• facebook
  • twitter
Saturday, 21 March, 2026

ভুল পরিণতি

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মারাত্মক সংকেত। বিশ্বের এক বৃহৎ অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই প্রণালীর উপর নির্ভরশীল।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সাম্প্রতিক ইরান-সংঘাত ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু সামরিক উত্তেজনার প্রশ্ন নয়, এটি এক গভীর রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। বিষয়টি আর শুধু একটি অঞ্চলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। তার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ভেতরেও।

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প— এই দুই নেতার সিদ্ধান্তই বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে। দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ঘিরে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সন্দেহ ও শত্রুতার। কিন্তু কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে সরাসরি সামরিক পথ বেছে নেওয়া যে কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা আজ স্পষ্ট।
এই সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর বহুমাত্রিক বিস্তার। একদিকে ইজরায়েলের লক্ষ্যভিত্তিক আঘাত, অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা— এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ পরিস্থিতিকে ক্রমেই অনিয়ন্ত্রিত করে তুলছে। এর ফলে শুধু যুদ্ধরত দেশগুলিই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশও জড়িয়ে পড়েছে এক অপ্রত্যাশিত সংকটে।

Advertisement

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মারাত্মক সংকেত। বিশ্বের এক বৃহৎ অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। এটি বন্ধ হওয়া মানে তেলের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া। ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে, কারণ তাদের অর্থনীতি এখনও জ্বালানি আমদানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

Advertisement

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, এই যুদ্ধ কি অনিবার্য ছিল? নাকি এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভুল পরিণতি? ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় ‘অন্তহীন যুদ্ধ’-এর বিরোধিতা করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছেন। এই দ্বিচারিতা শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়নি, বরং আন্তর্জাতিক স্তরেও আমেরিকার নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করছে।

ইজরায়েলের ভূমিকাও সমানভাবে প্রশ্নের মুখে। নিরাপত্তার অজুহাতে তারা যে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেছে, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করে হত্যা করার মতো পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে। এর ফলে কূটনৈতিক আলোচনার পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া। তেল, গ্যাস এবং সার— এই তিনটি ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উন্নত দেশগুলি হয়তো কিছুটা সামাল দিতে পারবে, কিন্তু দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য এটি বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের বদলে কূটনীতির পথই একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িক বিজয় অর্জন করা সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ইরান, আমেরিকা এবং ইজরায়েল— এই তিন পক্ষের মধ্যেই আস্থার অভাব রয়েছে এবং সেই আস্থার পুনর্গঠনই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তির মাধ্যমে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যাদের প্রতি সব পক্ষেরই কিছুটা হলেও আস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানেরও উচিত আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে চাপে না রেখে বাস্তববাদী অবস্থান নেওয়া। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির দিকে এগিয়ে যাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রথম ধাপ হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে যেখানে অর্থনীতি, জ্বালানি এবং নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সেখানে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ খুব দ্রুতই আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাই এখনই সময়, শক্তির প্রদর্শন নয়, সংযম এবং সংলাপের পথ বেছে নেওয়ার। যুদ্ধের আগুন যত দ্রুত নেভানো যাবে, ততই মঙ্গল বিশ্বমানবতার জন্য।

Advertisement