বাঙালি যেখানেই থাকুক পুজোর পাঁচ দিনের আনন্দকে মাত্র আড়াই দিনে চেটেপুটে নিতে পারে। পরবাসে থেকেও পুজোর (Durga Puja) গন্ধের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায়। আর এই বাঙালিয়ানাকে উপভোগ করতে চাইলে অবশ্যই আসতে হবে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যশালী পুজো-দক্ষিণীর দুর্গাপুজোয় (Durga Puja) ।
কয়েকটি বাঙালি পরিবার মিলে ১৯৮৫ সালে দক্ষিণীর এই পুজো শুরু করেছিল। ৪১টি শরৎ পেরিয়ে সেই পুজোর পরিধি আজ অনেকটাই প্রসারিত হয়েছে। বাঙালির এই নিজস্বতাকে ছুঁয়ে দেখতে হলে অবশ্যই আসতে হবে বিচ পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে দক্ষিণীর দুর্গাপুজোয় (Durga Puja) । ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর এই চারটে দিন ক্যালেন্ডারে লাল দাগ দিয়ে রাখুন। কোনওভাবেই তা মিস করা যাবে না। দক্ষিণীর পুজোয় (Durga Puja) প্রতিমা আসে কুমোরটুলি থেকে। এ বছর মণ্ডপে যে প্রতিমা থাকছে, সেটিও ২০২৪ সালে বাংলা থেকেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
পুজো সবার, দায়িত্বও সবার
পুজোর (Durga Puja) এই ক’টা দিন দক্ষিণীর সদস্যরা নিজের নিজের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। কেউ কলকাতা থেকে জনপ্রিয় শিল্পী আনার দায়িত্ব সামলান তো কেউ আবার সারা সপ্তাহ অফিস আর বাড়ির কাজ সামলে সপ্তাহান্তে কচিকাঁচাদের নিয়ে নাটকের মহড়ায় ব্যস্ত থাকেন। কেউ আবার পুজো ম্যাগাজিনের সম্পাদনার কাজ সামলাতে সারা রাত জেগে থাকেন। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেটপুজোর মেনু পরিকল্পনা করেন, কেউ ব্যস্ত থাকেন মণ্ডপসজ্জা নিয়ে। আবার পুজোর পুরোহিতের দায়িত্বও সামলান কেউ কেউ। এই ব্যস্ততার মধ্যেই একসঙ্গে কাজ করার, নিজেদের হাতে উৎসবকে সাজিয়ে তোলার আনন্দ মেতে ওঠে সবাই।

ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের দৌলতে প্রবাসের জীবন বাইরে থেকে যতই রঙিন মনে হোক, বাস্তবটা কিন্তু অতটা সহজ নয়। মার্কিন মুলুকের অর্থনৈতিক মন্দা, চাকরির বাজারে চরম অনিশ্চয়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রতিনিয়ত পাল্লা দিয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা কিংবা ভিসার কড়া নজর-সব মিলিয়ে পরবাসের জীবন অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু পুজোর এই তিন দিন যেন সব কিছু যেন বদলে যায়। প্রজেক্টের ডেডলাইন বুকে নিয়েও এক টুকরো মিঠে হাওয়া বয়ে যায়।
পেটপুজো ছাড়া পুজো অসম্পূর্ণ
দক্ষিণীর পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ভুরিভোজ। পেটপুজো ছাড়া বাঙালির কোনও পুজোই সম্পূর্ণ হয় না। সেই কথা মাথায় রেখেই পুজোর মেনুতে রাখা হয় নানা লোভনীয় পদ। পাঁঠার ঝোল থেকে সর্ষে ইলিশ, বিরিয়ানি, ধোকার ডালনা, ছানার জিলিপি—মেনুতে জায়গা করে নেয় বাঙালির প্রিয় প্রায় সব পদ।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে (বিদেশের পুজো) : ব্রিটেনের দুর্গাপুজো, শিকড়ে ফেরার তাগিদ
গান, নাটক, নাচে জমজমাট পুজো
দক্ষিণীর পুজো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া অসম্পূর্ণ। গোটা সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া অপেক্ষায় থাকে, দক্ষিণীর পুজোয় দেশ থেকে কোন গায়ক বা গায়িকা আসছেন সেটা দেখার জন্য। অনুপম রায় থেকে হরিহরণ কিংবা শান বহু জনপ্রিয় শিল্পীর গানেই অতীতে জমে উঠেছে এই পুজোর সন্ধ্যা।
এ বারও পুজোর (Durga Puja) চারদিন হবে জলসা। ১৬ অক্টোবর রাতে মাতাবেন মহালক্ষ্মী আইয়ার। ১৭ অক্টোবরের রাত মাতাতে বাংলা থেকে আসছেন মিস জোজো। এখানেই অবশ্য শেষ নয়। বাঙালির এই এক্সটেন্ডেড সেলিব্রেশন-এর কথা মাথায় রেখে দক্ষিণীর লক্ষ্মীপুজোর সন্ধ্যায় থাকছে ‘সারেগামাপা’-খ্যাত অঙ্কিতা ভট্টাচার্যের অনুষ্ঠান।
তবে শুধু দেশ থেকে আসা নামী শিল্পীদের নিয়েই অনুষ্ঠান হয় না। দক্ষিণীর নিজস্ব সদস্যরাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। কচিকাঁচা থেকে বড়দের নাটক, ফ্যাশন শো, নাচ, গান, আবৃত্তি-সব মিলিয়ে তৈরি হয় ষোলো আনা পুজোর আমেজ।
প্রবাসে ফিরে পাওয়া বাংলার গন্ধ
দক্ষিণী পুজোর (Durga Puja) ঢাকের বাদ্যি, শাঁখ-কাঁসরের আওয়াজ, অষ্টমীর পুজোর অঞ্জলি, পুরোহিতে কণ্ঠে উচ্চারিত মন্ত্র, ধূপ-ধুনোর সঙ্গে মিশে থাকা চণ্ডীপাঠ, সন্ধ্যারতি-সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক টুকরো বাংলা।
প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝে এই কয়েকটি দিন মন বার বার নস্টালজিয়ায় ভেসে যায়। দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও দুর্গাপুজোর (Durga Puja) হাত ধরে বাঙালি আসলে নিজের শিকড়কেই আঁকড়ে ধরতে চায়।
দেখুন:




