• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 19 September, 2026

Explainer: কাউন্টারে ক্যামেরা: পাড়ার ওষুধের দোকানেও কেন সিসিটিভি বসাতে চায় কেন্দ্র, এত আপত্তি কেন কেমিস্টদের?

ড্রাগস রুলস, ১৯৪৫ সংশোধনের খসড়ায় ওষুধের দোকানে সিসিটিভি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব কেন্দ্রের। কেন এই পদক্ষেপ, কেন আপত্তি কেমিস্টদের, জেনে নিন।

Explainer: কাউন্টারে ক্যামেরা: পাড়ার ওষুধের দোকানেও কেন সিসিটিভি বসাতে চায় কেন্দ্র, এত আপত্তি কেন কেমিস্টদের?

Medicine Shop In Indian Small Town (@Pexels)

ডাক্তার না লিখলে যে ওযুধ খাওয়ারই কথা নয়, সেই সব ওষুধই দেদার বিকোচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। মুড়িমুড়কির মতো। আর এই প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি আটকাতেই সব দোকানে ক্যামেরা বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্র। যার জেরে হইচই পড়ে গিয়েছে বাজারে। বাড়তি খরচ আর অপ্রয়োজনীয় নজরদারির আশঙ্কায় সরব ওষুধ বিক্রেতাদের সংগঠন।

যদিও এসব ওজর-আপত্তি আপাতত গায়ে মাখতে নারাজ মোদী সরকার। ফলে ভবিষ্যতে আপনার পাড়ার ওষুধের দোকানের কাউন্টারে সরকারি ক্যামেরা বসানো দেখলে অবাক হবেন না। কেন্দ্রের প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ বিক্রির লেনদেন সিসিটিভির (CCTV) নজরে থাকবে এবং ফুটেজ রাখতে হবে অন্তত তিন মাস।

যদিও কেমিস্টদের (chemist) দেশজোড়া সংগঠন কিন্তু এই প্রস্তাবে রাজি নয়। তাদের প্রশ্ন, সরাসরি মৌচাকে ঢিল না মেরে কেন নজরদারির বহর বাড়ানো হবে শুধু ছোট ছোট ওষুধের দোকানেই?

প্রস্তাবটা ঠিক কী?

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক (Union Health Ministry) ড্রাগস রুলস, ১৯৪৫ (Drugs Rules, 1945) সংশোধনের খসড়া বিজ্ঞপ্তি (draft notification) এনেছে। খসড়ায় ৬৫ নম্বর ধারায় নতুন একটি উপধারা যোগ হবে। যার জেরে লাইসেন্সধারী কেমিস্টের দোকানে সরকারি সিসিটিভি ছাড়া প্রেসক্রিপশনের ওষুধের খুচরো বিক্রি চলবে না। যদিও এই নিয়ম শুধু খুচরো বিক্রেতাদের জন্য প্রযোজ্য। পাইকারি লেনদেন থাকবে এই নিয়মের বাইরে।

এই নতুন প্রস্তাবনার লক্ষ্য হল, শিডিউল এইচ (Schedule H), শিডিউল এইচ১ (Schedule H1) ও শিডিউল এক্স (Schedule X)  গোত্রের ওষুধ যাতে বিনা প্রেসক্রিপশনে বিক্রি না হয়।

প্রস্তাবটি প্রথমে আলোচিত হয় ড্রাগস কনসালটেটিভ কমিটিতে (DCC)। পরে ড্রাগস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি বোর্ড (DTAB) সেটি অনুমোদনের সুপারিশ করে। এখন খসড়া নিয়ে যে কোনও ধরনের আপত্তি ও পরামর্শ জানানোর সময় ৩০ দিন।

কবে থেকে এই নিয়ম কার্যকর হবে, তা ঠিক হবে চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তিতে।

কোন কোন ওষুধ?

