বর্গির হামলার আতঙ্কে একসময় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল পূর্বপুরুষদের। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই গোপনে চলত দুর্গাপুজো (Durga Puja)। রান্না করে দেবীকে ভোগ নিবেদনের সুযোগ ছিল না। তাই কাঁচা চাল, ডাল, আনাজ ও মাছ দিয়েই হতো দেবীর আরাধনা। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে, পেরিয়ে গিয়েছে কয়েক শতাব্দী। কিন্তু সেই কঠিন সময়ের স্মৃতি আজও ধরে রেখেছে ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবার সেনগুপ্ত পরিবারের ‘রজনী কুটির’-এর দুর্গাপুজো। প্রাচীন সেই রীতিকে মেনে আজও দেবীকে নিবেদন করা হয় কাঁচা আনাজ ও মাছ। সেনগুপ্ত পরিবারের দাবি, এই পুজোর ইতিহাস প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো।
অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার বান্ধব দৌলতপুরে পরিবারের পূর্বপুরুষ তথা প্রখ্যাত কবিরাজ রামগতি সেনগুপ্ত এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। সেই সময় বর্গিদের হামলার আশঙ্কায় পুজো আয়োজন করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল পরিবারকে। প্রাণ বাঁচাতে একসময় তাঁদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে রান্না করা ভোগ দেওয়ার উপায় ছিল না। ফলে কাঁচা চাল, ডাল, আনাজ ও মাছ দিয়েই দেবীকে পুজো করার রীতি চালু হয়।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: কলম দিয়ে দেবী আরাধনা, ১৩ হাজার কলমে তৈরি দুর্গার মূর্তি
পরবর্তী সময়ে সেই রীতিই পরিবারের ঐতিহ্যে পরিণত হয়। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ঝাড়গ্রামে চলে আসেন সেনগুপ্ত পরিবারের সদস্যেরা। বাছুরডোবায় গড়ে ওঠে তাঁদের নতুন ঠিকানা ‘রজনী কুটির’। ১৯৪৮ সাল থেকে সেখানে শুরু হয় পারিবারিক দুর্গাপুজো। তবে জায়গা বদলালেও বদলায়নি পূর্বপুরুষদের আমল থেকে চলে আসা পুজোর নিয়মকানুন।
রজনী কুটিরের পুজোয় দেবীর(Durga Puja) সামনে সাজিয়ে দেওয়া হয় চাল, ডাল এবং বিভিন্ন ধরনের কাঁচা আনাজ। সেই তালিকায় থাকে আলু, ফুলকপি, বেগুন, মুলো, কাঁচকলার মতো নানা সবজি। পাশাপাশি কাঁচা মাছেও নুন হলুদ মাখিয়ে দেবীকে নিবেদন করা হয়। তবে এই ভোগ পরিবারের সদস্যেরা গ্রহণ করেন না। নিয়ম মেনে তা ব্রাহ্মণকে দান করা হয়।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: দেবী দুর্গার নয়টি রূপ কী জানেন?
প্রতিমাতেও রয়েছে বিশেষত্ব। একচালার প্রতিমায় লক্ষ্মীর পাশে থাকেন কার্তিক এবং সরস্বতীর পাশে গণেশ। পুজোর নবমীতে পালন করা হয় ‘শত্রু বলি’র প্রথা। চালের গুঁড়ি দিয়ে মানুষের অবয়ব তৈরি করে প্রতীকী বলি দেওয়া হয়। প্রাচীন রীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই আচারও আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছে পরিবার।
বর্গির হামলার ভয় থেকে যে পুজোর রীতির জন্ম হয়েছিল, তা আজ সেনগুপ্ত পরিবারের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই ঐতিহ্যকে আগলে রেখেছেন পরিবারের সদস্যেরা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় চারপাশের অনেক কিছু বদলে গেলেও রজনী কুটিরের দুর্গাপুজোয় আজও অমলিন ইতিহাসের সেই স্মৃতি। এখানে দেবীর আরাধনা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পূর্বপুরুষদের সংগ্রাম ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখারও এক অনন্য প্রয়াস।
দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/N6g_XzAG6tA?si=tTlInQvtovbbr7U7″ title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>