়োজনে আইনকে আরও কঠোর হতে হবে।’
আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, যদি গর্ভপাতের ফলে মায়ের স্থায়ী কোনও শারীরিক ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল তার পরিবারেরই থাকা উচিত।
Advertisement



