সৈয়দ হাসমত জালাল
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক গভীর অস্থিরতার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তৃণমূল কংগ্রেস। এই দলটির ভেতরে যে ফাটল দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হচ্ছিল, তা এখন প্রকাশ্য বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে। লোকসভায় একাংশ সাংসদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার উদ্যোগ, বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের অসন্তোষ এবং তারই মধ্যে কংগ্রেসে ‘ঘর ওয়াপসি’ নিয়ে জল্পনা— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন জটিল ও বহুমাত্রিক।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে লোকসভা স্তরে। ২৮ জন সাংসদের মধ্যে প্রায় ২০ জন আলাদা ব্লক গঠন করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন বলে দাবি উঠেছে। যদিও এই সংখ্যাকে ঘিরে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটা স্পষ্ট— দলের ভেতরে ভাঙন বাস্তব এবং তা সংগঠনের শীর্ষ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। দলত্যাগ-বিরোধী আইনের শর্ত পূরণ করতে গেলে এই বিদ্রোহীদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন, যা তাদের রাজনৈতিক পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
একই সময়ে বিধানসভাতেও প্রায় ৬০ জন বিধায়কের অসন্তোষ দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একাংশ বিধায়ক নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করে কার্যত বর্তমান নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে একাধিক অভিযোগ— দলের মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ‘জমিদারি মানসিকতা’র অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন ক্রমশ সামনে আসছে— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন কি একমাত্র পথ কংগ্রেসের সঙ্গে জোট, না কি আরও এক ধাপ এগিয়ে দলীয় সংযুক্তিকরণ?
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মমতার পক্ষে একক শক্তিতে আবার ক্ষমতায় ফেরা অত্যন্ত কঠিন। সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরাজয় এবং দলীয় ভাঙনের ফলে সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সঙ্গে কৌশলগত জোট হতে পারে একটি বাস্তবসম্মত পথ। তবে তার থেকেও বড় জল্পনা তৈরি হয়েছে ‘ঘর ওয়াপসি’ নিয়ে—অর্থাৎ, মমতার কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন।
সূত্রের খবর, কংগ্রেস হাইকমান্ড ইতিমধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাঁকে দলের জাতীয় সহ-সভাপতির পদ দেওয়ার প্রস্তাব এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ প্রস্তাবিত হয়েছে বলেও শোনা যাচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে কোনও পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু স্বীকার করেনি, তবুও নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের জরুরি বৈঠক এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
এই সম্ভাবনার রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। একসময় কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল গড়ে তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই নেত্রীই যদি আবার কংগ্রেসে ফেরেন, তা হবে ভারতীয় রাজনীতির এক বড় মোড়। তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়।
প্রথমত, তৃণমূল কংগ্রেসের অস্তিত্বের প্রশ্ন রয়েছে। দলটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক। সেটিকে কংগ্রেসে মিশিয়ে দেওয়া মানে সেই স্বতন্ত্র পরিচয়ের অবসান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শক্তিশালী নেত্রীর পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের ভেতরেও এই প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য নেই। প্রবীণ নেতা আবদুল মান্নান সরাসরি জানিয়েছেন—মমতার সঙ্গে কোনও জোট নয়। অধীর চৌধুরীর মন্তব্য আরও কঠোর— তিনি এই সম্ভাবনাকে ‘পাপের ফল’ বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, কংগ্রেসের রাজ্যস্তরের নেতৃত্বের একাংশ এই প্রস্তাবে আপত্তি জানাচ্ছেন।
তৃতীয়ত, বিদ্রোহী তৃণমূল নেতাদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে এবং আপাতত কোনও দলের সঙ্গে মিশতে রাজি নয়। তাদের লক্ষ্য মূলত বর্তমান নেতৃত্বকে সরিয়ে দলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। ফলে, মমতা যদি কংগ্রেসের দিকে এগোন, তাহলে দলের ভেতরে আরও বিভাজন তৈরি হতে পারে।
তবে কংগ্রেসের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রস্তাব একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে। তৃণমূলের অবশিষ্ট শক্তিকে দলে অন্তর্ভুক্ত করলে সংসদে তাদের সংখ্যা বাড়বে এবং বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে। বিশেষ করে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
এই সমগ্র পরিস্থিতি ভারতীয় আঞ্চলিক রাজনীতির একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একসময় আঞ্চলিক দলগুলি ছিল শক্তিশালী ও স্বনির্ভর। কিন্তু এখন কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব, দলীয় কেন্দ্রীকরণ এবং উত্তরাধিকার রাজনীতি তাদের দুর্বল করে তুলছে। বিজেপির উত্থান এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে, কারণ তা বিদ্রোহীদের জন্য একটি বিকল্প শক্তিকেন্দ্র তৈরি করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট সেই বৃহত্তর প্রবণতারই অংশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও লড়াইয়ের মনোভাব বজায় রেখেছেন এবং দলকে পুনর্গঠনের কথা বলছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল, সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমেছে।
এই অবস্থায় তাঁর সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমত, দলকে নতুন করে গড়ে তোলা এবং বিদ্রোহ দমন করা। কিন্তু তার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক মহল। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে রাজনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার চেষ্টা। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক চিহ্ন ধরে রাখতে পারবেন কিনা, সে বিষয়েই তো সন্দেহ রয়ে গিয়েছে।
তৃতীয়ত, চরম পরিস্থিতিতে কংগ্রেসে ফিরে যাওয়া।
তবে দ্বিতীয় পথ— অর্থাৎ জোট— এই মুহূর্তে সবচেয়ে সম্মানজনক হতে পারত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে। কিন্তু দলের প্রতীক চিহ্ন ধরে রাখতে না পারলে জোটের প্রশ্ন উঠবে না।
শেষ পর্যন্ত, এই সংকট শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গ এবং জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন? তিনি কি অতীতের সঙ্গে আপস করে নতুন সমীকরণে প্রবেশ করবেন, না কি একাই লড়াই চালিয়ে যাবেন?
উত্তর এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— তৃণমূল কংগ্রেসের এই সংকট ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা
করতে চলেছে।




