“হোয়াট ডু দে নো অফ ক্রিকেট হু ওনলি ক্রিকেট নো” 

Written by SNS July 4, 2024 6:47 pm
শোভনলাল চক্রবর্তী 
সি এল আর জেমস তাঁর ক্রিকেট নিয়ে লেখা বিখ্যাত বই “বিয়ন্ড এ বাউন্ডারি”তে লিখেছিলেন শিরোনামের লাইনটি। ক্রিকেট নিয়ে এমন দার্শনিক লাইনের দ্বিতীয় কোনও নজির নেই। ক্রিকেট সময়ের মতই,থামে না, শুধুই এগোয়। স্যার গ্যারি সোবার্স এর দ্বীপ বার্বাডোজ বহু ক্রিকেটীয় ইতিহাসের সাক্ষী। সেই ক্রিকেটীয় ঐতিহ্যে যোগ হল ভারতের বিশ্বকাপ জয়। নেহাত মামুলি জয় নয়,একবারে স্বপ্নাতীত। আচ্ছা বলুন তো কোথায় ছিলেন আপনি সূর্যকুমার ? ঠিক কোথা উড়ে এলেন আপনি? কোথায় ছিল আপনার লঞ্চিং প্যাড, যেখান থেকে আপনি ছোঁ মেরে তুলে নিলেন একটি রূপকথার ক্যাচ। আপনার ক্যাচটা দেখে নাদিয়া কোমানেচির  কথা মনে পড়ে গেল। জিমন্যাস্টিকসের প্রথম পারফেক্ট টেন। ক্রিকেটে তেমন নিয়ম থাকলে আপনারটা পারফেক্ট টেন হত।  ঠিক যেমনটা হয়েছিলেন ৮৩-র বিশ্বকাপ ফাইনালে কপিল দেবের বেলায়। প্রায় পঁচিশ গজ পিছিয়ে গিয়ে ভিভ রিচার্ডসের মহার্ঘ্য ক্যাচ।সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে,আর সূর্যরটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে। কি অদ্ভুত সমাপতন!
রূপকথা তো আর এমনি এমনি তৈরি হয় না! বুমরাহ্ যে বলটিতে বোল্ড করলেন মার্কো জেসনকে,সেটির কথা একবার ভাবুন, ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। কপিল দেবও কবুল করছেন বুমরাহ্ তাঁর থেকেও অনেক বড় বোলার। ৫ ওভার বাকি থাকতেও মনে হচ্ছিল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হয়তো নতুন চ্যাম্পিয়নের দেখা পাচ্ছে। সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেটের নতুন ‘চোকার্স’-এরও। যে দলের কখনো বিশ্বকাপের ফাইনালেই ওঠা হয়নি আগে, সেই দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ফাইনালে উঠেই এমন খেলছে যে ভারতের ফিরে আসা সম্ভব বলে কজন ভেবেছিলেন, তা একটা প্রশ্ন বটে।বিশ্বকাপ শুরুর আগে রোহিত নিজেও জানতেন এটাই তাঁর শেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। খেলবেন কি খেলবেন না সেটা নিয়ে দীর্ঘ দিন দোলাচল ছিল। তবে নবম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে নামা রোহিত কোনও খামতি রাখতে চাননি। গোটা প্রতিযোগিতায় নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছেন। ফাইনাল বাদে প্রায় প্রতি ম্যাচেই তাঁর ব্যাটিং নজর কেড়ে নিয়েছে। আগ্রাসী শুরুর কারণে বাকিদের উপরে চাপ কমে গিয়েছিল। অল্পের জন্য শীর্ষ রান সংগ্রাহক হতে পারেননি রোহিত।
ভারতের বোলিং বিভাগের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠেছিলেন আর্শদ্বীপ সিং। যুগ্ম ভাবে তিনি প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হয়েছেন। একমাত্র ইংল্যান্ড ম্যাচ ছাড়া প্রতি ম্যাচেই তিনি উইকেট নিয়েছেন। আইপিএলের পাটা পিচে ব্যর্থ হলেও স্পিন হোক বা পেস, সব রকম পিচেই আর্শদ্বীপ নিজের জাত চিনিয়েছেন। তাঁর ফর্ম ভারতের ট্রফি জয়ের অন্যতম কারণ।আমেরিকায় গ্রুপ পর্বে পেস সহায়ক এবং ধীর গতির পিচ ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডি‌জ়ে আবার স্পিনারেরা সাহায্য পাচ্ছিলেন বেশি। দুই দেশেই বাকি দলগুলির থেকে অনেক ভাল ভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল ভারত। আমেরিকায় গিয়ে তারা মহম্মদ সিরাজকে খেলিয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ে গিয়ে সিরাজকে বসিয়ে খেলানো শুরু হল কুলদীপ যাদবকে। এই পরিবর্তন বড় সাহায্য করেছে।ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ে গিয়ে স্পিন বোলিংয়ে বাড়তি গুরুত্ব দিতেই হত ভারতকে। সেটা তারা করেছে সফল ভাবেই। হার্দিক পাণ্ডিয়া এবং শিবম দুবের মতো পেসার-অলরাউন্ডার নিয়ে গেলেও বুদ্ধি করে তাঁদের দিয়ে বেশি বল করানো হয়নি। বরং আস্থা রাখা হয়েছে অক্ষর প্যাটেল, কুলদীপ যাদব এবং রবীন্দ্র জাডেজার উপরে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের মাটিতে পাঁচটি ম্যাচে স্পিনারেরা ১৭টি উইকেট পেয়েছেন। তার চেয়ে বড় কথা, রান দিয়েছেন অনেক কম।বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মা ওপেন করতে নামায়, স্বাভাবিক ভাবেই কোনও দল তাঁদের উপরে বাড়তি ভরসা করবে। তবে রোহিত শর্মাদের চিন্তামুক্ত করেছে মিডল অর্ডারের পারফরম্যান্স। প্রতিটি ম্যাচেই মিডল অর্ডারের কেউ না কেউ রান করে দিয়েছেন। পাকিস্তান ম্যাচে ঋষভ পন্থ, আমেরিকা, আফগানিস্তান এবং ইংল্যান্ড ম্যাচে সূর্যকুমার, বাংলাদেশ ম্যাচে হার্দিক পাণ্ডিয়া   দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেছেন। দুম করে উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসেননি। ফলে লম্বা ইনিংস গড়তে তা সাহায্য করেছে।আর তাই ফিরে আসার দুর্দান্ত এক গল্প লিখে শেষ পর্যন্ত ভারতই চ্যাম্পিয়ন।
সেই ২০০৭ সালে প্রথম আসরের পর আরেকবার। দক্ষিণ আফ্রিকা কিসে সান্ত্বনা খুঁজবে? ফাইনালে তো ওঠা হয়েছে এবার, পরেরবার নয় শিরোপা—না, এতেও মনে হয় না সান্ত্বনা পাওয়া যাবে। এভাবে ম্যাচটা হাতের মুঠো থেকে গলে যেতে দেওয়ার সান্ত্বনা আসলে কিছুতেই হয় না। এই বিশ্বকাপে একের পর এক ক্লোজ ম্যাচ জিতে, অষ্টমবারের চেষ্টায় সেমিফাইনাল-জুজু জয় করে ফাইনালের আগেই যা থেকে অনেকটা মুক্তি মিলেছে তাদের। বিশ্বকাপ জিতলে যা চিরতরে গা থেকে খসিয়ে দিত ওই দুঃসহ তকমাটা। যে অবস্থা থেকে ফাইনালটা হেরেছে, তাতে ফিসফাস করে ওই কথাটা আবারও উঠতেই পারে।দক্ষিণ আফ্রিকা জিতে গেলে অবশ্যই উঠত না। উঠত না আরেকটি কারণেও। বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন চোকার্স হিসেবে যে ভারত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেত। ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ের পর গত ১১ বছরে পাঁচটি আইসিসি টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলেছে ভারত। টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি সবই আছে এরই মধ্যে।  সেই পাঁচ ফাইনালেই একটা জিনিস অপরিবর্তিত থেকেছে। সব কটিতেই হেরেছে ভারত। টানা ষষ্ঠ ফাইনালে হারলে তাদের চোকার্স বলায় কোনো অন্যায় হতো না।আগের ৫টি ফাইনালে হারা অনেকেই আছেন ভারতের এই দলে। দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের ৫ ওভার বাকি থাকতে আবারও সেটিকেই অবধারিত পরিণতি বলে কি মনে হয়নি তাঁদের! ৩৬ বলে যখন ৫৪ রান লাগে, হাইনরিখ ক্লাসেন এই ফাইনালের ভাগ্য লিখে দিয়েছিলেন বলেই তো মনে হয়েছিল। অক্ষর প্যাটেলের ১৫ নম্বর ওভার থেকে ২৪ রান। দুটি ওয়াইড বলে ২ রান। বাকি ২২ রানই ক্লাসেনের ব্যাট থেকে। খুবই সহজ হয়ে যাওয়া সমীকরণ থেকে ম্যাচটা যে এমন রুদ্ধশ্বাস সমাপ্তির দিকে যাবে, এ বোধ হয় শুধু টি-টোয়েন্টিতেই সম্ভব। যেখানে একটা ওভারই ম্যাচের রং বদলে দিতে পারে।
