দিল্লিতে নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে ছাত্র আন্দোলন ঘিরে যে হিংসা ছড়িয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ভার এবার নিজের হাতে তুলে নিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রাক্তন বিচারপতি সুভাষ রেড্ডির নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি (High-Powered Committee)। গত ২০ জুলাই দিল্লিতে সংসদ অভিযানের সময় যে সংঘর্ষ বাধে, তার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখবে এই কমিটি।
কী হয়েছিল ২০ জুলাই
ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি (CJP)-র ডাকে নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে প্রতিবাদে নেমেছিলেন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। সেই মিছিল সংসদের দিকে এগোতেই বাধে সংঘর্ষ। পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে, এমনকি পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগও সামনে আসে। মহিলা আন্দোলনকারীদের নিশানা করার অভিযোগও উঠেছিল বলে একাধিক পিটিশনে দাবি করা হয়েছে। অন্য দিকে সরকারপক্ষের বক্তব্য, প্রায় ২০০ পুলিশকর্মী জখম হয়েছেন সে দিন, আন্দোলনকারীদের একাংশ ইটবৃষ্টি করেছিলেন বলেও অভিযোগ।
কমিটির কাজ কী
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ জানিয়েছে, এই কমিটিতে থাকছেন একজন প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি, এক প্রাক্তন হাইকোর্ট প্রধান বিচারপতি, একজন প্রাক্তন সিবিআই ডিরেক্টর এবং একজন প্রাক্তন ডিজিপি পদমর্যাদার পুলিশকর্তা। ২০ জুলাইয়ের সংঘর্ষের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও তথ্যপ্রমাণ কমিটির হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। শুধু পুলিশি বাড়াবাড়ির অভিযোগ নয়, পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া হিংসার ঘটনাও খতিয়ে দেখবে এই প্যানেল।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, যাঁরা সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কমিটির কাছে তাঁরা যেন অবিলম্বে সুযোগ পান নিজেদের কথা তুলে ধরার। প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে বেঞ্চ। একই সঙ্গে আদালতের স্পষ্ট বার্তা, তদন্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত দাগি অপরাধীরা, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীরা নন।
ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের এফআইআর নিয়ে
আন্দোলনের সময় বহু ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছিল। সেই মামলাগুলি খারিজ করার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছে আদালত, সংবিধানের ৩৪২ ধারায় (Article 142) প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে। যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি অতীত নেই, এমন নাবালকদেরও মুক্তির নির্দেশ আগেই দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের সমস্ত এফআইআরের তালিকা জমা দিতে বলেছে বেঞ্চ। আদালতের বক্তব্য, প্রশ্নটা ছাত্রদের ভবিষ্যতের, তাই বিষয়টিকে হালকা ভাবে দেখার সুযোগ নেই।
বাংলার সংযোগ
শীর্ষ আদালতের এই বেঞ্চের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি আদতে কলকাতারই মানুষ। ক্যালকাটা বয়েজ স্কুল ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পড়ে ১৯৯১ সালে কলকাতা হাইকোর্টেই আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। পরে দীর্ঘ ১৪ বছর কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি থাকার পর ২০২৫ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্টে উন্নীত হন। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, ২০৩১ সালে অবসর নেওয়ার কথা তাঁর, আর সেই বছরই তিনি হতে পারেন ভারতের প্রধান বিচারপতি। শেষ বার কলকাতা হাইকোর্ট থেকে প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন বিচারপতি অলতামাস কবীর, ২০১৩ সালে। সেই হিসেবে ১৩ বছর পর ফের একবার বাংলার এক বিচারপতির হাত ধরে দেশের শীর্ষ বিচারবিভাগীয় পদে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দেশজুড়ে ছাত্র রাজনীতি ও আন্দোলনের ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই সংবেদনশীল একটি রাজ্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রেসিডেন্সি, ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এ রাজ্যেও নতুন নয়। তাই দিল্লির এই ঘটনার তদন্তে যে মানদণ্ড স্থির হবে, ভবিষ্যতে রাজ্যের ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত মামলাগুলিতেও তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।




