১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে এক রহস্যময় সন্ন্যাসীর মৃত্যুর পর খুলে গেল ইতিহাসের এক অদ্ভুত দরজা। অযোধ্যার সিভিল লাইনের রামভবনে দীর্ঘদিন ধরে নিভৃতে বসবাস করতেন সেই সন্ন্যাসী। পরিচয় গোপন রাখাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কেউ তাঁকে চিনতেন ভগবানজি নামে, কেউ বলতেন গুমনামি বাবা। মৃত্যুর পর তাঁর ঘর থেকে উদ্ধার হল অসংখ্য চিঠি, বই, পত্রপত্রিকা, হাতে লেখা নোট এবং নানা ব্যক্তিগত সামগ্রী। সেগুলির মধ্যে এমন কিছু সূত্র ছিল, যা আবারও সামনে নিয়ে এল স্বাধীন ভারতের অন্যতম বড় রহস্য—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান।
সেই সন্ন্যাসী কি সত্যিই নেতাজি (Netaji) ? ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়নি? দেশবাসীর অজান্তে কি তিনি দীর্ঘ চার দশক অন্য পরিচয়ে বেঁচে ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন নেতাজির (Netaji) কোনও ঘনিষ্ঠ অনুগামী, যাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে সুভাষচন্দ্রের (Netaji Subhash Chandra Bose) জীবন ও সংগ্রামের অসংখ্য স্মারক জমা হয়েছিল? প্রশ্নগুলির উত্তর আজও বিতর্কের আড়ালে। কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না। সেই সন্ন্যাসীর ঘরে পাওয়া চিঠিপত্র, নথি ও বইপত্র ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান। সেগুলিকে অবহেলায় নষ্ট হতে দেওয়া মানে ভবিষ্যতের গবেষণার পথ বন্ধ করে দেওয়া। কোনও মানুষের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিতর্কের সাক্ষ্য বহনকারী দলিলগুলি হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

ভগবানজির মৃত্যুর পর তাঁর ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া সামগ্রী নিয়ে উত্তরপ্রদেশের সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ‘Northern India Patrika’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘The Man of Mystery’ শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদন সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করে তোলে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে ছিল নেতাজির পরিবারের ছবি, আজাদ হিন্দ বাহিনী সম্পর্কিত নানা উপাদান, নেতাজির জীবন ও অন্তর্ধান নিয়ে প্রকাশিত বই, সংবাদপত্র, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন এবং হাতে লেখা অসংখ্য নোট। ছিল টাইপরাইটার, রেডিও, দূরবিনসহ নানা ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস। এই সংগ্রহের প্রতিটি উপাদান যেন নতুন কোনও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছিল।
তবে কোনও ব্যক্তির কাছে নেতাজির ছবি বা তাঁর জীবন সম্পর্কিত বই থাকা মানেই তিনি নেতাজি (Netaji) —এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। একজন অনুগামী, গবেষক কিংবা ঘনিষ্ঠ সহযোগীর কাছেও এই ধরনের সংগ্রহ থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুমান নয়, প্রমাণের নিরপেক্ষ বিচার। গুমনামি বাবাকে ঘিরে রহস্য আরও গভীর হয়ে ওঠে তাঁর সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির যোগাযোগের বিবরণ সামনে আসার পর। বিশেষ করে অতুল সেন, পবিত্রমোহন রায় এবং লীলা রায়ের নাম এই প্রসঙ্গে বারবার উঠে এসেছে। অতুল সেন ছিলেন নেতাজির পরিচিত এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি। বিভিন্ন প্রকাশিত বিবরণে জানা যায়, উত্তরপ্রদেশের নিমসারে তাঁর সঙ্গে ভগবানজির যোগাযোগ হয়েছিল। সেই সূত্রে কলকাতার পুরনো নেতাজি-ঘনিষ্ঠ মহলে এই রহস্যময় সন্ন্যাসীর কথা পৌঁছে যায় বলে দাবি করা হয়।