৩০ বলে ৩০ রান লাগে, হাতে ৬ উইকেট। ক্লাসেনের সঙ্গে ব্যাটিং করছেন ‘কিলার’ডেভিড মিলার। এত টি-টোয়েন্টি খেলেছেন যে কোথাও না কোথাও দুজনই হয়তো এক ওভারে ৩০ রান নিয়ে থাকবেন। ২৭ বলে ৫২ রান করে ক্লাসেন আউট হয়ে যাওয়ার পরও তো ম্যাচে প্রবল ফেবারিট দক্ষিণ আফ্রিকা। এতটাই যে এক ভারতীয় টিভি রিপোর্টার জানিয়েছেন যে তিনি মন খারাপ করে লাইভের জন্য প্রেসবক্স থেকে নিচে নামার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন।
সেখান থেকে ম্যাচটা কিনা শেষ বলের আগেই শেষ।শেষ বলে দক্ষিণ আফ্রিকার ১০ রান লাগে। নো আর ওয়াইড না হলে তো ম্যাচ তখনই শেষ। হার্দিক পান্ডিয়া কি আর নো আর ওয়াইডের কোনো ঝুঁকি নেন। কোনোমতে বৈধ একটা বল করলেই তো হয়। তা করতেই মাঠে ভারতীয়দের বাঁধভাঙা আনন্দ। শুধুই আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের নয়, ১১ বছরে বারবার ফাইনাল থেকে শূন্য হাতে ফেরার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আনন্দও মিশে থাকল সেই উদ্‌যাপনে। মুহূর্তে বিগত তিনমাস ধরে প্রায় খলনায়ক হয়ে থেকে একলাফে নায়কের আসনে উঠে এলেন হার্দিক।দীর্ঘ দিন ঘুপচি জেলে বন্দি মুক্তির পর যেমনটা হয়, হার্দিককে দেখে সেটাই মনে হচ্ছিল।শিশুর মত ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছিলেন শুধু। ক্রিকেটে জাদুঘরে রাখার মত দৃশ্য তৈরী হল অনেকগুলো। অধিনায়ক রোহিতের মাটিতে শুয়ে পড়া।বিরাটের অধিনায়ককে আলিঙ্গন।
তবে মানতেই হবে বুদ্ধি করে হার্দিক অফের বাইরে রেখেছিলেন ক্লাসেনের জন্য বলটাকে। টেনে মারতে গিয়ে ক্লাসেন পন্থের হাতে তালুবন্দী  হলেন।বিরাট কোহলির প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দিল ভারত ম্যাচে ফিরছে। মনে আছে তো কীভাবে শুরু হয়েছিল এই ফাইনাল! প্রথম ৮ বলে ২৩ রান। পরের ৪ বলে ২ উইকেট। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আর কোনো ফাইনাল প্রথম মিনিট দশেকে দুই দলকেই এমন সমানভাবে আনন্দ দিয়েছে বলে মনে হয় না। মার্কো ইয়ানসেনের প্রথম বলে রোহিত শর্মা সিঙ্গেল নেওয়ার পর কোহলির পরপর দুই চার। শেষ বলে আরেকটি। ইয়ানসেনের প্রথম ওভার থেকে ১৫ রান।বিশ্বকাপে অবশেষে রান পেলেন। আগের ৭ ইনিংসে ৭৫ রানের অচেনা কোহলি এদিন এক ইনিংসেই ৭৬। কিন্তু টি-টোয়েন্টির নিষ্ঠুর পৃথিবীতে রান করেও শান্তি নেই। কোহলির এই ইনিংস ভারতের কাজে এল, নাকি দক্ষিণ আফ্রিকার—এই প্রশ্ন কিন্তু উঠে যাচ্ছিল। ১৭তম ওভারে ৪৮ বলে হাফ সেঞ্চুরি, যাতে চার মাত্র ৪টা, সর্বশেষটি সেই চতুর্থ ওভারে। ইনিংসটা নিয়ে অস্বস্তির কারণেই হয়তো ফিফটি করে ব্যাট তোলেননি।এরপরই একটু খোলস ছেড়ে বেরোলেন। পরের ৩ বলে ১২ রান, যাতে একটি ছয় ও একটি চার। হাফ সেঞ্চুরির পর ১১ নম্বরে আউট। আগের ১০ বলে ২৬ রান। হার্দিক পান্ডিয়া ও রবীন্দ্র জাদেজা বসে থাকায় তারপরও প্রশ্নটা উঠছিল। আরেকটু আগেই কি কোহলির গা ঝাড়া দিয়ে ওঠা উচিত ছিল?
ভারত না জিতলে নির্ঘাত এ নিয়ে তুলকালাম হয়ে যেত। উল্টো বিরাট কোহলি এখন নায়ক। ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে যিনি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের কথা জানিয়ে দিলেন। বিশ্বকাপ জয়, নিজে ম্যাচসেরা—এমন সুন্দর বিদায় ক্রিকেট খুব বেশি দেখেনি।একই কথা খাটে রোহিত শর্মার ক্ষেত্রেও। বার্বাডোজ এ রাতের বেলাতেও সূর্যোদয় ঘটালো ভারত।দ্রাবিড়ের মত মানুষও আবেগ বশে রাখতে পারলেন না। কাপ হাতে তিনিও শিশুর মত উচ্ছ্বসিত।শেষে কোহলিরা বিদায়ী কোচকে শূন্যে তুলে উৎসব করলেন। বার্বাডোজ হয়ে রইলো শাপমোচন আর গুরুদক্ষিণার মোহনা।এবার থেকে কি তবে স্বপ্ন পূরণের রং নীল?