শিডিউল এইচ গোত্রের ওষুধের তালিকা বেশ বড়। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক (antibiotic), উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ ও স্টেরয়েড এর মধ্যে পড়ে। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া এগুলি খুচরো বিক্রি করা যায় না।

শিডিউল এইচ১ তালিকায় আছে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক, কিছু মনোরোগের ওষুধ এবং যক্ষ্মার ওষুধ। এগুলির জন্য আলাদা রেজিস্টার রাখতে হয়। শিডিউল এক্সে নিয়ম আরও কড়া। বিক্রি, মজুত ও রেকর্ড সংরক্ষণে বাড়তি সুরক্ষা লাগে।

যদিও একটা সূক্ষ্ম বিষয় আছে। যে্টা নিয়ে প্রবল আপত্তি। সরকারি ঘোষণায় তিন শিডিউলের কথা থাকলেও খসড়ার প্রস্তাবিত ৬৫(২এ) উপধারায় বলা হয়েছে প্রেসক্রিপশনে দেওয়া যে কোনও ওষুধের খুচরো বিক্রির উপরই নজরদারির কথা। ফলে চূড়ান্ত নিয়মের পরিধি কতটা বড় হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কেন এই পথ

মন্ত্রকের বক্তব্য, সিসিটিভি হল বাড়তি রক্ষাকবচ। খুলে বলা না হলেও, ব্যাপারটা হল একটা ভয়ের বাতাবরণ থাকলে ওষুধ বিক্রিতে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়বে। এমনটাই মনে করা হচ্ছে। কোনও ওষুধ নিয়মমাফিক বিক্রি হয়েছে কি না, প্রশ্ন উঠলে নিয়ন্ত্রকেরা লেনদেনটি যাচাই করতে পারবেন। কেন্দের যুক্তি হিসেবে বলছে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খেলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ ও অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ে। সেটা বন্ধ করা দরকার।

অবশ্য এই ভাবনাটা নতুন নয়। ২০২১ সালেই ড্রাগস কনসালটেটিভ কমিটির আলোচনায় এমন প্রস্তাব উঠেছিল। চণ্ডীগড়ে যেমন ডেপুটি কমিশনার সব কেমিস্ট দোকানে ৩০ দিনের ব্যাকআপ-সহ সিসিটিভি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। জম্মু ও কাশ্মীরের উধমপুরেও সব ওষুধের দোকানে ১০০ শতাংশ ক্যামেরা বসানোর কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই খসড়া আবার একক ভাবে আসেনি। জুন মাসেই কেন্দ্র কাশির সিরাপ বিক্রির ছাড় তুলে নিয়েছে। যার প্রেক্ষিত ছিল, দূষিত কাফ সিরাপে অন্তত ২২ শিশুর মৃত্যু।

কেমিস্টদের আপত্তি কোথায়?

অল ইন্ডিয়া অর্গানাইজেশন অব কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস (AIOCD) সরকারকে প্রস্তাব নিয়ে ফের ভাবতে বলেছে। সংগঠনের সভাপতি জে এস শিন্ডে ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব সিংঘলের বক্তব্য, কেমিস্টরা প্রতিদিন প্রায় ১৪০ কোটি মানুষকে ওষুধ দেন। সেই তুলনায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ খুবই কম। এখন যদি নতুন করে ফের সিসিটিভি, রেকর্ড সংরক্ষণের পরিকাঠামো ইত্যাদি সংযুক্ত হয়, তবে কেমিস্টদের উপর খরচের বোঝা অনেকটাই বেড়ে যাবে।

সংগঠেন প্রথম আপত্তি খরচ। এবং সেটা যথার্থই। কারণ,  ছয় থেকে আটটি ক্যামেরা, ডিভিআর/এনভিআর (DVR/NVR), স্টোরেজ, তার, ইন্টারনেট আর রক্ষণাবেক্ষণ মিলিয়ে ছোট ও মাঝারি দোকানের খরচ পড়তে পারে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা বা তারও বেশি। সিংঘলের প্রশ্ন, যেসব দোকানে বিক্রি মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার ঘরে, তারা এই বোঝা টানবে কী করে?

