• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 1 September, 2026

বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্ব

নিউ ইয়র্কের মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্ব

RSS Chief Mohan Bhagwat Photo-SNS

নিউ ইয়র্কের মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বক্তব্যটি সরল, কিন্তু তার তাৎপর্য গভীর। তিনি বলেছেন, ‘ভারতে কোনও মুসলমান থাকা উচিত নয়— এমনটা যদি কোনও হিন্দু মনে করেন, তা হলে তিনি হিন্দু থাকবেন না।’ তাঁর যুক্তি, হিন্দু হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে হলে বিশ্বাস করতে হবে যে, মানুষের কাছে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোর পথ একাধিক হতে পারে এবং প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা সমান।
এই বক্তব্যকে শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তৃতার অংশ হিসেবে দেখলে তার তাৎপর্য অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। বরং এটি হিন্দু দর্শনের একটি মৌলিক ধারণাকে সামনে আনে— বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্ব। নিউ ইয়র্কে বিভিন্ন ধর্মের নেতাদের উপস্থিতিতে ভাগবতের এই বক্তব্য ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্ব’ তাই বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়।
আমেরিকার মাটিতে ভারতীয় সভ্যতার কথা বলার ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক বক্তৃতার কথা স্বাভাবিকভাবেই মনে পড়ে। ১৮৯৩ সালে শিকাগোর ধর্মমহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দ যে ভারতীয় চিন্তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল সকল ধর্ম ও মানুষের প্রতি সম্মান। অবশ্যই ১৮৯৩ এবং ২০২৬-এর ঐতিহাসিক পরিস্থিতি এক নয়। দুই বক্তার বক্তব্যকে এক করে দেখারও কোনও কারণ নেই। কিন্তু ভারতীয় দর্শনের যে উদার ও সর্বজনীন ভাবনা তাঁদের বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে, তার মধ্যে একটি দার্শনিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
নিউ ইয়র্কে ভাগবত মূলত সেই ভারতীয় ধারণাটিই ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। তাঁর কথায়, বৈচিত্র্য প্রকৃতির নিয়ম এবং একত্ব তার অন্তর্নিহিত সত্য। অর্থাৎ মানুষ আলাদা হতে পারে— তার ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক, জীবনযাপন আলাদা হতে পারে— কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, মানুষে মানুষে মৌলিক কোনও বিভাজন আছে।
এই জায়গাতেই তাঁর ‘মুসলমানদের তাড়িয়ে দিতে চায় যে হিন্দু, সে হিন্দু থাকতে পারে না’ বক্তব্যটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এটি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পক্ষে বা বিপক্ষে বক্তব্য নয়; বরং হিন্দু পরিচয়ের সঙ্গে একটি নৈতিক ও দার্শনিক শর্তকে যুক্ত করছে। অর্থাৎ শুধু জন্মসূত্রে বা পরিচয়ের সূত্রে হিন্দু হওয়া যথেষ্ট নয়। হিন্দুত্বের দাবি যদি করা হয়, তবে তার সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, সহাবস্থান এবং সব পথের প্রতি সম্মানের ধারণাটিও গ্রহণ করতে হবে।
এই বক্তব্যের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হিন্দুত্ব নিয়ে রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক পরিসরে নানা ধরনের বিতর্ক হয়েছে। কেউ হিন্দুত্বকে সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে দেখেছেন, কেউ রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে। এই বিতর্কের মধ্যে ভাগবতের নিউ ইয়র্কের বক্তব্য একটি পৃথক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে— হিন্দু হওয়ার অর্থ কী?
ভাগবতের উত্তরটি তাঁর নিজের ভাষায় স্পষ্ট— হিন্দু হওয়া মানে অন্যকে বাদ দেওয়া নয়। বরং নিজের পরিচয়ের প্রতি আস্থাশীল থেকেও অন্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করা। তাঁর বক্তব্যে তাই আত্মপরিচয় এবং বহুত্ববাদকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখা হয়নি।
এখানে ‘একত্ব’ শব্দটির গুরুত্বও যথেষ্ট। একত্ব মানে সবাইকে একই রকম করে দেওয়া নয়। একই ধর্ম, একই ভাষা বা একই সংস্কৃতিতে সবাইকে নিয়ে আসাও নয়। বরং পার্থক্যকে স্বীকার করেই বৃহত্তর মানবিক ঐক্যকে উপলব্ধি করা। এই ধারণাই ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’— সমগ্র পৃথিবী এক পরিবার— এই প্রাচীন ভারতীয় ভাবনার সঙ্গে যুক্ত।
নিউ ইয়র্কের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধির উপস্থিতিও এই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেখানে মুসলিম ইমাম, ইহুদি ধর্মগুরু, খ্রিস্টান ধর্মযাজক এবং হিন্দু ধর্মীয় নেতারা একই মঞ্চে ছিলেন। তাঁদের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ‘এক মানবতা’র ধারণা। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভাগবতের বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। ভাগবতের বক্তব্য এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন তাঁর সংগঠন এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা চলছে। নিউ ইয়র্কে তাঁর অনুষ্ঠানের আগে প্রতিবাদও হয়েছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি আরএসএসের ভাবনাকে তাঁর পরিচিত ভারতের বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার সঙ্গে অসঙ্গত বলে মন্তব্য করেছেন। ফলে ভাগবতের বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে ছিল না। কিন্তু এই রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে বক্তব্যটির বিষয়বস্তুকে বিচার করাও জরুরি। কোনও বক্তব্য কে বলেছেন, কোন সংগঠনের নেতা বলেছেন— এগুলি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পাশাপাশি তিনি ঠিক কী বলেছেন, সেটিও
সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই ‘মুসলমানদের তাড়িয়ে দিতে চায় যে হিন্দু, সে হিন্দু থাকতে পারে না’ কথাটি আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে। ভারতের মতো বহু ধর্ম, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মুখ থেকে এমন কথা উচ্চারিত হওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ভাগবত একই সঙ্গে বলেছেন, ভারত ঐতিহাসিকভাবে এমন একটি দেশ যেখানে অন্যত্র নিরাপত্তা না-পাওয়া বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আশ্রয় পেয়েছেন। ভারতীয় সভ্যতার এই ঐতিহ্যকে তিনি তার বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, বৈচিত্র্যকে রক্ষা করা যেমন নিজের পরিচয়কে রক্ষা করার অংশ, তেমনই অন্যের পরিচয়কেও সম্মান করা প্রয়োজন।
আর একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের তিনি তাঁদের ‘কর্মভূমি’র প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বলেছেন। অর্থাৎ যে দেশে তাঁরা বসবাস করেন, সেই দেশের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে জন্মভূমি ভারতের প্রতি তাঁদের যে টান, সেটিও তাঁরা নিজেদের জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে পারেন। তাঁর মতে, ভারতের দেওয়া মূল্যবোধকে কাজে প্রমাণ করাই তার শ্রেষ্ঠ উপায়।
এই বক্তব্যে আত্মপরিচয়ের সঙ্গে দায়িত্বের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। নিজের সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করা এবং অন্য সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো— এই দুইকে পরস্পরের বিরোধী বলে দেখার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং সুস্থ সভ্যতার লক্ষণ হতে পারে এই দুয়ের সহাবস্থান।
ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকা মানেই অন্যের বিশ্বাসকে অস্বীকার করা নয়। নিজের পথকে ভালোবাসা মানেই অন্যের পথকে মুছে দেওয়ার দাবি করা নয়। ভাগবতের বক্তব্যের মূল সুরটি এই জায়গাতেই।
ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলবে, হিন্দুত্বের অর্থ নিয়েও মতভেদ থাকবে। এসব গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিতর্কের মাঝেও একটি নৈতিক প্রশ্নকে সামনে রাখা যায়— ভারত কি তার বৈচিত্র্যকে ধারণ করে এগোবে, নাকি পরিচয়ের পার্থক্যকে বিভাজনের কারণ করে তুলবে?
মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের বক্তব্য অন্তত তাঁর নিজের ব্যাখ্যায় প্রথম পথটির কথাই বলেছে। ‘মুসলমানদের ভারতে থাকা উচিত নয়’— এই ধারণাকে তিনি হিন্দুত্বের সঙ্গে অসঙ্গত বলেছেন। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তার প্রয়োজনও আছে। কিন্তু বক্তব্যটির নৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করার কারণ নেই।
শেষ পর্যন্ত কোনও সভ্যতার শক্তি শুধু তার সংখ্যায় নয়, তার ধারণার বিস্তারে। নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থেকেও অন্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করা, বৈচিত্র্যকে বোঝা এবং মানুষের মর্যাদাকে সর্বাগ্রে রাখা— এই মূল্যবোধই একটি বৃহৎ সমাজকে আরও পরিণত করে।

নিউ ইয়র্কের মঞ্চ থেকে মোহন ভাগবতের বক্তব্য তাই একটি সহজ প্রশ্ন রেখে যায়— হিন্দুত্ব যদি সত্যিই একত্বের দর্শনের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই একত্বের প্রথম পরীক্ষা কি অন্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করার মধ্যেই নয়? তাঁর নিজের বক্তব্যের উত্তর— হ্যাঁ। এবং সেই কারণেই ‘মুসলমানদের তাড়াতে চায় যে হিন্দু, সে হিন্দু থাকতে পারে না’— এই বাক্যটি শুধু একটি বক্তৃতার উদ্ধৃতি নয়; ভারতীয় বহুত্ববাদ নিয়ে বর্তমান আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হিসেবেই থেকে যেতে পারে।