হুগলির পাণ্ডুয়ার বৈঁচিগ্রাম বিএল (বিহারীলাল) ফ্রি স্কুল একসময় ছিল জমিদার বাড়ি। কালের পরিবর্তনে সেই বাড়ি আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একদা সম্পদ ও প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই জমিদারবাড়ি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ও জনকল্যাণের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে প্রতি শরতে সেই প্রাঙ্গণ ফিরে পায় আর এক পরিচয়। প্রায় ১৮৬ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজোকে ঘিরে আজও সেখানে ফিরে আসে উৎসবের আবহ, জেগে ওঠে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতি।
বৈঁচিগ্রাম বিএল স্কুলের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই দুর্গাপুজোর ইতিহাস। এই কাহিনির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন জমিদার বিহারীলাল মুখোপাধ্যায়, তাঁর বাবা ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায় এবং সমাজসংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম।
কান্নান কলেজের অধ্যক্ষ ড. গৌতম বিট জানান, এই পুজোর সূচনা করেছিলেন ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায়, যিনি ছিলেন বিহারীলাল মুখোপাধ্যায়ের বাবা। পরবর্তীকালে মুখোপাধ্যায় পরিবার বৈঁচিগ্রামে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করে এবং বিহারীলালের সময়ে সেই জমিদারির প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বিহারীলালের কোনও সন্তান ছিল না। তাঁর বিপুল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নই একসময় বৃহত্তর সামাজিক তাৎপর্য লাভ করে।
এই প্রেক্ষাপটেই পরিবারটির সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তবে জমিদারবাড়িকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়াটি একদিনে সম্পন্ন হয়নি। বিহারীলালের সম্পত্তি কীভাবে জনকল্যাণের কাজে ব্যবহার করা যায়, সেই বিষয়ে একাধিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই এই পরিবর্তনের সূচনা হয়।
বলাগড়ের বিশিষ্ট আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান, ১৮৭০ সালের ৯ আগস্ট বিহারীলাল তাঁর সম্পত্তির ভবিষ্যৎ ব্যবহার সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের ইচ্ছার কথা নথিবদ্ধ করেন। এলাকার ইতিহাসসংক্রান্ত সরকারি নথিতে এই দলিল প্রস্তুতির সঙ্গে বিদ্যাসাগরের যোগাযোগের উল্লেখ রয়েছে। বিহারীলালের মৃত্যুর পর তাঁর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর সক্রিয় ভূমিকা নেন।
এরপর ১৮৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় বিহারীলাল হাই ফ্রি স্কুল। একই বৃহত্তর জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ও। ফলে একসময়ের জমিদারবাড়ি ধীরে ধীরে নতুন পরিচয় লাভ করে। জমিদার পরিবারের বাসস্থান হিসেবে তার পরিচয় ছাপিয়ে সেখানে গুরুত্ব পেতে থাকে শিক্ষা ও জনসেবার ভাবনা। তবে এই পরিবর্তনের বহু আগে থেকেই শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজো। জমিদারবাড়ির নানা পরিবর্তনের মধ্যেও সেই পুজো আজও ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন এবং গমন কিসের উপর নির্ভর করে জানেন, তাহলে জেনে নিন
প্রাচীন স্থাপত্যে কালের ক্ষত, তবু টিকে রয়েছে ঐতিহ্য
বর্তমানে পুরনো জমিদারবাড়ির স্থাপত্যে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। বড় বড় খিলানযুক্ত নাটমন্দিরটি আজও দুর্গাপুজো ও জগদ্ধাত্রীপুজোর সঙ্গে জড়িত। প্রবেশপথের কাছে রয়েছে একটি রাসমন্দির, যার গায়ে এখনও টেরাকোটার অলংকরণের চিহ্ন দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’টি স্থাপত্যই ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলির সংস্কারের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে সেই কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
একচালার প্রতিমা, সবুজ মহিষাসুর
বৈঁচিগ্রাম বিএল স্কুলের দুর্গাপুজোর নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখানে ঐতিহ্য মেনে একচালার প্রতিমা তৈরি করা হয়। দেবী দুর্গার সঙ্গে একই চালায় থাকেন লক্ষ্মী, গণেশ, সরস্বতী ও কার্তিক। প্রতিমার মুখাবয়বে ফুটে ওঠে বাঙালিয়ানার স্বতন্ত্র ছাপ। দীর্ঘ চোখ ও চিরাচরিত বাঙালি বৈশিষ্ট্য এই প্রতিমাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