পবিত্রমোহন রায় ছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত এবং নেতাজির গোয়েন্দা বিভাগের কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক ব্যক্তি। স্বাধীনতার পরেও নেতাজিকে ঘিরে থাকা নানা প্রশ্নের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বজায় ছিল। প্রকাশিত বিবরণ অনুসারে, ষাটের দশকের গোড়ায় নিমসারে ভগবানজির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পরবর্তী সময়েও সেই সম্পর্ক বজায় ছিল বলে জানা যায়। ভগবানজির ঘরে পবিত্রমোহন রায়ের লেখা চিঠি পাওয়া গিয়েছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে পবিত্রমোহনের কাছেও ভগবানজির চিঠি ও তাঁর বক্তব্যের লিখিত বিবরণ থাকার কথা জানা যায়। এই চিঠিপত্রের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ধারণ করতে হলে মূল নথিগুলির প্রামাণিকতা, তারিখ এবং বিষয়বস্তু পরীক্ষা করা জরুরি।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে আবেদন, নেতাজি তদন্তে নতুন কমিশন চায় ভারত
এই সূত্রে লীলা রায়ের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, বিপ্লবী সংগঠক এবং নেতাজির পরিচিত। নারীশিক্ষা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বীকৃত। বিভিন্ন প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়েছে, পবিত্রমোহন রায়ের মাধ্যমে ভগবানজির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। ভগবানজির জন্য কিছু সামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন বলে দাবি করা হয়। প্রশ্ন জাগে, নেতাজির মতো একজন মানুষের জীবন ও সংগ্রামের এত কাছাকাছি থাকা এই বিপ্লবীরা কেন এক অজ্ঞাত সন্ন্যাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন? তাঁরা কি তাঁর মধ্যে সুভাষচন্দ্রকে (Netaji Subhash Chandra Bose) চিনতে পেরেছিলেন, নাকি তাঁর কাছে এমন কোনও তথ্য ছিল, যা তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর অনুমানের ভিত্তিতে দেওয়া যায় না। তাঁদের চিঠিপত্র, স্মৃতিকথা এবং সমসাময়িক নথির তুলনামূলক পাঠই হয়তো সেই যোগাযোগের প্রকৃত অর্থ বুঝতে সাহায্য করবে।

বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে ভগবানজির সম্পর্কের দাবিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর গোষ্ঠীর বহু বিপ্লবী স্বাধীনতার পরেও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের অনেকেই নেতাজির রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগ্রামের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিলেন। কিন্তু সেই সাধারণ ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কাউকে ভগবানজির প্রত্যক্ষ যোগাযোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। প্রত্যেকটি নামের পাশে চাই নির্ভরযোগ্য দলিল, চিঠি কিংবা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের সমর্থন। সেই কারণেই এই সংগ্রহের গুরুত্ব এত বেশি। আজ যে চিঠি কেবল একটি ব্যক্তিগত যোগাযোগের সাক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে, আগামী দিনে হয়তো অন্য কোনও নথির সঙ্গে মিলিয়ে তার তাৎপর্য নতুনভাবে বোঝা যাবে।
গুমনামি বাবা কি সুভাষচন্দ্র বসু? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বহু মানুষ নানা যুক্তি তুলে ধরেছেন। ভগবানজির ঘরে নেতাজির পরিবারের ছবি ও তাঁর জীবন সম্পর্কিত বই পাওয়া গিয়েছিল। নেতাজির পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিবরণ সামনে এসেছে। তাঁর হাতের লেখার সঙ্গে নেতাজির হাতের লেখার তুলনা করা হয়েছে। তাঁর কণ্ঠস্বর, অভ্যাস এবং ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এসব তথ্যের কোনওটিকেই বিচ্ছিন্নভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায় না। হাতের লেখার সম্পূর্ণ সাদৃশ্যে নিরিখে বিশিষ্ট হস্তলিপি বিশারদ ডক্টর বংশী লাল কাপুর তার ২২ পাতা সুচিন্তিত রিপোর্ট মুখার্জি কমিশনের সামনে দাখিল করেছিল। দাঁতের নমুনা নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার ফলও বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারেনি।

