হীরক কর
অরবিন্দ কেজরিওয়াল সরাসরি নাম করে বলছেন— একটি দলকে শেষ করে দেওয়ার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিলে স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করেছেন। একটি দলের পাঁচজন শীর্ষ নেতা জেলে। একজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে ছ’মাস বন্দি রাখা হল— যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। উপমুখ্যমন্ত্রী প্রায় দু’বছর জেলে।
Advertisement
আর শেষে যদি আদালত বলে— ভিত্তিই নেই? তাহলে এতদিন যা চলল, সেটা কী ? এটা কি কেবল আইনি প্রক্রিয়া, না কি পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল? গত দশ বছরে এমন এক সিস্টেম কি গড়ে ওঠেনি, যেখানে কেন্দ্রের ইঙ্গিতেই প্রতিষ্ঠানগুলো নতজানু হয়ে পড়েছে? যেখানে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকেও যে কোনও সময় জেলে পাঠানো সম্ভব?
Advertisement
যদি রাজনৈতিক শক্তিই শেষ কথা হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান, প্রতিষ্ঠান, বিচার— এসব কি শুধু আনুষ্ঠানিক শব্দ হয়ে থাকবে ?
একজন বিচারক লোয়ার কোর্ট থেকে হাই কোর্টের বিচারপতি হয়ে উঠবেন, হাই কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে— এই পুরো সিঁড়িটা কীভাবে তৈরি হয়? কাগজে-কলমে কলেজিয়াম ব্যবস্থা থাকলেও,শেষ পর্যন্ত সরকারের সম্মতি লাগে। আর সরকার কাকে, কখন, কোন স্তর থেকে তুলে আনবে— সেটা কি পুরোপুরি নিরপেক্ষ? যিনি নিয়োগ পান, তিনি কি সহজে সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে পারবেন?
দিল্লির আবগারি নীতি মামলা নিয়ে তো বিচারব্যবস্থার ভূমিকাই এখন আতস কাচের তলায় আনা দরকার। কোন বিচারপতি কি রায় দিয়েছেন, কি পর্যবেক্ষণ করেছেন— সবটাই পর্যালোচনা জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত এসে যদি আদালতই বলে দেয়, ‘মামলাই নেই’, তাহলে এতদিনের নির্দেশ, জামিন নাকচ, পর্যবেক্ষণ— এসবের ভিত্তি কী ছিল ?
তাহলে প্রশ্নটা বড় হয়ে দাঁড়ায়— ইডি, সিবিআই, সিএজি— এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে নিয়োগ যদি শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রভাবেই নির্ধারিত হয়, আর সেই সরকার যদি রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে চায়, তাহলে তদন্তের নিরপেক্ষতা কোথায়? যে তদন্তকারী অফিসারের বিরুদ্ধে আজ বিভাগীয় তদন্তের কথা বলছে আদালত, তার নিয়োগ-প্রক্রিয়া কীভাবে হয়েছিল ?
দেশজুড়ে কত রাজনীতিকের নাম ইডি-সিবিআই ফাইলে ঘুরছে। দোষী সাব্যস্ত হোক বা না হোক, মামলা চললেই জন-মনে একটা পারসেপশন তৈরি হয়। আর সেই পারসেপশনই কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে? যদি তাই হয়, তাহলে আইনের প্রক্রিয়া আর রাজনৈতিক কৌশলের সীমারেখা কোথায় টানা হবে ?
দিল্লি আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটা সরাসরি নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে। যদি নির্বাচনের আগে যে চার্জশিট দেখিয়ে প্রচার আটকে দেওয়া হল, যে মামলার ভিত্তিতে জামিন নাকচ হল, অথচ শেষে আদালতই বলে দিল সবাই নির্দোষ, তাহলে কি আদালতেরই বলা উচিত নয় যে দিল্লিতে আবার ভোট হোক ?
১৭৭ দিন জেলে ছিলেন কেজরিওয়াল। মণীশ সিসোদিয়া ৫১০ দিন— প্রায় দেড়-দু’বছর। আপ সাংসদ সঞ্জয় সিং ১৮১ দিন। তেলেঙ্গানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের কন্যা কে কবিতা ১৫০ দিন। এরা সবাই নির্বাচিত প্রতিনিধি। ঠিক যেমন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও নির্বাচিত। কিন্তু যদি ভোটের ঠিক আগে কাউকে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া যায়, আর পরে জানা যায় মামলা টেকেনি— তাহলে সেটা কি কেবল আইনি প্রক্রিয়া, না কি রাজনৈতিক কৌশল ?
রাহুল গান্ধীকে পাঁচ দিনে ৫০ ঘণ্টা জেরা করা হয়েছিল। কিন্তু নিট ফল কি ? শূন্য! সোনিয়া গান্ধীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা— নিট ফল কি? শূন্য! প্রিয়াঙ্কার স্বামী রবার্ট ভদ্রার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অভিযোগ— কিন্তু পরিণতি? এখনও শূন্য! অথচ হেমন্ত সোরেন খনন মামলায় জেলে গেলেন।
প্রশ্নটা ব্যক্তি নয়, প্যাটার্ন। যদি তদন্ত, জেরা, গ্রেপ্তার— সবই রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, আর পরে মামলা ভেঙে পড়ে, তাহলে গণতন্ত্রের মাপকাঠি কোথায় দাঁড়ায় ? ভোট কি তখনও মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত, নাকি তৈরি করা এক পরিস্থিতির ফল?
