• facebook
  • twitter
Saturday, 7 February, 2026

অন্তর্বর্তী বাণিজ্য সমঝোতা নিয়ে যৌথ বিবৃতি ভারত ও আমেরিকার

কৃষিক্ষেত্র নিয়ে সরব বিরোধীরা, আশ্বাস বাণিজ্যমন্ত্রীর

দীর্ঘ দরকষাকষি এবং টানাপোড়েনের পর অবশেষে বাণিজ্যচুক্তিতে সম্মত হয়েছে ভারত এবং আমেরিকা। গত সপ্তাহেই সেই ঘোষণা করেছেন প্রথমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই ঘোষণার পর শনিবার অন্তর্বর্তী বাণিজ্য সমঝোতা নিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে দুই দেশ। একইসঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে এই চুক্তির কাঠামো বা রূপরেখাও। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি, রুশ তেল কেনার জন্য আমেরিকা ভারতের উপর যে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়েছিল, তাও সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ভারতীয় সময় অনুসারে, শুক্রবার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। ওই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘রাশিয়া থেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে তেল আমদানি বন্ধ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত।‘  আমেরিকা আগেই জানিয়েছিল, ভারতীয় পণ্যে আমদানি শুল্কের পরিমাণ ২৫ থেকে কমিয়ে ১৮ করা হচ্ছে। রাশিয়া থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসাবে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক উঠে যাওয়ায়, ভারতীয় পণ্যে সর্বোচ্চ মার্কিন শুল্কের পরিমাণ হল ১৮ শতাংশ।  ভারতীয় সময় অনুসারে, শনিবার ভোরে যৌথ বিবৃতি দিয়ে এই সমঝোতার কথা জানিয়েছে দুই দেশ।

Advertisement

অন্তর্বর্তী এই বাণিজ্য-সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই চুক্তি দু’দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে এই বাণিজ্যচুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ বলেও অভিহিত করা হয়েছে। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘ভারত এবং আমেরিকার জন্য দারুণ খবর!

Advertisement

দুই মহান দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্যিক বোঝাপড়ার বিষয়ে আমরা সম্মত হয়েছি। দু’দেশের সম্পর্ক মজবুত করার জন্য এবং ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতির জন্য আমি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাই।’  প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ‘এই কাঠামো আমাদের অংশীদারিত্বের ক্রমবর্ধমান গভীরতা, আস্থা এবং গতিশীলতা প্রতিফলিত করে। এটি ভারতের পরিশ্রমী কৃষক, উদ্যোক্তা, এমএসএমই, স্টার্টআপগুলির জন্য নতুন সুযোগ খুলে দেবে। পাশাপাশি, নারী এবং তরুণদের জন্য প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।’

তবে আমেরিকার বেশ কিছু শর্ত মেনে নিয়েছে ভারত। আমেরিকার কাছ থেকে আগামী পাঁচ বছরে ভারতীয় মুদ্রায় ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার বেশি পণ্য আমদানি করতে সম্মত হয়েছে ভারত। যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, সমস্ত মার্কিন বাণিজ্যিক পণ্য এবং একাধিক খাদ্য ও কৃষিপণ্যের উপর থেকে ভারত হয় শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করবে, নয়তো পরিমাণ কমাবে। এই তালিকায় রয়েছে শুকনো খাদ্যশস্য, পশুখাদ্যের লাল জোয়ার, বাদাম, তাজা ফল, সয়াবিন তেল, ওয়াইন ইত্যাদি। এ ছাড়া, নিজ নিজ স্বার্থের ক্ষেত্রগুলিতে ভারত ও আমেরিকা একে অপরকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাজারে প্রবেশের অনুমতি দেবে। এই শর্ত মেনে নিয়েছে উভয়পক্ষই।

বাণিজ্য সমঝোতার অন্যতম শর্ত, পাঁচ বছরের মধ্যে ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার মার্কিন পণ্য ভারতকে কিনতে হবে। তার মধ্যে খনিজ তেল, গ্যাস, রান্নার কয়লা, বিমান, বিমানের যন্ত্রাংশ, দামি ধাতু এবং প্রযুক্তিগত পণ্যও থাকবে। এ ছাড়া, ডেটা সেন্টারের কাজে লাগে, এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক পণ্যও আমেরিকার কাছ থেকে কিনতে হবে ভারতকে। পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, জুতো, প্লাস্টিকপণ্য, রবার, জৈব রাসায়নিক, অন্দরসজ্জার সরঞ্জাম এবং নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি ১৮ শতাংশ পণ্যে আমেরিকায় রপ্তানি করতে পারবে ভারত। বিমান ও বিমানের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে অন্যান্য মার্কিন ঘনিষ্ঠ দেশগুলি যা শুল্ক দেয়, তা-ই দিতে হবে ভারতকেও।

