• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 12 June, 2026

বিকশিত ভারত ২০৪৭

'বিকশিত ভারত ২০৪৭' একটি দূরদর্শী লক্ষ্য, যা কেবল সরকারের একার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমগ্র দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা— কেন্দ্র, রাজ্য, প্রশাসন এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ

Image: ANI

ভারতের উন্নয়নের দীর্ঘপথে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়—এই পুরনো সত্যকেই আবারও নতুনভাবে সামনে আনলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নীতি আয়োগের গভর্নিং কাউন্সিলের ১১তম বৈঠকে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় অঙ্গীকার। স্বাধীনতার শতবর্ষে একটি উন্নত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্র-রাজ্য সহযোগিতা অপরিহার্য।

 

এই বৈঠকের তাৎপর্য শুধু প্রশাসনিক নয়, নীতিগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে উন্নয়নের চাবিকাঠি এককেন্দ্রিক হতে পারে না। প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব চাহিদা, সমস্যা ও সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কেন্দ্র ও রাজ্য যদি একসঙ্গে কাজ করে, তবে উন্নয়নের সুফল প্রকৃত অর্থেই মানুষের দরজায় পৌঁছবে। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান তাই সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত।

 

বিশ্ব আজ এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে— ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন, মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ইত্যাদি নানা চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের অর্থনীতি যে স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সংকেত। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তাই এই সহযোগিতার ধারাকে আরও শক্তিশালী করার উপর জোর দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে, এই আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও নীতিগত স্থিরতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই আলোচনায় নতুন করে উঠে এসেছে।

 

বৈঠকে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক মানব উন্নয়ন কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। উন্নয়ন শুধু পরিকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়— এটি মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে হবে। এই ভাবনার চারটি মূল স্তম্ভ— মানবসম্পদ গঠন ও ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোগভিত্তিক বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং সবার জন্য সমতা ও মর্যাদা— ভারতের উন্নয়নকে একটি মানবকেন্দ্রিক পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

 

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার যদি একযোগে এই ক্ষেত্রগুলিতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে, তবে দেশের জনসংখ্যাগত সুবিধাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়া যেতে পারে। এতে যেমন অর্থনৈতিক গতি বাড়বে, তেমনই যুবসমাজের আত্মবিশ্বাসও দৃঢ় হবে।

 

একইভাবে, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়ন একটি শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি গড়ে দেয়। সুস্থ নাগরিকই উৎপাদনশীল অর্থনীতির প্রধান শক্তি। কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে যদি স্বাস্থ্যপরিষেবা আরও সহজলভ্য ও মানসম্পন্ন করা যায়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি সুফল গোটা দেশ পাবে। বিশেষত গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।

 

এছাড়া, উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছয়, সেটিও খুব জরুরি। সমতা ও মর্যাদার প্রশ্নটি তাই শুধু নৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। নারী, দলিত, আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে সামগ্রিক অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই দিক থেকে কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ উদ্যোগ সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

 

প্রধানমন্ত্রী যে সমন্বিত শাসনব্যবস্থা ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের উপর জোর দিয়েছেন, সেটি উন্নয়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, নীতির ঘাটতি নয়, বাস্তবায়নের দুর্বলতাই উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা কাটাতে হলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা আরও জোরদার করতে হবে। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এই ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা নিতে পারে।

 

পাশাপাশি, পরিবেশ ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও এই ভারসাম্য রক্ষা করা আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব নীতির উপর জোর দিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য একসঙ্গে কাজ করলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

 

‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ একটি দূরদর্শী লক্ষ্য, যা কেবল সরকারের একার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমগ্র দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা— কেন্দ্র, রাজ্য, প্রশাসন এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। নীতি আয়োগের এই বৈঠক সেই যৌথ যাত্রাপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সমন্বয়, সহযোগিতা এবং মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন— এই তিনটি স্তম্ভের উপর ভর করেই ভারত তার আগামী পথচলা নির্ধারণ করতে পারে। ইতিবাচক মনোভাব, সুস্পষ্ট নীতি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন থাকলে ২০৪৭ সালের স্বপ্ন একদিন বাস্তবেও পরিণত হবে— এই বিশ্বাস আজ আরও দৃঢ় হয়েছে।