ত্রিপুরার রাজনীতিতে বড় চমক। তিপ্রা মোথার বিপুল জয়ের পরেই সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা তথা ত্রিপুরার রাজ পরিবারের বংশধর প্রদ্যোত কিশোর মাণিক্য দেববর্মা। মঙ্গলবার গ্রাম কমিটি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ফেসবুক লাইভে জানান, আগামী মাসের পর আর সক্রিয় রাজনীতিতে থাকছেন না তিনি। তবে রাজনীতি ছাড়লেও মানুষের পাশে থাকবেন এবং জনজাতিদের অধিকার নিয়ে কথা বলে যাবেন। তাঁর কথায়, ‘আগামী মাসের পর আমার রাজনৈতিক যাত্রা আর থাকবে না।’
প্রদ্যোতের এই ঘোষণা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ঠিক এই সময়েই ত্রিপুরার জনজাতি এলাকায় কার্যত নজিরবিহীন সাফল্য পেয়েছে তিপ্রা মোথা। ৫৮৭টি ভিলেজ কমিটির নির্বাচনে ৪,৫৯৪টি আসনের ফল ঘোষণা হয়েছে। তার মধ্যে তিপ্রা মোথা পেয়েছে ৩,৪২৮টি আসন। বিজেপি পেয়েছে ৮৫৯টি এবং তাদের জোটসঙ্গী আইপিএফটি পেয়েছে ৩৩টি আসন। প্রায় ১০ বছর পর এই নির্বাচন এবং তার ফলাফল ত্রিপুরার জনজাতিভিত্তিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এই জয়কে নিজের রাজনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখছেন না প্রদ্যোত। বরং দলীয় কর্মীদের সতর্ক করে তিনি বলেছেন, এখনই যেন জয়ের উৎসব না করা হয়। তাঁর বক্তব্য, তিপ্রাসা চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেই হবে ‘আসল উদ্যাপন’। ২০২৪-এর মার্চে কেন্দ্র, ত্রিপুরা সরকার এবং তিপ্রা মোথার মধ্যে ওই চুক্তি হয়েছিল। জনজাতিদের অধিকার ও উন্নয়নের একাধিক বিষয় সেখানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রদ্যোতের দাবি, চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এবার কার্যকর করার সময় এসেছে।
রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে নিজের শারীরিক অবস্থার কথাও জানিয়েছেন প্রদ্যোত। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাজ, যাতায়াত, আলাপ-আলোচনার পাশাপাশি এর প্রভাব তাঁর পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনেও পড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সিদ্ধান্তটি রাগ, অভিমান বা সাময়িক আবেগ থেকে নেওয়া নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ভাবনাচিন্তার পরই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে সক্রিয় রাজনীতি ছাড়লেও জনজীবন থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছেন না প্রদ্যোত। জনজাতিদের অধিকার বিপন্ন হলে তিনি সরব হবেন, এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে ত্রিপুরায় জনজাতি ও অ-জনজাতি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার উপরেও জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, তাঁর প্রথম দায়বদ্ধতা মানুষের প্রতি। প্রয়োজনে রাজনীতির বাইরে থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবেন তিনি।
প্রদ্যোতের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল কংগ্রেসের হাত ধরে। পরে তিনি তিপ্রা মোথা গড়ে তোলেন এবং ত্রিপুরার জনজাতিদের অধিকার, সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং ‘তিপ্রাল্যান্ড’-সহ একাধিক দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বেই তিপ্রা মোথা ত্রিপুরার রাজনীতিতে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ১৩টি আসন জিতে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছিল তিপ্রা মোথা। পরে বিজেপির সঙ্গে জোটে যায় দলটি।
তবে জনজাতিদের জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দাবি এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তিপ্রাসা চুক্তি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা ও দর-কষাকষি হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের পরেও প্রদ্যোতের বার্তার কেন্দ্রে সেই চুক্তিই। তিনি তিপ্রা মোথার নেতাদেরও সতর্ক করেছেন, কোনও পদ বা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য যেন জনজাতিদের অধিকার নিয়ে আপস না করা হয়।
প্রদ্যোতের অবসর ত্রিপুরার রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ, জনজাতি রাজনীতিতে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং প্রভাব তিপ্রা মোথার উত্থানের অন্যতম ভিত্তি। বিশেষ করে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর যখন দলটি সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে আরও মজবুত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখনই দলের প্রতিষ্ঠাতা সক্রিয় রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা করলেন। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে তিপ্রা মোথার নেতৃত্ব কীভাবে এগোয় এবং তিপ্রাসা চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে দল কতটা চাপ তৈরি করতে পারে, নজর থাকবে সে দিকেই।