এখন নাকি নিশানায় তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দরজায় কড়া নাড়ছে বঙ্গের ভোট। বিজেপির অগ্নিপরীক্ষা, একই পরীক্ষা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। অভিষেক দলের সেনাপতি। ওদিকে শরদ পওয়ারের বিরুদ্ধে কোঅপারেটিভ মামলা— সেটাও রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলোচনায়। তাই আবার বলছি প্রশ্নটা আলাদা আলাদা নাম নয়, একটা প্যাটার্ন।
যদি নির্বাচনে জিততে তদন্ত সংস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি আদালত— সবই এক অদৃশ্য শক্তির ছায়ায় কাজ করে, তাহলে গণতন্ত্রের কাঠামোটা আসলে কী দাঁড়ায়? আদালত নিজেই বলছে—কেজরিওয়ালের নাম শক্ত প্রমাণ ছাড়াই জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। একজন সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে হলে পাকা প্রমাণ লাগে— এটা আইনের মৌলিক নীতি। তবু ছ’মাস জেল!
তখন বলা হয়েছিল— লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা উপ-রাজ্যপালের অনুমতি না নিয়ে, আবগারি নীতিতে পরিবর্তন এনে, নিলামে দুর্নীতি করে, ঘরে ঘরে মদের দোকান খোলার ব্যবস্থা করেছিল কেজরিওয়াল সরকার। এক বিশাল কেলেঙ্কারির দৃশ্যপট তৈরি করে, আম আদমি পার্টি দুর্নীতিগ্রস্ত এমন পারসেপশন তৈরি করা হয়েছিল। অথচ আজ আদালত বলছে— মামলাই দাঁড়ায় না, ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নেই !
আদালতের নির্দেশে মুক্ত হয়ে মিডিয়ার সামনে বলতে গিয়ে প্রকাশ্যে কেঁদে ফেলেন কেজরিওয়াল। রাষ্ট্রীয় শাসকের উদ্দেশ্যে সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, আপনারা কুর্সি চান, ভাল কাজ করে তা অর্জন করুন। এ ভাবে দেশের সংবিধান নিয়ে ছেলেখেলা করবেন না।
কেজরি বলেছেন— আমার সারা জীবনের একটাই পুঁজি, সততা। আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আদালত আজ বলছে অভিযোগ টেকেনি। অথচ এই মানুষই একসময় ৭০-এ ৬৭, তারপর ৭০-এ ৬২ আসন জিতেছিলেন। হঠাৎ করেই পরাজয়। কারণ ভোটের আগে যে কাঠগড়া তৈরি হল, সেখানে ভোটারদের সামনে একটাই পারসেপশন তৈরি করা হয়েছিল— আপ সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত।
এটা শুধু একজন বিচারকের রায় নয়। এটা একটা বড় প্রশ্ন— এ দেশে কি এমন এক রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠেছে, যা সংবিধানের চেক অ্যান্ড ব্যালান্সকেই দুর্বল করে দিতে পারে ? যেখানে ভয়টাই প্রধান হাতিয়ার— আপনি আমাদের মতো চললে থাকবেন, না হলে সরিয়ে দেওয়া হবে ?
এই ভয় কেবল রাজনীতিকের জন্য নয়। সম্পাদক, বিচারপতি, আমলা, নির্বাচন কমিশনার, সিএজি, সিবিআই ডিরেক্টর— যে কেউ। যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা সন্দেহের মুখে পড়ে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিতটাই কেঁপে ওঠে।
এই জমানায় যেন সবই সম্ভব হয়ে গেল! যা না-ভেবেছিলেন মনমোহন সিং, না অটল বিহারী বাজপেয়ী, না পি ভি নরসিমহা রাও— এমনকি ইন্দিরা গান্ধী বা রাজীব গান্ধীও যেটা কল্পনা করেননি— সেটাই যেন বাস্তবের কৌশল হয়ে উঠল! ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুরো সিস্টেমটাই বদলে ফেলা যায়—এমন ধারণা ক্রমশ দেশে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, এটাই সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্যি ! প্রশ্নটা দুর্নীতির অঙ্ক নয়, প্রশ্নটা শাসনব্যবস্থার চরিত্র। যদি সংবিধান-নির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই কাঠামোর অংশ হয়ে যায়, যেটা শীর্ষে বসা ক্ষমতা চায়— তাহলে গণতন্ত্রের ভারসাম্য কোথায়?
শেষ পর্যন্ত যদি রাজনীতিই সব ঠিক করে দেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কী ?
ইলেক্টোরাল বন্ড নিয়ে হাজার কোটির লেনদেনকে সুপ্রিম কোর্ট বেআইনি আখ্যা দিল, তবু টাকা তো আর ফেরত গেল না ! রায় এল, নৈতিক প্রশ্ন উঠল— কিন্তু রাজনৈতিক ফলাফল প্রায় একই রইল।
তাই মূল প্রশ্নটা আবারও তুলছি। যদি আদালত বলেই দেয় যে অভিযোগের ভিত নড়বড়ে ছিল, যদি নির্বাচনের আগে তৈরি হওয়া আখ্যানটাই ভেঙে পড়ে— তা হলে কি নতুন করে দিল্লিতে জনমত নেওয়ার সময় আসেনি? দিল্লিতে আবার নির্বাচন হোক। খোলা ময়দানে হোক। মানুষ নিজের প্রতিনিধি আবার বেছে নিক।
সব সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে হয় না। কখনও কখনও আদালতকেও নথির বাইরে গিয়ে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়— জনতার রায়ই শেষ কথা কি না। যদি সত্যিই গণতন্ত্রে আস্থা থাকে, তাহলে পরীক্ষা হোক আবার। বাকিটা মানুষই ঠিক করবে।
Advertisement



