• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 16 October, 2026

শরৎ এল রে: ইতিহাসের সাক্ষী জঙ্গলমহলের গ্রাম, লালজলে প্রথমবার দুর্গাপুজোর দায়িত্বে মহিলারা

ঝাড়গ্রামের জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি এলাকায়, শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বেলপাহাড়ির লালজল গ্রামে এখন দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি তুঙ্গে। পুজো উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে শুরু করে দেবীর ভোগের জন্য হাতে খই ভাজা— সব কাজেই ব্যস্ত গ্রামের মহিলারা

শরৎ এল রে: ইতিহাসের সাক্ষী জঙ্গলমহলের গ্রাম, লালজলে প্রথমবার দুর্গাপুজোর দায়িত্বে মহিলারা

Image: SNS

হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সেই গ্রামের দুর্গাপুজোর (Durga Puja) আয়োজনের দায়িত্ব এ বারই প্রথম নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন মহিলারা। তাঁদের এই উদ্যোগে উৎসবের আবহে যোগ হয়েছে নতুন উদ্দীপনা, পাশাপাশি গ্রামজীবনে মহিলাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।

ঝাড়গ্রামের জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি এলাকায়, শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বেলপাহাড়ির লালজল গ্রামে এখন দুর্গাপুজোর (Durga Puja) প্রস্তুতি তুঙ্গে। পুজো উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে শুরু করে দেবীর ভোগের জন্য হাতে খই ভাজা— সব কাজেই ব্যস্ত গ্রামের মহিলারা।

লালজলের প্রাচীন গুহাগুলিকে ঘিরে রয়েছে ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের এক স্বতন্ত্র মেলবন্ধন। মনে করা হয়, এক সময় প্রাগৈতিহাসিক মানুষের আশ্রয়স্থল ছিল এই গুহাগুলি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশাপাশি স্থানীয় লোককথাও এই গ্রামের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সুদূর অতীতের নানা রহস্যের সঙ্গে এখানে মিশে রয়েছে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভক্তি।

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: কেষ্টপুর প্রফুল্লকাননে (পশ্চিম) আদিবাসীবৃন্দের নিবেদন ‘যাহাতে মন রমি’

গ্রামের বাসিন্দা কপিল মুণ্ডা বলেন, ‘আগে কলকাতা থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এখানে এসে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করতেন। তাঁরা এখান থেকে পাওয়া অস্ত্রশস্ত্র ও বিভিন্ন ব্যবহার্য সামগ্রী নিয়ে গিয়েছিলেন।‘

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পাহাড় ও গুহাগুলি শুধুমাত্র প্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শন নয়, ধর্মীয় বিশ্বাসেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পাহাড়ের উপরে অবস্থিত একটি গুহাকে তাঁরা বুড়াবাবা অর্থাৎ মহাদেবের বাসস্থান বলে মনে করেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রীতি মেনে পুরোহিত নিয়মিত পাহাড়ে উঠে ওই গুহার ভিতরে পুজো করেন।

পুরোহিতের কথায়, ‘ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে এই গুহাগুলিতে মানুষের বসবাস ছিল। আত্মরক্ষা ও শিকারের জন্য তাঁরা অস্ত্র ব্যবহার করতেন। এখান থেকে সেই ধরনের কিছু সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে এই গুহা একটি পবিত্র স্থানও।‘

লালজলের ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবীর আবির্ভাব এবং ভক্তদের আশীর্বাদ করার নানা কাহিনি। গ্রামের বাসিন্দাদের অনেকেই এমন কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলেন, যেগুলিকে তাঁরা দৈব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন। স্থানীয় বিশ্বাস, এই স্থানে আন্তরিক ভাবে প্রার্থনা করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়।

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: উমা চারদিন বাপের বাড়িতে থাকলে মহাদেব কি তাঁকে চোখে হারান?

গ্রামের বাসিন্দা সুমিত মান্ডি এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘এক দিন ঝিলিমিলি থেকে ফিরছিলাম। সেই সময় মনে হয়েছিল, মা দুর্গা যেন ওই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রথমে ভেবেছিলাম, গ্রামেরই কোনও মহিলা হবেন। কিন্তু তাঁকে ডাকলেও কোনও উত্তর পাইনি। তখন ভয় পেয়ে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাই।‘

বিকাশ হাঁসদা জানিয়েছেন, গ্রামে মা বাসন্তীর পুজো ৮৩ বছর ধরে চলে আসছে। তিনি আরও জানান, স্থানীয় সাধক রামস্বরূপ বাবা এক সময় ওই স্থানে টানা ১২ বছর ধরে ধ্যান করেছিলেন।

দুর্গাপুজোর উৎসব ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যেই মহিলাদের এই উদ্যোগ লালজলের দীর্ঘ দিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জঙ্গলমহলের এই প্রত্যন্ত গ্রামে প্রাচীন গুহা যেমন অতীতের মানবসভ্যতার স্মৃতি বহন করছে, তেমনই লোককথা ও ধর্মীয় বিশ্বাস ধরে রেখেছে বহু প্রজন্মের ঐতিহ্য। এ বার দুর্গাপুজো সেই ঐতিহ্যকে উদ্‌যাপনের পাশাপাশি গ্রামের মহিলা ও মেয়েদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

দেখুন: