নানান ঔষধি আবিষ্কারে বর্তমানে পতঞ্জলির জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ করে ভারতের আদি ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়ে পতঞ্জলি গোটা বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সেই পথেই পতঞ্জলির নতুন সংযোজন উত্তরাখণ্ডে একটি বিশাল ঔষধি বৃক্ষের সন্ধান। উত্তরাখণ্ডের জনজাতি অধ্যুষিত চারটি জেলায় ১০১১টি ঔষধি গাছের সন্ধান পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে পতঞ্জলি। এখন তারা পুরো উত্তরাখণ্ড জুড়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে, এই সমীক্ষার পর শিগগিরই আরও নতুন নানান তথ্য সামনে আসবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সরকারের তথ্য ভাণ্ডারে যেখানে পুরো রাজ্যে মাত্র ১৩০০টি ঔষধি উদ্ভিদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, সেখানে পতঞ্জলি তার থেকেও অনেক বড় আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে চলেছে।
পতঞ্জলির এই উদ্যোগে প্রথমবার জনজাতি মানুষদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এতে ২১৬ জন প্রথাগত বৈদ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে।
Advertisement
দেরাদুন, চামোলি, পিথোরাগড় এবং উদ্যমসিংহ নগরের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গবেষক দল কাজ করেছে। বহু প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত এই জ্ঞানকে তারা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছে। ‘ডকুমেন্ট অফ ট্রাইবাল হিলস’ নামে এটি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, ফলে আগে যা শুধু মুখে মুখে প্রচলিত ছিল, এখন তা লিখিত ও বৈজ্ঞানিক রূপ পেয়েছে।
Advertisement
এছাড়া, যাযাবর জীবনে অভ্যস্থ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। দেশে প্রথমবারের মতো পতঞ্জলি জনজাতি সম্প্রদায়ের জিও-ট্যাগিং করে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করেছে— যা খুবই কঠিন ও অভিনব কাজ।
হরিদ্বারে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর আগে উত্তরাখণ্ডে ১৩০০টি ঔষধি গাছের তথ্য ছিল। কিন্তু পতঞ্জলি মাত্র কয়েকটি জেলায় গবেষণা করেই ১০১১টি গাছের সন্ধান পেয়েছে। এখন তারা রাজ্যের ১৩টি জেলাতেই নতুন উদ্ভিদের খোঁজ চালাচ্ছে এবং প্রাথমিক স্তরে এই খোঁজের ফল খুবই ইতিবাচক। এই গবেষণা আগের সমস্ত তথ্যকে চাপিয়ে যাবে বলেই ধারনা।
আচার্য বালাকৃষ্ণের নেতৃত্বে গবেষক দল ১২২টি গ্রাম এবং ১৪টি মহকুমায় গিয়ে কাজ করেছে। তাঁরা সরাসরি সেইসব মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাঁদের কাছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চিকিৎসার জ্ঞান রয়েছে। এতে ২১৬ জন জনজাতি বৈদ্যের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যাদের প্রত্যেকের চিকিৎসার পদ্ধতি আলাদা। তাঁদের কাছ থেকে ২৩৮টি ঔষধি গাছের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার নথিভুক্তি করা হয়েছে— যেগুলোর অনেকগুলিই আগে সাধারণ মানুষের অজানা ছিল।
এই গবেষণায় উত্তরাখণ্ডের অংশগ্রহণকারী প্রধান জনজাতিগুলির সংখ্যা ছিল— জৌনসারি (৩৯%), ভোটিয়া (৩৬%), থারু (১০%), বুক্সা (৯%) এবং বন রাজি (৬%)।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, জনজাতি মানুষ প্রায় সব ধরনের রোগের চিকিৎসা নিজেরাই করেন— যেমন পেটব্যথা, সর্দি-কাশি, কান-গলা সমস্যা, জ্বর, ডায়াবেটিস, যেকোন ধরনের আঘাত, দাঁতের ব্যথা, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গু, পাইলস, বমি, হাঁপানি, মুখের ঘা, হাড় ভেঙে যাওয়া, কিডনির পাথর, চোখের রোগ ইত্যাদি। বিশেষ করে জয়েন্ট পেইন ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা করতে তারা সাধারণত সিদ্ধাস্তই মনে করা হয়।
জিও-ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে জনজাতি পরিবারগুলির সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। এতদিন সরকার যেখানে প্রায় ৫০ হাজার জনজাতি পরিবারের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে আসছিলো, সেখানে পতঞ্জলির গবেষণায় প্রায় ২৮ হাজার পরিবারের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া, এই পরিবারগুলিকে কৃষি, ব্যবসা ও চাকরির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ‘অন্নদাতা’ অ্যাপের মাধ্যমে তারা এখন নিজেদের পণ্য সরাসরি বিক্রি করতে পারছে, কোনও মধ্যস্বত্বকারী ছাড়াই। আচার্য বালকৃষ্ণ বলেছেন, জনজাতি সমাজের কাছে থাকা প্রকৃতি ও ভেষজ জ্ঞান মানবজাতির জন্য অমূল্য সম্পদ। পতঞ্জলি এই হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণের কাজ শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত সীমিত এলাকায় ১০১১টি গাছের সন্ধান মিলেছে এবং পুরো রাজ্যে অনুসন্ধান চালিয়ে গেলে আরও বড় তথ্য সামনে আসতে পারে। কাজটি কঠিন হলেও জনজাতি সমাজের সহযোগিতায় এটি সফলভাবে এগিয়ে চলছে।
Advertisement



