• facebook
  • twitter
Thursday, 12 March, 2026

উত্তর-পূর্বের মানুষের প্রতি বৈষম্য কবে থামবে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা। দিল্লির মতো মহানগরে হাজার হাজার উত্তর–পূর্ববাসী পড়াশোনা, চাকরি বা ব্যবসার কারণে বসবাস করেন।

প্রতীকী চিত্র

দেবপ্রিয় বাগচী

দিল্লির একটি পার্কে সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরিয়ে মারধরের শিকার হলেন মণিপুরের এক তরুণী। ঘটনাটি নিছক একটি অপরাধের ঘটনা নয়; বরং ভারতের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে আবার সামনে এনে দিল— উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ ও বৈষম্য। রাজধানী দিল্লিতে এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবারই প্রশ্ন জাগে, কেন এখনও দেশের এক অংশের মানুষ অন্য অংশের মানুষের কাছে ‘অন্য’ হয়ে থাকে?
ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ দিল্লির সাকেত এলাকার একটি পার্কে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মণিপুরের ওই তরুণী তার এক বন্ধুর সঙ্গে হাঁটছিলেন। বন্ধু ছিলেন আসামের বাসিন্দা। সেই সময় কয়েকজন যুবক তাদের উদ্দেশে আপত্তিকর মন্তব্য করে। তরুণীরা প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং অভিযোগ অনুযায়ী তাদের ওপর শারীরিক হামলা চালানো হয়। আহত তরুণীকে চিকিৎসার জন্য সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশ চার অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

Advertisement

এই ঘটনার পর উত্তর-পূর্ব ভারতের দুই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা— মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা এবং মণিপুরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং— প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট— এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বারবার ঘটছে। সাংমা সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, মূল ভূখণ্ডে উত্তর-পূর্বের মানুষের ওপর হামলা ক্রমশ বাড়ছে এবং এটি কোনোভাবেই ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। অন্যদিকে বীরেন সিং বলেছেন, দেশের যে কোনও প্রান্তে উত্তর-পূর্বের মানুষকে নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে থাকতে হবে— এটাই গণতান্ত্রিক ভারতের মৌলিক প্রত্যাশা।

Advertisement

প্রশ্ন উঠছে, কেন এই ধরনের বৈষম্য বারবার সামনে আসে? উত্তর–পূর্ব ভারতের মানুষদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, ভাষা ও সংস্কৃতি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা। কিন্তু এই ভিন্নতাই তো ভারতের শক্তি হওয়ার কথা। বাস্তবে দেখা যায়, বহু ক্ষেত্রে এই বৈচিত্র্যকে বিদ্রূপ, অপমান বা সন্দেহের চোখে দেখা হয়। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই তরুণী ও তাঁর বন্ধুকে ‘যৌনকর্মী’ বলে কটূক্তি করা হয়েছিল, যা শুধু অপমানজনকই নয়, এক ধরনের গভীর বর্ণবাদী মানসিকতারও প্রতিফলন।

এই ধরনের আচরণ প্রায়ই ‘মজা’ বা ‘তুচ্ছ ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো সামাজিক মানসিকতার গভীরে থাকা পূর্বাগ্রহের প্রকাশ। বহু উত্তর–পূর্ববাসী দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে দেশের বিভিন্ন শহরে তাদের ‘বিদেশি’ বলে মনে করা হয়, তাদের ভাষা বা চেহারা নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়, এমনকি কখনও কখনও সরাসরি বর্ণবাদী মন্তব্যও শুনতে হয়।

দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই বৃহত্তর সমস্যারই অংশ। গত মাসেই মালভিয়া নগরে অরুণাচল প্রদেশের তিন তরুণী তাদের প্রতিবেশীদের দ্বারা হুমকি ও অপমানের শিকার হন। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, একদল মানুষ তাদের উদ্দেশে বর্ণবাদী মন্তব্য করছে এবং অশালীন ভাষা ব্যবহার করছে। শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হলেও ওই তরুণীদের অন্যত্র বাসস্থান খুঁজতে বাধ্য হতে হয়।

এই ঘটনাগুলি দেখায়, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এখনও অনেক দূরের পথ। পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি পুলিশ এই ঘটনায় চার অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু আইনি ব্যবস্থা কি যথেষ্ট?

সমস্যার মূল রয়েছে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে। উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্য— আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ ও সিকিম— ভারতের সাংস্কৃতিক মানচিত্রের একটি সমৃদ্ধ অংশ। কিন্তু দেশের মূলধারার শিক্ষা, গণমাধ্যম ও সামাজিক আলোচনায় এই অঞ্চল অনেক সময় প্রান্তিক হয়ে থাকে। ফলে অনেক মানুষ উত্তর-পূর্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা পায় না। অজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় কুসংস্কার ও পূর্বাগ্রহ।

এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে ভারতের বৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও উত্তর–পূর্ব ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের ইতিবাচক উপস্থিতি বাড়ানো প্রয়োজন। মানুষ একে অপরকে যত বেশি জানবে, ততই কমবে দূরত্ব।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা। দিল্লির মতো মহানগরে হাজার হাজার উত্তর–পূর্ববাসী পড়াশোনা, চাকরি বা ব্যবসার কারণে বসবাস করেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ারও দায়িত্ব। অতীতে এই ধরনের ঘটনাকে মোকাবিলার জন্য বিশেষ হেল্পলাইন বা পুলিশ সেল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই উদ্যোগগুলো আরও কার্যকরভাবে চালু রাখা দরকার।

তবে শেষ পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান আইন বা প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষের মানসিক পরিবর্তন জরুরি। ভারতের সংবিধান নাগরিকদের সমান মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সামাজিক সচেতনতা ও পারস্পরিক সম্মান অপরিহার্য।

দিল্লির এই ঘটনা তাই শুধু একটি অপরাধের খবর নয়, এটি ভারতের সামাজিক বাস্তবতার একটি অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। এই ছবিতে দেখা যায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রযুক্তিগত উন্নতির মধ্যেও আমাদের সমাজের একাংশ এখনও সংকীর্ণ মানসিকতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
ভারত যদি সত্যিই তার বৈচিত্র্যের ওপর গর্ব করতে চায়, তবে উত্তর-পূর্বের মানুষদের প্রতি এই বৈষম্য ও বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে স্পষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। কারণ দেশের এক প্রান্তের মানুষ যদি অন্য প্রান্তে নিজেকে নিরাপদ ও সম্মানিত মনে না করেন, তবে জাতীয় ঐক্যের ধারণা কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

এই কারণেই দিল্লির ঘটনাটি কেবল পুলিশের মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটি আমাদের সমাজকে মনে করিয়ে দিক— ভারতের মানচিত্রে কোনো অঞ্চল প্রান্তিক নয়, এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা সমান। বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মানই ভারতের গণতান্ত্রিক পরিচয়ের ভিত্তি, সেই ভিত্তি শক্তিশালী না হলে ভারতের ঐক্যের স্বপ্নও অপূর্ণই থেকে যাবে।

Advertisement