বিচারপতি এম. কে. মুখার্জির নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশন গুমনামি বাবা যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন, তা বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণে স্বীকার করতে পারেনি| কিন্তু ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে জাস্টিস মানুষ মুখার্জি স্বীকার করেছেন, সেই সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র বসু। পরবর্তী সময়ে উত্তরপ্রদেশের বিচারপতি বিষ্ণু সহায় কমিশনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু এখানেই অনুসন্ধানের শেষ হওয়া উচিত কি? আমার মনে হয়, ঠিক এখান থেকেই শুরু হওয়া দরকার আরও নিরপেক্ষ গবেষণা। ভগবানজির সংগ্রহে থাকা সামগ্রী নেতাজির অনুগামীদের জীবন, স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্মৃতি ও বিশ্বাসের ইতিহাস অধ্যায়নে সাহায্য করতে পারে। আর যদি কোনও দলিলে এমন তথ্য থাকে, যা প্রচলিত ইতিহাসের কোনও অংশকে নতুন করে বিচার করতে বাধ্য করে, তবে তারও যথাযথ গবেষণাধর্মী পরীক্ষা হওয়া দরকার।
ভগবানজির মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত সামগ্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয়। নেতাজির দাদা সুরেশচন্দ্র বসুর কন্যা ললিতা বসু এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে দাবি করেন, সেই সন্ন্যাসী নেতাজি ছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে; কিন্তু তাঁর কাছে পাওয়া সামগ্রী ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য সংরক্ষণ করা দরকার। আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশের পর সামগ্রীগুলি সরকারি হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। পরে এলাহাবাদ হাইকোর্টের লখনউ বেঞ্চে এই সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলে। ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি Lalita Bose and Others v. State of U.P. and Others মামলায় আদালত ঐতিহাসিক সামগ্রীগুলির সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়।

আদালতের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য ছিল, ভগবানজির সংগ্রহকে ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা যায়। একটি উপযুক্ত জাদুঘর বা প্রদর্শনস্থল গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে সামগ্রীগুলির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে। এই নির্দেশের মধ্যে ছিল একটি গভীর ঐতিহাসিক শিক্ষা। কোনও বিতর্কিত অধ্যায়কে অস্বীকার করে ইতিহাসের অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলি মুছে ফেলা যায় না। বরং প্রমাণগুলি যত্ন করে রেখে দিতে হয়, যাতে ভবিষ্যতের গবেষকেরা সেগুলি পরীক্ষা করে নিজেদের সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন। কিন্তু সরকারি হেফাজতে সামগ্রী রাখা আর সেগুলিকে আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা এক কথা নয়।
কাগজের বয়স বাড়ে, আর্দ্রতায় নষ্ট হয়, কালি বিবর্ণ হয়ে আসে। অনুপযুক্ত পরিবেশে বহু পুরনো চিঠির অক্ষর একসময় পড়ার অযোগ্য হয়ে যেতে পারে। সঠিক সংরক্ষণ না থাকলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই ঐতিহাসিক নথিগুলি নষ্ট হতে পারে চিরকালের জন্য। তাই আজ জানতে ইচ্ছে করে, সেই সমস্ত সামগ্রীর বর্তমান অবস্থা কী? সেগুলির পূর্ণাঙ্গ তালিকা কি তৈরি হয়েছে? কতগুলি নথি অক্ষত রয়েছে? সেগুলির উচ্চমানের ডিজিটাল প্রতিলিপি তৈরি হয়েছে কি? গবেষকেরা কি সেগুলি পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর জনসমক্ষে আসা দরকার। কারণ, ইতিহাসের সম্পদ রক্ষা করা প্রশাসনিক দায়িত্ব!