তবে প্রতিমার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল মহিষাসুরের গায়ের রং। এখানে মহিষাসুরকে সবুজ রঙে চিত্রিত করা হয়, যা এই পুজোর অন্যতম স্বতন্ত্র আকর্ষণ।
স্কুল প্রাঙ্গণেই দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করা হয়। পরে সেগুলিকে মূল বেদিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বৈদিক রীতি মেনে পুজোর যাবতীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে কিছু প্রথাও। একসময় এই পুজোয় পশুবলি দেওয়ার রীতি ছিল। বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ হয়েছে। তার পরিবর্তে কুমড়ো ও কলা উৎসর্গ করা হয়।
বদলে গিয়েছে বিসর্জনের রীতি
স্থানীয় বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অসিত চট্টোপাধ্যায় জানান, একসময় এই পুজোর বিসর্জন ছিল গ্রামবাসীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণের এক বিশেষ উপলক্ষ। গ্রামের মানুষ কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে চারটি পাড়া পরিক্রমা করতেন। এরপর স্কুলের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হত। এই শোভাযাত্রা পুজোকে গ্রামের বৃহত্তর সামাজিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রথা হারিয়ে গিয়েছে। প্রতিমা কাঁধে করে বহন করার মতো পর্যাপ্ত মানুষের অভাবে এখন ট্র্যাক্টরে করে প্রতিমা নিয়ে চারটি পাড়া পরিক্রমা করা হয়। তারপর সম্পন্ন হয় বিসর্জন। বিসর্জনের এই পরিবর্তন শুধু একটি রীতির বদল নয়, বরং গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।
আর্থিক সংকট ও বদলে যাওয়া সামাজিক পরিসর
এই দুর্গাপুজোর আর্থিক ও সামাজিক ভিত্তিও আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। একসময় পুজোর আয়োজনের ক্ষেত্রে ট্রাস্টি বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সরকারি সাহায্যও পাওয়া যেত, যদিও তার পরিমাণ ছিল সীমিত। কিন্তু বছরের পর বছর সেই সাহায্য পুজোর সমস্ত খরচ মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট হয়ে ওঠেনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালের পর থেকে পুজোর পুরনো ব্যবস্থাপনা ও একাধিক প্রথা ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে। এর ফলে উৎসবের আয়োজনেও পরিবর্তন আসে।একসময় নবমীর দিন অঞ্জলি দিতে স্কুল প্রাঙ্গণে প্রচুর মানুষের সমাগম হত। দুর্গাপুজো, দোলযাত্রা এবং জগদ্ধাত্রীপুজোকে কেন্দ্র করে একই প্রাঙ্গণে মিলিত হতেন গ্রামের বহু মানুষ।
গ্রামবাসীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সমবেত ভোজনের ব্যবস্থাও করা হত। এই উৎসবগুলি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং গ্রামের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কালের পরিবর্তনে সেই জমায়েত ও সামাজিক যোগাযোগের পরিসর অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে।
পুজোর আড়ালে শিক্ষা ও জনকল্যাণের ইতিহাস
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পুজোর গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষা বিস্তার, সমাজকল্যাণ এবং স্থানীয় ইতিহাসের একাধিক স্তর।
একদিকে রয়েছে জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে শিক্ষা ও জনকল্যাণের কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারমূলক ভাবনা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামবাসীদের মধ্যে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
এই সমস্ত দিক মিলিয়ে বৈঁচিগ্রাম বিএল স্কুলের দুর্গাপুজো স্থানীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
আজ সেই জমিদারবাড়ির জৌলুস আর নেই। আর্থিক সংস্থান সীমিত, পুরনো স্থাপত্যগুলি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত এবং বহু প্রাচীন প্রথা হারিয়ে গিয়েছে। তবুও প্রতি শরতে স্কুলের প্রাঙ্গণে দেবী দুর্গার আরাধনা হয়।
সময়ের স্রোতে বদলে গিয়েছে বাড়ির পরিচয়, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, সংকুচিত হয়েছে উৎসবের পরিসর। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরনো প্রাঙ্গণে দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার—যেখানে জমিদারবাড়ির স্মৃতি, বিদ্যাসাগরের সমাজভাবনা, শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাস এবং গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক জীবন একসূত্রে বাঁধা।
দেখুন:




