একদিকে জাপানকে টপকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটা বড় অংশের পাতে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব। সদ্য প্রকাশিত ২০২৬ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে (Global Hunger Index-GHI) ফের একবার ভারতের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এই বৈপরীত্য সামনে চলে এল। তালিকায় বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে ভারত স্থান পেয়েছে ১০০ নম্বরে। ২৪.১ স্কোর নিয়ে ক্ষুধার নিরিখে ভারত এখনও গুরুতর বা উদ্বেগজনক (serious) হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তালিকায়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ছাড়া শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মায়ানমার এবং বাংলাদেশের মতো সবকটি প্রতিবেশী দেশের চেয়েই পিছিয়ে রয়েছে ভারত।
তীব্র অপুষ্টির চিত্র
জার্মানির স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওয়েল্টহাঙ্গারহিলফে এবং আয়ারল্যান্ডের কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই রিপোর্টে ভারতের শিশু স্বাস্থ্যের যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা রীতিমতো চিন্তার। এই সূচক তৈরি করা হয় মূলত চারটি মাপকাঠির ভিত্তিতে। মোট জনসংখ্যার অপুষ্টি, শিশুর বামনত্ব বা স্টান্টিং (বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা), চাইল্ড ওয়েস্টিং বা কৃশকায় দশা (উচ্চতার তুলনায় কম ওজন) এবং পাঁচ বছর বয়সের আগে শিশুমৃত্যুর হার।
২০২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে মোট জনসংখ্যার ৯.৮ শতাংশ মানুষ পর্যাপ্ত ক্যালোরি বা পুষ্টি পান না। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে। দেশে পাঁচ বছরের নীচে থাকা ২৯.৩ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ শিশুই দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির জেরে বামনত্বের (child stunting) শিকার। যদিও ২০০০ সালে ভারতে এই হার ছিল ৫০ শতাংশ এবং গত আড়াই দশকে তা ২০.৭ শতাংশ বিন্দু কমেছে, তবুও বর্তমান হারটি বিশ্বমানের তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর চেয়েও বড় ধাক্কা চাইল্ড ওয়েস্টিং বা তীব্র অপুষ্টির পরিসংখ্যানে। ভারতে পাঁচ বছরের কম বয়সি ১৯ শতাংশ শিশুর ওজন তাদের উচ্চতার তুলনায় বিপজ্জনকভাবে কম, যা গোটা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি দেশে পাঁচ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই শিশুমৃত্যুর হার দাঁড়িয়েছে ২.৭ শতাংশে। দেখা যাচ্ছে, ২০০০ সালে ভারতের ক্ষুধা সূচক স্কোর ছিল ৩৮.১ এবং ২০১৮ সালে ছিল ২৫.৮। সেই তুলনায় ২০২৬ সালে স্কোর ২৪.১-এ নেমে এলেও অগ্রগতির গতি অত্যন্ত শ্লথ।
প্রতিবেশীদের চেয়ে পিছিয়ে ভারত
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ক্ষুধা সূচকের গড় স্কোর এবার ২৩.৫, যেখানে গোটা বিশ্বের গড় স্কোর ১৮.১। কিন্তু ভারতের এই ২৪.১ স্কোর প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় অনেকটাই খারাপ জায়গায় রয়েছে। তালিকায় ৫৩ নম্বরে থাকা শ্রীলঙ্কার স্কোর ১০.২। নেপাল ও মায়ানমার যুগ্মভাবে রয়েছে ৭২ নম্বরে, তাদের স্কোর ১৪.৫। এমনকি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে থাকা বাংলাদেশও ১৯.২ স্কোর নিয়ে তালিকায় ৮৪ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মায়ানমার ও বাংলাদেশ– এই চারটি প্রতিবেশী দেশই ক্ষুধার নিরিখে মাঝারি (moderate) তালিকায় রয়েছে।
ভারতের নীচে প্রতিবেশীদের মধ্যে রয়েছে কেবল পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। ২৫.৫ স্কোর নিয়ে পাকিস্তান রয়েছে ১০৬ নম্বরে এবং ২৮.৬ স্কোর নিয়ে আফগানিস্তানের স্থান ১০৮ নম্বরে। ভারতের মতো এই দু’টি দেশও গুরুতর ক্ষুধার তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে চিন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, রাশিয়া, তুরস্ক, চিলি ও ক্রোয়েশিয়া-সহ মোট ২৪টি দেশ ৫-এর কম স্কোর নিয়ে তালিকার একেবারে শীর্ষে অর্থাৎ ন্যূনতম ক্ষুধার (low hunger) স্তরে অবস্থান করছে। তালিকার একেবারে তলানিতে অর্থাৎ ১২২ নম্বরে রয়েছে সোমালিয়া (স্কোর ৪৭.০), এবং তাদের ঠিক উপরেই চরম সংকটজনক (alarming) অবস্থায় রয়েছে কঙ্গো, চাদ, মাদাগাস্কার, ইয়েমেন ও সুদানের মতো দেশগুলি।
কীভাবে তৈরি এই সূচক
জার্মান ও আইরিশ সংস্থার পাশাপাশি এবারের রিপোর্ট তৈরিতে যুক্ত ছিল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ল অফ পিস অ্যান্ড আর্মড কনফ্লিক্ট (IFHV) এবং সুইৎজারল্যান্ডের সংস্থা হেলভেটাস। ০ থেকে ১০০ পয়েন্টের স্কেলে এই সূচক মাপা হয়, যেখানে ০ মানে ক্ষুধামুক্ত সেরা অবস্থান এবং ১০০ মানে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি। স্কোর ৯.৯ বা তার কম হলে ন্যূনতম, ১০ থেকে ১৯.৯ হলে মাঝারি, ২০ থেকে ৩৪.৯ হলে গুরুতর এবং ৩৫ থেকে ৪৯.৯ হলে তাকে চরম বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়।
এবারের রিপোর্টের মূল ভাবনা ছিল, খাদ্য সুরক্ষা ছাড়া নিরাপত্তা অসম্ভব। সমীক্ষকদের সতর্কবার্তা, যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জেরে ২০১৮ সালের পর থেকে বিশ্বের ৩২টি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে ভারত-সহ বিশ্বের অন্তত ৫৭টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রপুঞ্জের নির্ধারিত জিরো হাঙ্গার বা ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে ব্যর্থ হবে।




