• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 9 August, 2026

ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউপিআই পরিষেবা এক বিপ্লব

ইউপিআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি মানুষের অভ্যাস ও আস্থার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। যদি মানুষ মনে করে যে ধীরে ধীরে এই পরিষেবাটি ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, তাহলে তারা সহজেই পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যেতে পারে। এতে শুধু ডিজিটাল লেনদেনই নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বচ্ছতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউপিআই পরিষেবা এক বিপ্লব

File Photo

ভারতে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউপিআই (UPI) এক বিপ্লবের নাম। ছোট দোকান থেকে বড় শপিং মল— সব জায়গায় আজ কিউআর কোড স্ক্যান করে মুহূর্তে টাকা দেওয়া-নেওয়া হচ্ছে। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর জন্য কোনও চার্জ না থাকা। কিন্তু এখন সেই ‘ফ্রি’ পরিষেবার উপর চার্জ বসানোর ভাবনা সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকার এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি, কিন্তু আইন সংশোধনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কিছু ইউপিআই লেনদেনে চার্জ বসানোর পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, বড় ব্যবসায়ী বা নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রেই এই চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। প্রথমে শুনতে এটি সীমিত বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে।

প্রথমত, বড় ব্যবসায়ীদের উপর চার্জ চাপানো হলে তারা সেই খরচ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের উপরেই চাপিয়ে দেবে— এটাই স্বাভাবিক। ফলে সরাসরি না হলেও, সাধারণ মানুষই এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে বাধ্য হবে। এতে ইউপিআই-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা যে সহজ ও সস্তা লেনদেন, তা ক্ষুণ্ণ হবে। মানুষ আবার নগদ লেনদেনের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা সরকারের ডিজিটাল অর্থনীতির লক্ষ্যকে দুর্বল করবে।
দ্বিতীয়ত, ইউপিআই জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে সরকারের নিজস্ব ভূমিকা ছিল। নোটবন্দির পর থেকে সরকার ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করেছে। মানুষকে বলা হয়েছে, এটি নিরাপদ, সহজ এবং খরচমুক্ত। সেই বিশ্বাসের উপর ভর করেই কোটি কোটি মানুষ ইউপিআই ব্যবহার শুরু করেছেন। এখন যদি হঠাৎ চার্জ বসানো হয়, তাহলে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে— তাহলে এতদিন যা বলা হয়েছিল, তা কি বদলে যাচ্ছে?

তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও আছে। ইউপিআই চালানো এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে ব্যাঙ্ক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলির খরচ হয়। এতদিন তারা এই পরিষেবা প্রায় বিনামূল্যে দিয়ে এসেছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরও জানিয়েছেন যে, এই ব্যবস্থার খরচ কাউকে না কাউকে দিতেই হবে। এই যুক্তি একেবারে অমূলক নয়। দীর্ঘমেয়াদে পরিষেবার মান বজায় রাখতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, আর তার জন্য অর্থ দরকার।

কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই অর্থের বোঝা কাদের উপর চাপানো হবে? ইতিমধ্যেই সরকার এই খরচের একটি অংশ ভর্তুকির মাধ্যমে বহন করছে। অর্থাৎ, করদাতাদের টাকা দিয়েই ইউপিআই ব্যবস্থাকে সমর্থন করা হচ্ছে। এই অবস্থায় আবার আলাদা করে চার্জ বসানো হলে তা অনেকের কাছে অন্যায্য মনে হতে পারে। মানুষ ভাবতেই পারে— একই পরিষেবার জন্য কি আমরা দুইবার মূল্য দিচ্ছি?

এখানে একটি বিকল্প পথও রয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক প্রতি বছর সরকারকে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ দেয়। সেই অর্থের একটি ছোট অংশ ব্যবহার করে ইউপিআই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। এতে সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি চাপ পড়বে না এবং ডিজিটাল লেনদেনের গতি বজায় থাকবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— বিশ্বাস। ইউপিআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি মানুষের অভ্যাস ও আস্থার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। যদি মানুষ মনে করে যে ধীরে ধীরে এই পরিষেবাটি ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, তাহলে তারা সহজেই পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যেতে পারে। এতে শুধু ডিজিটাল লেনদেনই নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বচ্ছতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই সরকারের উচিত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদি চার্জ বসাতেই হয়, তবে তা যেন সীমিত, স্বচ্ছ এবং ন্যায্য হয়। পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে হবে। অন্যথায়, যে ইউপিআই আজ ভারতের ডিজিটাল সাফল্যের প্রতীক, সেটিই মানুষের অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা, প্রযুক্তির সুবিধা তখনই মজবুত হয়, যখন তা সবার জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী থাকে। ইউপিআই-কে সেই পথেই রাখা জরুরি, নইলে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র স্বপ্নই প্রশ্নের মুখে পড়বে।