সৈয়দ হাসমত জালাল
ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘোষিত অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তিকে সরকার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধী শিবিরে প্রশ্নের ঝড়। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলির অভিযোগ— এই চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করা হয়েছে, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটিই অস্বচ্ছ। অন্তর্বর্তী শব্দটি যতই আশ্বাসমূলক হোক, বিরোধীদের মতে এর অভিঘাত হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী।
Advertisement
বিরোধীদের মূল আপত্তি চুক্তির ভারসাম্য নিয়ে। তাঁদের বক্তব্য, ভারতের তরফে শুল্কছাড় ও বাজার খোলার প্রতিশ্রুতি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, অথচ মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রতিশ্রুতি অস্পষ্ট ও শর্তাধীন। বাণিজ্যচুক্তি তখনই ন্যায্য, যখন দু’পক্ষ সমান সুবিধা পায়। এখানে সেই সমতা চোখে পড়ছে না বলেই কংগ্রেস এই সমঝোতাকে ‘সারেন্ডার’ বলে আখ্যা দিচ্ছে।
Advertisement
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কৃষি। ভারতের কৃষি ব্যবস্থা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কোটি কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। বিরোধীদের আশঙ্কা, আমেরিকার ভর্তুকিপ্রাপ্ত ও শিল্পায়িত কৃষিপণ্য যদি কম শুল্কে ভারতীয় বাজারে ঢোকে, তবে দেশীয় কৃষকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। সয়াবিন, ভুট্টা, গম কিংবা তুলোর মতো পণ্যে আমেরিকার উৎপাদন খরচ কম এবং সরকারি সহায়তা বেশি। এর ফলে দাম পড়ে গেলে সরাসরি ধাক্কা আসবে কৃষকের আয়ে।
সরকার অবশ্য দাবি করছে, সংবেদনশীল কৃষিপণ্য চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের বক্তব্য, চুক্তির ভাষা এতটাই নমনীয় যে ভবিষ্যতে শুল্কহীন বাধা (‘নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার’) কমানোর নামে এই সুরক্ষা শিথিল করা হতে পারে। এখান থেকেই উঠে আসছে তথাকথিত ‘ব্যাকডোর এন্ট্রি’-র আশঙ্কা। কৃষক সংগঠন ও বিরোধী নেতারা বলছেন, নির্দিষ্ট কিছু আমদানিপণ্যের মাধ্যমে জিন-পরিবর্তিত (জেনেটিক্যালি মডিফাইড) উপাদান ধীরে ধীরে ভারতীয় বাজারে ঢুকে পড়তে পারে, যা দেশের কৃষিনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক।
কৃষির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়েও বিরোধীদের উদ্বেগ তীব্র। ভারতের এমএসএমই খাত ইতিমধ্যেই উচ্চ উৎপাদন খরচ, ঋণের চাপ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জর্জরিত। এই অবস্থায় আমেরিকার সস্তা ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত পণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় শিল্প আরও কোণঠাসা হতে পারে। টেক্সটাইল, চামড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে কর্মসংস্থানের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন এই চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি, রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি, কৃষক সংগঠন বা শিল্প প্রতিনিধিদের মতামতও প্রকাশ্যে নেওয়া হয়নি। সরকারের যুক্তি, এটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। কিন্তু বিরোধীদের পাল্টা প্রশ্ন, অন্তর্বর্তী হলেও এই চুক্তি কার্যকর হবে এবং বাস্তবে বাজার খুলে দেবে। একবার সেই দরজা খুলে গেলে, তা আবার বন্ধ করা সহজ নয়— ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসেই তার উদাহরণ রয়েছে।
এই বিতর্কে যুক্ত হয়েছে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন কেবল বাণিজ্যের বিষয় নয়, কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিও এর সঙ্গে জড়িত। বিরোধীদের মতে, এই কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার চাপেই বাণিজ্য আলোচনায় ভারত কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি। প্রশ্ন উঠছে, কূটনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অর্থনৈতিক স্বার্থে ছাড় দেওয়া কি আদৌ যুক্তিসঙ্গত?
সব মিলিয়ে বিরোধীদের বক্তব্য স্পষ্ট। এই অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি একটি অসম ও অস্বচ্ছ সমঝোতা, যা কৃষক, ক্ষুদ্র শিল্প এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সরকার যদি সত্যিই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়, তবে চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ করে সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার পথ খুলে দেওয়াই গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। নইলে অন্তর্বর্তী চুক্তি থেকেই যাবে, কিন্তু প্রশ্নগুলি স্থায়ী হয়ে উঠবে।
Advertisement



