সেবকে (Sevoke) তিস্তার (Teesta) বুকে পঁচাশি বছর ধরে একা দাঁড়িয়ে করোনেশন সেতু (Coronation Bridge)। এবার সত্যিই কমতে চলেছে সেতুর সেই একার ভার। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ছয় লেনের বিকল্প সেতু তৈরির টেন্ডার ডেকে দিয়েছে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ এনএইচএআই (National Highways Authority of India)।
উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং চিকেনস নেকের সুরক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী বলাই যায়।
৮৫ বছরের বাঘপুল
সেবকের এই সেতু স্থানীয়দের কাছে পরিচিত বাঘপুল নামে। ব্রিটিশ আমলে ষষ্ঠ জর্জের রাজ্যাভিষেক স্মরণে ১৯৪১ সালে তৈরি হয় এই আর্চ শেপের খিলান সেতু। বাংলার তিন ইঞ্জিনিয়ার এসি দত্ত, এসকে ঘোষ ও কেপি রায়ের হাতে গড়া এই সেতু আজও উত্তরবঙ্গের গর্বের জায়গা।
কিন্তু ২০১১ সালের ভূমিকম্পে সেতুর গায়ে ফাটল ধরা পড়ে। তারপর থেকে দশ টনের বেশি ভারী যান চলাচল বন্ধ। অথচ শিলিগুড়ি থেকে পাহাড়, ডুয়ার্স ও উত্তর-পূর্বের দিকে যাতায়াতের একমাত্র সড়কপথ এই সেতুই।
বছরের পর বছর যানবাহনের চাপ বেড়েছে বহুগুণ। বিকল্প সেতুর দাবি তাই বারবার জোরালো হয়েছে স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের গলায়, আন্দোলনও হয়েছে বহুবার।
ছয় লেনের সেতু
তিস্তার উপর দ্বিতীয় সেতুর কথা প্রথম ভাবা হয় ২০২১ সালে। তখন চার লেনের সেতুর জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল কেন্দ্র। কিন্তু বন দপ্তরের ছাড়পত্র ও জমি জটিলতায় প্রকল্প থমকে যায় বছরের পর বছর।
পরে রাজ্য পূর্ত দফতরের হাত থেকে প্রকল্পের দায়িত্ব যায় ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটির (NHAI) হাতে। তারপর থেকেই কাজে কিছুটা গতি আসে। এই বছর এপ্রিলে সংসদের অর্থ সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটি সুপারিশ করে, ভবিষ্যতের যান চলাচল ও কৌশলগত গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে সেতুটি চার লেনের বদলে ছয় লেনের করা হোক।
সেই সুপারিশ মেনে পুরনো টেন্ডার বাতিল হয়। গত শুক্রবার নতুন করে ছয় লেনের সেতুর জন্য টেন্ডার ডাকে এনএইচএআই। প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার সেতু ও সংযোগকারী রাস্তা তৈরিতে খরচ হবে ৮৪৪ কোটি টাকা।
প্রকৌশল-ক্রয়-নির্মাণ পদ্ধতিতে অর্থাৎ ইপিসি (EPC) মডেলে হবে এই কাজ। ১ অক্টোবর পর্যন্ত টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে দেশের যে কোনও সংস্থা। চুক্তি সইয়ের পর কাজ শেষ করতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে তিন বছর।
চিকেন নেকের নিরাপত্তা
এই সেতু শুধু যাতায়াতের সুবিধার প্রশ্ন নয়, দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নও বটে। শিলিগুড়ি করিডর, যা চিকেনস নেক (Chicken’s Neck) নামে পরিচিত, সেই সরু ভূখণ্ড দিয়েই বাকি ভারতের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল।
নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা এই এলাকা থেকে চিন সীমান্তের দূরত্বও মেরেকেটে ১২০ কিলোমিটার। সেনাবাহিনীর দ্রুত চলাচল ও রসদ পৌঁছনোর জন্য চওড়া, মজবুত সড়কপথের প্রয়োজনীয়তা তাই বরাবরই ছিল।
দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা জানিয়েছেন, গত শুক্রবার এনএইচএআই এই টেন্ডার ডেকেছে। তাঁর মতে, বহু বছরের এই আবেদন অবশেষে পূর্ণতা পেতে চলেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ডুয়ার্স-শিলিগুড়ি সংযোগ মজবুত হবে। উত্তর-পূর্বের সঙ্গে যাতায়াতও হবে আরও সহজ।
বদলাবে ডুয়ার্স-সিকিমের ছবি
নতুন সেতু চালু হলে সরাসরি লাভবান হবে শিলিগুড়ি, কালিম্পং, দার্জিলিং পাহাড় ও সিকিমের বাসিন্দারা। চা বাগান শিল্প, পর্যটন ও কৃষিপণ্য পরিবহণেও সময় এবং খরচ বাঁচবে বিপুল।
ভারী গাড়ির চাপ কমলে পুরনো করোনেশন সেতুও অনেকটা স্বস্তি পাবে। সেতুর প্রবেশপথে বসানো সিংহমূর্তি আর খিলানের নকশা আজও পর্যটকদের ক্যামেরাবন্দি হওয়ার প্রিয় জায়গা। ১৯৫৩ সালে ডাকটিকিটেও জায়গা করে নিয়েছিল এই ছবি।
অতিরিক্ত চাপ সরলে ঐতিহ্যের এই সেতু হালকা গাড়ি আর ভ্রমণপ্রিয় মানুষের আনাগোনাতেই বেঁচে থাকবে আরও অনেক বছর। আট দশক পার করেও বাঘপুল তাই সগর্বে থেকে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবেই। শুধু কাজের ভারটা এবার ভাগ হয়ে যাবে দুই সেতুর মধ্যে।