সাম্প্রতিক সময়ে নেতাজি-সংক্রান্ত গবেষণার কাজে বন্ধু সৌমব্রত দাশগুপ্ত এবং গবেষক কুণাল বসুর সঙ্গে উত্তরপ্রদেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই সফর আমার কাছে কেবল কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান দেখার অভিজ্ঞতা নয়। দীর্ঘদিন ধরে ধোঁয়াশায় ঢাকা একটি অধ্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছনোর চেষ্টা। ষাট, সত্তর ও আশির দশকে এই রহস্যময় সন্ন্যাসীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পরিচিত কয়েকটি স্থান দেখেছি। তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের স্মৃতিতে জমে থাকা নানা ঘটনার বিবরণ শুনেছি। সেই সূত্রে এমন কিছু চিঠিপত্র দেখার সুযোগ হয়েছে, যেগুলি আমার বিচারে নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে ভবিষ্যতের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সেই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবিয়েছে। ইতিহাসের অনেক মূল্যবান উপাদান এখনও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কিছু সরকারি হেফাজতে, কিছু ব্যক্তিগত সংগ্রহে। কোনও কোনও চিঠির তাৎপর্য বুঝতে হলে অন্য কোনও চিঠির সঙ্গে তার তুলনা করতে হবে। কোনও হাতে লেখা নোটের প্রেক্ষাপট বুঝতে প্রয়োজন হতে পারে সমসাময়িক সংবাদপত্র বা সরকারি নথির সাহায্য। অথচ এই সব দলিলের অনেকগুলিই এমন মানুষের কাছে রয়েছে, যাঁদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও স্মৃতির ওপর নির্ভর করে সেগুলি এত দিন বেঁচে আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রহের মালিকানা বদলাতে পারে। কোনও উত্তরাধিকারী হয়তো দলিলটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝবেন না।
কোনও চিঠি হারিয়ে যেতে পারে, কোনও কাগজ নষ্ট হতে পারে, আবার কোনও নথি এমনভাবে আড়ালে চলে যেতে পারে যে পরবর্তী প্রজন্ম তার অস্তিত্বের কথাও জানতে পারবে না। এই আশঙ্কাই আমাকে সবচেয়ে বেশি বিচলিত করে। তাই ডিজিটাল ফরমেটে সেই সমস্ত তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুক সরকার এই আশা রাখি | সেই দলিলগুলি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হলে গবেষকেরা সেগুলির সত্যতা যাচাই করতে পারবেন। বিভিন্ন নথির মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে দেখতে পারবেন। প্রয়োজন হলে কোনও দাবিকে ভুল বলেও প্রমাণ করতে পারবেন। আমাদের কাজ রহস্যকে আরও রহস্যময় করে তোলা নয়। আমাদের কাজ রহস্যের আড়ালে থাকা প্রমাণগুলিকে আলোর সামনে নিয়ে আসা।

এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এবং রাজ্য প্রশাসনের কাছে আমার বিনীত আবেদন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হোক। কলকাতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর (Netaji Subhash Chandra Bose) জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই শহরের পথঘাট, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু স্মৃতি তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তাই নেতাজি-সংক্রান্ত দুর্লভ চিঠিপত্র ও ঐতিহাসিক নথির প্রতিলিপি সংরক্ষণের জন্য কলকাতায় একটি আধুনিক গবেষণাগার ও মহাফেজখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আমার প্রস্তাব, পশ্চিমবঙ্গ সরকার উত্তরপ্রদেশ সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করুক। অযোধ্যার জেলাশাসকের হেফাজতে থাকা ভগবানজির সামগ্রীর বর্তমান অবস্থা, পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হোক। আইনগত অনুমতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি নিয়ে সেই সব নথির উচ্চমানের ডিজিটাল প্রতিলিপি অথবা প্রত্যয়িত প্রতিলিপি কলকাতার প্রস্তাবিত গবেষণাগারে রাখার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে ভগবানজির অনুগামী ও ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের কাছেও আবেদন জানানো হোক, তাঁদের কাছে থাকা চিঠিপত্র ও নথির বিবরণ যেন গবেষণার স্বার্থে নথিভুক্ত করা হয়। মূল দলিল হস্তান্তর করা সম্ভব না হলে অন্তত সেগুলির উচ্চমানের ডিজিটাল প্রতিলিপি সংগ্রহ করা যেতে পারে। প্রতিটি নথির সঙ্গে তারিখ, প্রেরক, প্রাপক, উৎস, মালিকানার ইতিহাস এবং প্রামাণিকতা সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্য যুক্ত থাকুক।
আরও পড়ুন: নেতাজির পাশে বিউগল বাজাতে দেখা যায়- এই ব্যক্তিকে চেনেন, এঁর উত্তরাধিকারী কোথায় জানেন?
