তিন দফায় সময়সীমা বাড়ানোর পর অবশেষে উত্তরপ্রদেশে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ শেষে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করল নির্বাচন কমিশন। আর সেই তালিকা প্রকাশ হতেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন। খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ২ কোটি ৮৯ লক্ষ ভোটারের নাম, যা দেশের বৃহত্তম রাজ্যটির মোট ভোটারের প্রায় ১৮.৭০ শতাংশ।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় উত্তরপ্রদেশে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৪৪ লক্ষ। কিন্তু এনুমারেশন ফর্ম জমা ও যাচাই পর্ব শেষ হওয়ার পরে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় জায়গা পেয়েছে মাত্র ১২ কোটি ৫৫ লক্ষ ভোটার। অর্থাৎ এক ধাক্কায় তালিকার বাইরে চলে গেছেন প্রায় তিন কোটির কাছাকাছি মানুষ। তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছিল মাত্র ৭.৬ শতাংশ ভোটার, সংখ্যায় যা প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার। সেই নিরিখে উত্তরপ্রদেশে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় পাঁচ গুণ।
Advertisement
উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক রভনীত রিনওয়া জানিয়েছেন, বাদ পড়া ভোটারদের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ৪৬ লক্ষ ২৩ হাজার ভোটার ইতিমধ্যেই মৃত, ২৫ লক্ষ ৪৭ হাজার ভোটারের নাম একাধিক জায়গায় নথিভুক্ত ছিল (ডুপ্লিকেট), এবং সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় ২ কোটি ১৭ লক্ষ ভোটার স্থানান্তরিত বা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
Advertisement
এছাড়াও খসড়া তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, এমন ১ কোটি ৪০ লক্ষ ভোটারকে নথি যাচাইয়ের জন্য শুনানিপর্বে হাজির হতে নোটিস পাঠানো হচ্ছে। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, সব যাচাই-বাছাই শেষে ৬ মার্চ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে।
তবে এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে লখনউ জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি চিন্তার। যোগীরাজ্যের রাজধানীতে মোট প্রায় ৩৯ লক্ষ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ১২ লক্ষ ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি, যা জেলার মোট ভোটারের প্রায় ৩০ শতাংশ। বিএলওদের দাবি, এর মধ্যে অন্তত ৫.৪ লক্ষ ভোটারের নাম একাধিক জায়গায় ছিল, এবং তাঁরা নিজেদের জন্মস্থানকেই ভোটার ঠিকানা হিসেবে রাখতে চেয়েছেন। পাশাপাশি, প্রায় ৪.৩ লক্ষ ভোটারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
বিজেপির অন্দরের খবর অনুযায়ী, এত বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে— এই আশঙ্কা আগেই প্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তাঁর আশঙ্কা, এর রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে। এমনকি বিজেপিরই এক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতার ভূমিকা নিয়ে তাঁর অসন্তোষ রয়েছে বলেও দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে।
এই আবহেই সোমবার দিল্লিতে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেন যোগী আদিত্যনাথ। পাশাপাশি তিনি সাক্ষাৎ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও বিজেপি সভাপতি জে পি নড্ডার সঙ্গেও। এই বৈঠকগুলিকে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ বলে মানতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, ভোটার তালিকার এই ব্যাপক কাটছাঁট ভবিষ্যতের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে।
সব মিলিয়ে, উত্তরপ্রদেশে এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ শেষ হলেও বিতর্ক ও জল্পনার শেষ দেখা যাচ্ছে না। এখন নজর ৬ মার্চের দিকে, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় কতটা বদল আসে এবং তার রাজনৈতিক অভিঘাত ঠিক কত দূর পর্যন্ত গড়ায়।
Advertisement



