• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 21 July, 2026

আসামে ভাসল ৭৫৮ গ্রাম, মৃত ১১: বিপদসীমার উপরে ব্রহ্মপুত্র, বিচ্ছিন্ন হাওড়া-ডিব্রুগড় রেলপথ

অসমের ১১ জেলায় জলবন্দি সাড়ে তিন লক্ষের কাছাকাছি মানুষ, বিপদসীমার উপরে ব্রহ্মপুত্র-সহ একাধিক নদী। রেল বিপর্যয়ের জেরে ধাক্কা হাওড়া-ডিব্রুগড় কামরূপ এক্সপ্রেসেও, পড়ুন বিশদে।

আসামে ভাসল ৭৫৮ গ্রাম, মৃত ১১: বিপদসীমার উপরে ব্রহ্মপুত্র, বিচ্ছিন্ন হাওড়া-ডিব্রুগড় রেলপথ

Assam Flood (ANI)

উজানে টানা বৃষ্টি, আর তার জেরে হু হু করে ফুলেফেঁপে উঠছে ব্রহ্মপুত্র (Brahmaputra)। আসামের বন্যা (Assam) পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। মঙ্গলবার নতুন করে আরও একজনের মৃত্যুর খবর আসায় আসামে বন্যায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১১। রাজ্যের ১১টি জেলায় জলবন্দি হয়ে পড়েছেন ৩ লক্ষ ১০ হাজারের বেশি মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়দানে নেমেছে সেনা, এনডিআরএফ (NDRF) ও এসডিআরএফ (SDRF)। আর এই দুর্যোগের আঁচ গিয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) সঙ্গে আসামের রেল যোগাযোগেও।

ভয়াবহ পরিস্থিতি

রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (ASDMA) সূত্রে খবর, ১১টি জেলা ও ৩৬টি রেভিনিউ সার্কেল সম্পূর্ণ প্লাবিত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলি হল ডিব্রুগড়, জোরহাট, গোলাঘাট, শিবসাগর, চরাইদেউ, ধেমাজি, তিনসুকিয়া, নগাঁও, বিশ্বনাথ, কামরূপ এবং কার্বি আংলং। মোট ৭৫৮টি গ্রাম জলের তলায়, ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ৪১১ হেক্টর। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপর্যস্ত শিবসাগর জেলা, একটি জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দেড় লক্ষের বেশি মানুষ। উল্লেখ্য, সোমবার পর্যন্ত ১৫টি জেলা জুড়ে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি, কোথাও কোথাও জল কিছুটা নামতে শুরু করলেও উজানের অসমে সার্বিক ছবিটা এখনও উদ্বেগজনকই।

বিপদসীমার উপরে

কেন্দ্রীয় জল কমিশনের (Central Water Commission) রিপোর্ট বলছে, নেমাটিঘাটে ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও দিখৌ, দিসাং, ধানসিরি ও বুড়িডিহিং নদী বইছে বিপদসীমার উপর দিয়ে। শিবসাগরের দিখৌ নদীর জলস্তর পৌঁছে গিয়েছে চরম বিপদসীমাতেও (Extreme Flood Level)। আচমকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে শিবসাগরের সিমালুগুড়ি শহর, জল ঢুকে গিয়েছে রেল স্টেশন চত্বর ও রেল কলোনিতেও।

উদ্ধারে সেনা, এনডিআরএফ

পরিস্থিতি সামাল দিতে একযোগে কাজ করছে ভারতীয় সেনা, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, দমকল ও জরুরি পরিষেবা দফতর। এনডিআরএফের ১২ নম্বর ব্যাটালিয়নের ছ’টি দল পাঠানো হয়েছে শিবসাগর ও চরাইদেউে, জোরহাটে পাঠানো হয়েছে ১ নম্বর ব্যাটালিয়নের দু’টি দল। ৬২টি নৌকা নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমেছে এসডিআরএফ। এ পর্যন্ত ন’হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে, ৫২টি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় সাড়ে বারো হাজার মানুষ। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলিতে মন্ত্রীদের পাঠিয়ে দিয়েছেন পরিস্থিতির উপর নজরদারির জন্য। সাংসদ ও বিধায়কদেরও মাটি কামড়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

থমকে রেল

সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে রেল পরিষেবায়। দিখৌ নদীর জল রেললাইন ছাপিয়ে যাওয়ায় সিমালুগুড়ি স্টেশন চত্বর প্লাবিত, ফলে টানা দ্বিতীয় দিনেও ব্যাহত ট্রেন চলাচল। নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেল (NFR) ইতিমধ্যেই বাতিল করেছে তিনসুকিয়া-জোরহাট টাউন প্যাসেঞ্জার, লেডো-গুয়াহাটি ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসের মতো একাধিক ট্রেন। উদ্বেগের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আসামের সরাসরি সংযোগকারী হাওড়া-ডিব্রুগড় কামরূপ এক্সপ্রেসও (Kamrup Express) এই বিপর্যয়ের বাইরে থাকতে পারেনি, ডিব্রুগড়গামী কামরূপ এক্সপ্রেস বাতিল হয়েছে, আবার হাওড়াগামী কামরূপ এক্সপ্রেসকে ঘুরপথে চালাতে বাধ্য হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। একই ভাবে ঘুরপথে চালানো হচ্ছে ডিব্রুগড়-কন্যাকুমারী বিবেক এক্সপ্রেসকেও। মারিয়ানিতে আটকে পড়া কামরূপ এক্সপ্রেসের প্রায় ৫৭০ জন এবং অমৃতসর-তিনসুকিয়া এক্সপ্রেসের প্রায় ৪৯০ জন যাত্রীকে সড়কপথে গন্তব্যে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করেছে রেল। যাঁরা উত্তর-পূর্বের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, ভ্রমণের আগে ট্রেনের সবশেষ পরিস্থিতি যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

জরুরি বিষয়

আসামের এই দুর্যোগ শুধু রেল যোগাযোগেই সীমাবদ্ধ নয়, আবহাওয়ার নিরিখেও বাংলার সঙ্গে যোগ রয়েছে এই সংকটের। এই মাসের মাঝামাঝি সিকিম ও ভুটান পাহাড়ে টানা ভারী বৃষ্টির জেরে উত্তরবঙ্গের তিস্তা ও জলঢাকা নদীতেও জারি হয়েছিল কমলা সতর্কতা, গাজলডোবা ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার পর জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের কিছু এলাকায় জারি হয়েছিল বন্যার সতর্কতাও। পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশ জুড়ে চলতি মরসুমের এই একটানা ভারী বর্ষণই আসাম ও উত্তরবঙ্গ, দুই জায়গার নদীকেই বিপদসীমায় নিয়ে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছে আবহাওয়া দফতর সূত্র। আসামের বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বহু চা বাগানও, যা উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ও তরাইয়ের চা শ্রমিকদের কাছেও এক পরিচিত উদ্বেগের ছবি, ভারী বর্ষণে বছর বছর একই রকম সংকটের মুখে পড়েন তাঁরাও।