দুই দেশ বিবৃতি দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভারতের একটি মানচিত্রও প্রকাশ করেছে। আমেরিকার ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের দপ্তর ভারতের মানচিত্রটি প্রকাশ করেছে। যে আকসাই চিনকে বেজিং নিজেদের অংশ বলে দাবি করে, তা রয়েছে ভারতের ওই মানচিত্রে। রয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরও। উল্লেখ্য ভারত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার ভূখণ্ডগত সার্বভোমত্বের বৈধতা আমেরিকার সম্মতির উপর নির্ভর করে না। পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে ভারত সর্বদাই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

তবে এর আগে আমেরিকা ভারতের যে মানচিত্র প্রকাশ করেছিল তাতে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরকে আলাদা ভাবে দেখানো হয়েছিল। পাকিস্তানের দাবিকে মান্যতা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করা হয়েছিল। এ বার বাণিজ্য-সমঝোতার পরে সেই পাকিস্তানকেই বার্তা দিল আমেরিকা, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। ভারতের আপত্তি উড়িয়ে চিন দাবি করে আকসাই চিন তাদের অংশ। এ বার তাদেরও ট্রাম্প প্রশাসন বার্তা দিল বলেই মনে করা হচ্ছে।

আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধীরা। দেশের কৃষিক্ষেত্রকে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের কৃষিক্ষেত্র সুরক্ষিত বলে জানানো হয়েছে। বাণিজ্য চুক্তিতেও ‘আত্মনির্ভর ভারত’কেই প্রধান্য দেওয়া হয়েছে বলে শনিবার সাংবাদিক বৈঠকে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল।

শনিবার অন্তর্বর্তী সমঝোতা নিয়ে যৌথ বিবৃতির পর বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, এই বাণিজ্যিক সমঝোতার ফলে বিনা শুল্কেও কিছু পণ্য রপ্তানি করা যাবে। তার মধ্যে অন্যতম হল স্মার্টফোন। দেশের কৃষিক্ষেত্র পুরোপুরি সুরক্ষিত জানিয়ে গোয়েল বলেন,  ‘মশলা, চা, কফি, নারকেল তেল, কাজু, বিভিন্ন ফল ও সবজি— এই সব পণ্য বিনাশুল্কে আমেরিকায় রপ্তানি করতে পারবে ভারত।‘ তাঁর দাবি, প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর হওয়া এই চুক্তি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার খুলে দেবে। জানা গিয়েছে, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ভারত-আমেরিকার চূড়ান্ত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর হবে।

ভারতের কৃষিক্ষেত্রকে পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়নি বলেও এদিন জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। যে সব পণ্য উৎপাদনে দেশ স্বনির্ভর, সেগুলিকে এই চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। জেনেটিকালি মডিফায়েড ফসল, মাংস, পোলট্রি, দুগ্ধজাত পণ্য, সয়াবিন, ভুট্টা, চাল, গম, চিনি, এবং জোয়ার, বাজরা, রাগির পণ্য এ দেশে কম শুল্কে রপ্তানি করতে পারবে না আমেরিকা। কলা, স্ট্রবেরি, চেরি, সাইট্রাস ফল, গ্রিন টি, কাবুলি ছোলা, মুগ, তেলবীজ, চিনাবাদাম, নন-অ্যালকোহলিক পানীয়, স্টার্চ, ইথানল এবং তামাক— এই সব পণ্যেও কোনও ছাড় দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল।

তবে দুই দেশের যৌথ সমঝোতা নিয়ে বিবৃতি দেওয়ার পর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প। যদি ভারত রুশ তেল কেনে তাহলে ভারতীয় পণ্যে আবার ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, ভারত রুশ তেল কিনছে কি না, তা নজরে রাখারও নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রশাসনকে। ট্রাম্প যে বিজ্ঞপ্তিতে সই করেছেন, তাতে আমেরিকার বাণিজ্য দপ্তরকে ভারতের গতিবিধির উপর নজর রাখতে বলা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশ, বিদেশ এবং অর্থ দপ্তরের সঙ্গে যৌথ ভাবেই এই কাজ করবে বাণিজ্য দপ্তর। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে লেখা হয়েছে, ‘বিদেশ সচিব, অর্থসচিব-সহ যাঁদের উপযুক্ত মনে করবেন, তাঁদের সঙ্গে সমন্বয় করে বাণিজ্য সচিব দেখবেন, ভারত সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার তেল আমদানি করছে কি না।‘

 

 

 

 

 

Advertisement