• facebook
  • twitter
Monday, 16 March, 2026

ওয়াংচুকের মুক্তি

গণতন্ত্রের শক্তি দমন নয়, সংলাপ। মতভেদ থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান খুঁজে নেওয়াই সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ।

ফাইল চিত্র

লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের প্রায় ছয় মাসের জেলবন্দী অবস্থার পর মুক্তি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কেন্দ্র সরকার শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের (NSA) অধীনে তাঁর আটকাদেশ প্রত্যাহার করেছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যক্তির মুক্তিই নয়, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতভেদ, আন্দোলন ও সংলাপের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর লেহ্-তে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সোনম ওয়াংচুককে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল যে, তাঁর কর্মকাণ্ডের ফলে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে। এরপর তাঁকে লেহ্ থেকে সরিয়ে রাজস্থানের যোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, একজন শিক্ষাবিদ, উদ্ভাবক এবং পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম মুখকে কি সত্যিই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা উচিত ছিল?

Advertisement

সোনম ওয়াংচুক কোনও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত নন। বরং তিনি দীর্ঘদিন ধরে লাদাখের পরিবেশ রক্ষা, দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করে আসছেন। তাঁর ‘আইস স্টুপা’ প্রকল্প বিশ্বজুড়ে পরিচিত, যা হিমালয় অঞ্চলে জলসংকট মোকাবিলায় একটি অভিনব উদ্যোগ। লাদাখের প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা রক্ষার প্রশ্নে তিনি বহুবার সোচ্চার হয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর গ্রেপ্তার অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক বলে মনে হয়েছে।

Advertisement

লাদাখের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরছেন। তার মধ্যে রয়েছে লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া এবং ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা, যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। এই দাবিগুলিকে কেন্দ্র করেই লেহ্ অ্যাপেক্স বডি ও কারগিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সোনম ওয়াংচুক সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

কেন্দ্র সরকার এখন বলছে যে, শান্তিপূর্ণ সংলাপের পরিবেশ তৈরি করার জন্যই তাঁর আটকাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদি সত্যিই তা-ই হয়, তবে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য, এই সিদ্ধান্ত নিতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগল কেন? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতবিরোধ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতবিরোধকে দমন করার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
জাতীয় নিরাপত্তা আইন মূলত এমন পরিস্থিতির জন্য তৈরি, যেখানে দেশের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই ধরনের কঠোর আইন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হয়। সোনম ওয়াংচুকের ঘটনাও সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। কোনও ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ধরে বিচার ছাড়াই আটক রাখা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। লাদাখ একটি সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চল, যেখানে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মানুষের আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সেখানে যদি মানুষের দাবি ও উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। সুতরাং সরকারের উচিত হবে লাদাখের মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা। সোনম ওয়াংচুক নিজেও মুক্তির পর বলেছেন, তাঁর আন্দোলনের লক্ষ্য কোনও সংঘাত সৃষ্টি করা নয়, বরং লাদাখের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। তিনি সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান চান। এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, তাঁর আন্দোলন মূলত পরিবেশ ও মানুষের অধিকারের প্রশ্নে একটি নৈতিক অবস্থান।

গণতন্ত্রের শক্তি দমন নয়, সংলাপ। মতভেদ থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান খুঁজে নেওয়াই সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ। সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি সেই সত্যকেই আবার স্মরণ করিয়ে দিল। এখন প্রয়োজন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লাদাখের মানুষের উদ্বেগ ও দাবির প্রতি আন্তরিকভাবে মনোযোগ দেওয়া। তাহলেই এই মুক্তি সত্যিকার অর্থে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠতে পারে।

Advertisement