এই মহাফেজখানা শুধু গুমনামি বাবাকে ঘিরে থাকা দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নেতাজি, আজাদ হিন্দ বাহিনী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য দুর্লভ চিঠি, সংবাদপত্র, স্মৃতিকথা ও সরকারি নথির প্রতিলিপিও এখানে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। গবেষকদের জন্য একটি ডিজিটাল ক্যাটালগ তৈরি হলে দেশ-বিদেশের ইতিহাসবিদেরা সহজেই সেই উপাদানগুলির সন্ধান পাবেন। এ কাজে ইতিহাসবিদ, সংরক্ষণবিদ, হস্তলিপি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের যুক্ত করা জরুরি। প্রতিটি দলিলের প্রামাণিকতা যাচাই করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোথাও মতভেদ থাকলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। কোনও বিতর্কিত দাবিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে তুলে ধরা চলবে না। আবার কোনও দলিলকে শুধু বিতর্কিত বলে উপেক্ষাও করা উচিত নয়।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। রাজনীতি ও বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে প্রমাণকে রক্ষা করার এই উদ্যোগ আগামী প্রজন্মের কাছে এক মূল্যবান উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কোনও একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নন। তিনি সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন, আদর্শ, আত্মত্যাগ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর অবদানকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও মূল্যায়ন করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। গুমনামি বাবা নেতাজি ছিলেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
কিন্তু সেই উত্তর খোঁজার জন্য যে দলিলগুলি প্রয়োজন, সেগুলিকে অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। ভগবানজির সংগ্রহে থাকা চিঠিপত্র আমাদের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দরজা খুলে দিতে পারে। আজ উত্তরপ্রদেশে ছড়িয়ে থাকা নেতাজি-সম্পর্কিত চিঠিপত্র ও নথি সংরক্ষণের দাবি তাই কোনও ব্যক্তিগত কৌতূহলের বিষয় নয়। এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন, উত্তরপ্রদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এই অমূল্য দলিলগুলির প্রতিলিপি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হোক। কলকাতায় একটি গবেষণাগার ও মহাফেজখানা গড়ে তোলা হোক, যেখানে গবেষকেরা যথাযথ নিয়ম মেনে এই নথিগুলি পরীক্ষা করতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষও ইতিহাসের এই অধ্যায় সম্পর্কে জানতে পারবেন।
হয়তো আজই সমস্ত রহস্যের সমাধান হবে না। হয়তো কোনও একটি চিঠি বহু বছরের প্রশ্নের উত্তর দেবে, আবার কোনও নথি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেবে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাটুকু বাঁচিয়ে রাখা আমাদের কর্তব্য। ইতিহাসের কোনও অধ্যায়ের শেষ কথা লেখার আগে তার সমস্ত সাক্ষ্যকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। যে চিঠিতে আজ অস্পষ্ট কালি, যে নোটে আজ অর্ধেক মুছে যাওয়া অক্ষর, যে দলিলে আজও লুকিয়ে রয়েছে অজানা অনেক গোপনসূত্র—সেগুলিই আগামী দিনের গবেষণার পাথেয় হয়ে উঠতে পারে।
নেতাজির অন্তর্ধানের রহস্যের যবনিকা কবে উঠবে, আমরা জানি না। কিন্তু সেই রহস্যের সাক্ষ্য বহনকারী দলিলগুলি যেন আমাদের অবহেলায় হারিয়ে না যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আমার আবেদন, ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসুন। নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা শুধু স্মরণে নয়, তাঁর ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষত রাখার মধ্যেও।
দেখুন:




