• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 9 August, 2026

জীবন–মরণের সীমানা

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, শিক্ষাদীক্ষা, শ্রেণীভেদ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এইসব স্বপ্নময় অনুভূতি, কমবয়সীদের মধ্যেই বেশি। বিপথগামী আবেগে আত্মহত্যা করতে গেছে যারা, তারাও অমন অনুভূতির আলোয় ঋদ্ধ হয়ে জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছে। বাঁচতে শিখছে কাজের মধ্যে থেকে। মৃত্যুর দরজা ছুঁয়ে আসা মানুষরা মৃত্যুকে আর ভয় করে না, মোদ্দা কথা এটাই।

জীবন–মরণের সীমানা

Photo: Magnific

এই শ্রাবণের বুকের ভিতর আগুন আছে? সেই আগুনের কালো রূপ যে আমার চোখের তারায় নাচে… একটিমাত্র গানে শুধু নয়, রবীন্দ্রনাথের অনেক বর্ষার গানেই আশ্চর্য আনন্দ আবেশ আর স্ফূর্তি অনুভব করি। বিজুলি উজল আলো, কীভাবে ঈশানকোণের ঝটিকার মত কালো হয়, সেসব তর্ক তোলা থাক পণ্ডিতদের জন্য। আমাদের জন্যে সুর আর কথার বিদ্যুৎ উদ্ভাসটুকু থাক! রাখিপূর্ণিমা তিথির সঙ্গে কীভাবে যেন জড়িয়ে থাকে বাইশে শ্রাবণ, তা নিয়ে চর্চাও চলে নানারকম।

রবীন্দ্রনাথের জীবৎকালের একেবারে শেষ কয়েকটি দিনের আচ্ছন্নতার বিবরণ, তাঁরই নানান নিকটজনের রচনা থেকে যেমন পাওয়া যায়, তাতে স্পষ্ট আভাস মেলে, কবি যেন এক ধূসর জগতের আলোতে ছায়াতে জড়িয়ে যাচ্ছেন কখনও-সখনও। দেখছেন অকালপ্রয়াত প্রিয়জনদের। পুত্র শমীর কথা বলছেন, এবং একবার নাকি বৌঠান কাদম্বরী দেবীকে দেখলেন মুখোমুখি। আচ্ছন্নতা কাটতেই, চোখদুটো বড় বড় করে কবি তক্ষুনি বলে উঠেছিলেন, আশ্চর্য, আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম?

দু-দিন দিয়ে ঘেরা ঘরে তাইতে যদি এতই ধরে, চিরদিনের আবাসখানা সেই কি শূন্যময়? সার্থক প্রশ্ন করেছেন কবি তাঁর গানে, চৌকাঠ পার হবার সংশয় থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন অজানার জয়ধ্বনি দিয়ে। ওদিকে শেক্সপিয়র তাঁর নাটকের একটি চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন ওপারের জগৎ সম্পর্কে— সেই অনাবিষ্কৃত দেশ, যেখান থেকে কোনও পথিক কখনও ফেরে না। অনাবিষ্কৃত, শব্দটির বহুমাত্রিক গতি। তাঁর অনেক নাটকেই দেখা যায়, পরলোক থেকে প্রেতাত্মারা এই জগতে এসে বিচরণ করছে, কথাবার্তা বলছে জ্যান্ত মানুষদের সঙ্গে! শেক্সপিয়র, সারাজীবনে স্বরচিত নাটকের একটিমাত্র ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বলে জানা যায়, হ্যামলেটের প্রেতাত্মা। প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে, মৃত্যুর দুয়ার সম্পর্কে সংশয় কি কৌতূহল তা হলে সবসময়েই একরকম?

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণের কিছুদিন আগের ঘটনাটি অনেকেই জানেন। ঘাটশিলায় নির্জন অরণ্যপ্রান্তে একটি পাথরে বসে প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ উপভোগ করতেন তিনি। হঠাৎ দেখলেন, চারজন শববাহক, খাটিয়াতে একটি মৃতদেহ বহন করে নিয়ে চলেছে। চেনাজানা কেউ হতে পারে কি? দেখি তো একটু মুখটা! সাদা কাপড় সরাতেই, তিনি দেখলেন, মৃতদেহটি তাঁর নিজের।

গল্প নয়। স্বপ্ন তো নয়ই। তবে কী? বুঝিয়ে বলার সুযোগ পাননি বিভূতিভূষণ। বোঝাবুঝির বদলে, অনুভূতিগ্রাহ্য আদলে অতীন্দ্রিয় জগতের লীলা সার্থকভাবে বিবৃত করেছে তাঁর ‘দেবযান’ উপন্যাসটি। বাংলা সাহিত্যের কথা বাদ দিলাম, এই ধরনের বই বিশ্বসাহিত্যে দুর্লভ। যাই হোক, শুধু সাহিত্যে নয়, জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী দরজার আলোবাতাসই আমাদের আলোচ্য। ওই দরজার চৌকাঠের বাস্তবতাটুকু দেখতে চাই আমরা, যদি অমন কোনও চৌকাঠের অস্তিত্ব আদৌ থাকে!

জার্মান দার্শনিক কান্ট বলেন, মস্তিষ্ক আমাদের চিন্তার জনক নয়। মানুষ তার প্রথম চোখ মেলে বাইরে তাকানোর দিন দেখতে চেয়েছিল সুদূর, বিপুল সুদূরকে। তার প্রাচীনতম বিজ্ঞান তাই জ্যোতির্বিদ্যা। আর আধুনিকতম? মনোবিজ্ঞান, স্বভাবতই। মনোলোকের গহনে যে অতল, তা যে মহাবিশ্ব মহাকাশের চেয়েও সুদূর। মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ নিয়ে আজও আমরা কত কম জানি!

মনোবিজ্ঞান চর্চা কয়েক দশক আগেও এমন সর্বব্যাপী ছিল না। এখন আমাদের গল্প উপন্যাস নাটক সিনেমা মাঝে-মাঝেই মনের আড়ালে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। একা হয়ে যাচ্ছে বলেই বুঝি মানুষের মুক্তি ঘটছে নানান ক্ষেত্রে। হোমিওপ্যাথ ডাক্তাররা কেউ কেউ, রোগীর স্বপ্ন-বিবরণ মন দিয়ে শোনেন দেখে হাসাহাসি করার দিন আর নেই! স্বপ্নের ধরন দেখে অসুখ বোঝা যায়, কী ধরনের অসুখ হতে পারে, আন্দাজ করা যায় তাও। ঠিক সেভাবেই, জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণের বিবরণ, তার বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ যে এই জীবনটাকে আরও নতুন নতুন রঙে বুঝতে সাহায্য করতে পারে, জ্ঞানীগুণীজন তা বোঝেন। এই ধরনের বিবরণমূলক বই, অনেকের অভিজ্ঞতা যেখানে বর্ণিত, পশ্চিমে বিকোচ্ছে ভালোই। জীবনের প্রান্তে কী রয়েছে তা জানতে, এবং নিজের কথা বলতে উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন অনেকেই।

১৯৭৫ সালে, জর্জিয়াতে, মনস্তত্ত্ববিদ রেমন্ড মুডির এই ধরনের যে বইটি প্রথম বেরিয়েছিল, তাতে অনেকের বর্ণনায় নানান বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ব্যাপার হল, নিজের দেহটির ওপর দিয়ে উড়ে চলার অনুভূতি। অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কেউ যখনই নিজের দেহটা ছুঁতে চাইছে, তখনই যেন জল কিংবা বাতাস ভেদ করে যাচ্ছে আঙুলটা— যেন তীব্র তড়িৎপ্রবাহ বইছে৷

কেউ কেউ বলেছেন, যেন স্বল্পালোকিত এক সুড়ঙ্গে রয়েছি, মনের মধ্যে আশ্চর্য এক মুক্তির অনুভূতি, যেমনটি জীবনে আগে কোনদিনও আসেনি! সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে যমের দক্ষিণ দুয়ার দেখে আসা এক নারী আরও বলেছেন, আমার চারিদিকে যেন বাতাসের মতন ভাসছে ভালোবাসা… সুড়ঙ্গের ওদিকে হলুদ আলো যেন অভ্যর্থনা জানাচ্ছে! ‘অভ্যর্থনা’ শব্দটি মনে রাখার মতন। দেখা যাচ্ছে যে, অনুভূতি সবারই প্রায় এক!

জীবনের সমস্ত ঘটনাগুলো বিদ্যুতের ঝলকের মতন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, প্রাচ্যে কি পাশ্চাত্যে অনেকেরই অভিজ্ঞতা। ব্যাখ্যা করেছেন কেউ কেউ, সিনেমা ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে দেখার মতন কিন্তু নয় ব্যাপারটা। আসলে যেন একটাই ছবি, অনন্ত তার গভীরতা; গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতির তীব্রতায় দেখতে পাচ্ছি মানুষের মনের ভেতরটাও। আঘাত দিয়েছি যাদের… অথবা সাহায্যও করেছি৷
অদ্ভুত এক আলোর কথা বলেন প্রায় সকলেই। যেন রঙিন আলোতে তৈরি গাছপালা, ফুল, পথ, প্রাসাদ অথবা সামান্য একটা জামা। অদ্ভুত একরকম আরামের অনুভূতিও জড়িয়ে থাকে তার সঙ্গে। রূপকথার মতন এইসব বৃত্তান্ত পড়তে বেশ লাগে!

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, শিক্ষাদীক্ষা, শ্রেণীভেদ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এইসব স্বপ্নময় অনুভূতি, কমবয়সীদের মধ্যেই বেশি। বিপথগামী আবেগে আত্মহত্যা করতে গেছে যারা, তারাও অমন অনুভূতির আলোয় ঋদ্ধ হয়ে জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছে। বাঁচতে শিখছে কাজের মধ্যে থেকে। মৃত্যুর দরজা ছুঁয়ে আসা মানুষরা মৃত্যুকে আর ভয় করে না, মোদ্দা কথা এটাই।

বিজ্ঞানীরা কেউ কেউ সঙ্গত কারণেই বলেছেন, সবই তো ডিফেন্স মেকানিজম। মৃত্যুঞ্জয়ী আবেগটা অবচেতন থেকে উঠে এসে বাঁচাবে কোনও আত্মহত্যাকামীকে, এ তো স্বাভাবিক! শরীরের কলকব্জা যেমন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেকে সুস্থ ও সচল রাখতে চেষ্টা করে, মনও ঠিক তাই! মন যে চেনা জগৎ থেকেই দৃশ্য বানিয়ে নেয়। তাই তো ওসব ফুলের বাগান, পথ ও প্রাসাদ— সবই নিখুঁত সুন্দর এই পৃথিবীর বাস্তবেরই মতন কেন হবে?

রূপসাগরে ডুব দিয়ে অরূপরতনের অভিলাষী রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কথাই উল্লেখ করা যায় অতঃপর। শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে? জীবনের শেষ কয়েকদিনের ওই আচ্ছন্নতার মধ্যেই যেন সার্থকতম কবিতাটি উচ্চারণ করেছিলেন তিনি। সত্তা মানে যে আসলে কী, তার উত্তর সত্যিই মেলে না!