দ্বিতীয় আপত্তি পরিকাঠামো। গ্রামে ঘন ঘন বিদ্যুৎ যায়, ইন্টারনেট দুর্বল, যন্ত্র সারানোর প্রযুক্তিবিদও মেলে না। ফলে টানা রেকর্ডিং চালু রাখা কার্যত অসম্ভব।

সংগঠনের দাবি, নজরদারি একান্তই জরুরি হলে ক্যামেরা বসানো ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সরকারকেই বহন করতে হবে। নয়তো বাস্তবসম্মত ও আনুপাতিক কোনও ব্যবস্থা আনতে হবে।

ইন্সপেক্টর রাজের ভয়

সিংঘল জানিয়েছেন, ড্রাগস অ্যাক্টের নিয়মে ড্রাগ ইন্সপেক্টর এমনিতেই দোকানে আসেন। শিডিউল এইচ১ ওষুধের জন্য রেজিস্টারও রাখতে হয়। তাঁর আশঙ্কা, সিসিটিভি এলে অতিরিক্ত পরিদর্শনের রাস্তা খুলে যেতে পারে। ঘুরপথে আবার ইন্সপেক্টর রাজ (inspector raj) ফিরে আসুক, তা তাঁরা  চান না বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।

সংগঠনের আরও অভিযোগ, গত আট বছর ধরে অনলাইনে ওষুধ বিক্রি বন্ধের দাবি জানিয়েও কিছু হয়নি। অথচ নজরদারির কথা উঠছে শুধু কেমিস্টদের নিয়েই। সংগঠনের বক্তব্য, কেমিস্টরা চিকিৎসা করেন না এবং নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ায় (self-medication) উৎসাহও দেন না।

জবাব এখনও মেলেনি

ফুটেজ কারা দেখতে পারবেন, কীভাবে ডেটা সংরক্ষণ হবে এবং ক্যামেরার কারিগরি মান কেমন হবে, সবই নির্ভর করছে চূড়ান্ত নিয়মের ওপর। গ্রাহকের গোপনীয়তার প্রশ্নও তাই উঠছে।

সাধারণ ক্রেতার ওপর হয়তো এই নিয়মের তাৎক্ষণিক প্রভাব কম। কারণ, প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ওষুধ কেনার নিয়মে কোনও বদল আসছে না।

বাংলার বাজার

বাংলার ক্ষেত্রে প্রসঙ্গটা আলাদা মাত্রা পায়। ২ সেপ্টেম্বর বালুরঘাটে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাজেয়াপ্ত ২ লক্ষেরও বেশি ফেনসিডিল (Phensedyl) সিরাপের বোতলের ওপর দিয়ে রোড রোলার চালান। উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার।

কোডিন-ভিত্তিক কাফ সিরাপ (codeine-based cough syrup) ঠিকমতো ব্যবহার করলে বৈধ ওষুধ। কিন্তু এর অপব্যবহার ও পাচারও হয়, বাংলাদেশ সীমান্ত ধরে। এর আগে কলকাতা থেকে নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (NCB) প্রায় ১৫ হাজার বোতল কোডিন-ভিত্তিক সিরাপ বাংলাদেশে পাচারের চেষ্টায় এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছিল।

তবে প্রস্তাবিত নতুন ড্রাগ নীতির খসড়ার একটি ফাঁক নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। পাইকারি লেনদেন সিসিটিভির আওতার বাইরে। অথচ সীমান্তের জেলায় বড় চালান ধরা পড়েছে গুদাম থেকে। ২০২০ সালে নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জে এক গুদাম থেকে উদ্ধার হয়েছিল ৫১০০ বোতল নিষিদ্ধ সিরাপ। খুচরো কাউন্টারের ক্যামেরা পাচারের গোটা শৃঙ্খল ধরতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকছেই।

আর্থিক সামর্থ্যের প্রশ্নও আছে। কলকাতার বড় ওষুধ বাজার আর জেলা শহরের ছোট দোকানের খরচ সামলানোর ক্ষমতা এক নয়।

এরপর কী

আপত্তি ও পরামর্শ জানানোর সময় ৩০ দিন। মতামত পাঠাতে হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রকের আন্ডার সেক্রেটারিকে (ড্রাগস)। কেমিস্টদের সংগঠন ইতিমধ্যে সচিবকে চিঠি তৈরি করেছে। সিংঘলের দাবি, সরকারের কোনও সাড়া এখনও মেলেনি। অর্থাৎ, চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তিতেই ঠিক হবে নিয়মের পরিধি, খরচের দায় আর ডেডলাইন। ততদিন আপাতত প্রস্তাবটা প্রস্তাবই।