• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 30 August, 2026

এখন দোষারোপের সময় নয়

হিমালয়ে সাম্প্রতিক হিমবাহ ধস ও তার পরবর্তী বিপর্যয়ের যে ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে, তা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা নয়।

এখন দোষারোপের সময় নয়

pic- ai

হিমালয়ে সাম্প্রতিক হিমবাহ ধস ও তার পরবর্তী বিপর্যয়ের যে ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে, তা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা নয়। এর ব্যাপ্তি এতটাই বড় যে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। নেপালের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিপর্যয় মোকাবিলা কর্মীরা এখনও দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নীচে কেউ জীবিত থাকলে তাকে উদ্ধারের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিব্বতের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সেখানে একটি জলাধার বা বাধের মতো প্রাকৃতিক জলাধার ভেঙে যাওয়ার খবর নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
এই অবস্থায় বিপর্যয়ের জন্য কে দায়ী, তা নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগের লড়াই শুরু করা মোটেই সমীচীন নয়। বরং এখন প্রয়োজন উদ্ধারকাজ, তথ্য আদানপ্রদান এবং ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকানোর উপায় নিয়ে ভাবা।
প্রাথমিকভাবে যে চিত্রটি পাওয়া যাচ্ছে, তাতে হিমবাহ ধসই এই বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক কারণ। তিব্বতের কোনও হিমবাহ-হ্রদে সঞ্চিত জল হঠাৎ বেরিয়ে এসে পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছিল কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীর স্রোতের সঙ্গে নীচের দিকে নেমে এসে বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। উপগ্রহের পর্যবেক্ষণও হিমবাহ ধসের ঘটনাটিকে বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার দিকে ইঙ্গিত করছে।
নেপালের সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে, সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে চিনের কাছ থেকে যথাসময়ে আন্তর্জাতিক বা প্রতিবেশী দেশগুলিকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিমবাহ-হ্রদ থেকে আকস্মিক জল নেমে এলে তার গতি অত্যন্ত দ্রুত হতে পারে, কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে নদীপথে সেই জল নীচের দিকে পৌঁছতে কিছুটা সময়ও লাগে। সেই সময়টুকু কাজে লাগাতে পারলে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
তবে একই সঙ্গে বাস্তব সমস্যাটিও বুঝতে হবে। হিমালয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। প্রতিটি পরিবর্তনকে বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে ধরে নিয়ে সতর্কতা জারি করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। বারবার সতর্কবার্তা দিয়ে যদি তার অনেকগুলিই বাস্তবে বিপর্যয়ে পরিণত না হয়, তাহলে একসময় মানুষ সতর্কবার্তার গুরুত্বই হারিয়ে ফেলতে পারে। তাই এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যেখানে প্রযুক্তির সাহায্যে বিপদের মাত্রা দ্রুত নির্ণয় করা যাবে এবং প্রকৃত জরুরি অবস্থায় নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া যাবে।
এই ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন-ভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন হলেও মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সহজে তৈরি করা সম্ভব। অবশ্য সব এলাকায় নেটওয়ার্ক সমান শক্তিশালী নয়। তাই মোবাইলের পাশাপাশি সাইরেন, রেডিও এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সতর্কীকরণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হিমালয় কোনও একটি দেশের সম্পত্তি নয়। ভারত, নেপাল, ভুটান, চিন-সহ একাধিক দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই পর্বতমালা। একটি দেশের পাহাড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা নদীপথে অন্য দেশের মানুষের জীবনকে বিপন্ন করতে পারে। ফলে বিপর্যয়ের আগাম খবর, উপগ্রহের তথ্য, নদীর জলস্তর এবং হিমবাহের পরিবর্তন সম্পর্কে প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় অপরিহার্য। কূটনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামা বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য এই মানবিক সহযোগিতার পথে বাধা হওয়া
উচিত নয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে আরও কঠিন প্রশ্ন। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় রাস্তা, সেতু, বাঁধ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা বড় পরিকাঠামো নির্মাণ আজ বাস্তব প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে দেশগুলি এই প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। কিন্তু হিমালয়ের মতো অত্যন্ত ভঙ্গুর পরিবেশে বড় নির্মাণকাজ প্রকৃতির ভারসাম্য কতটা নষ্ট করছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
উন্নয়নের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু উন্নয়ন যদি পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে তার মূল্য দিতে হতে পারে বহু গুণ বেশি। তাই প্রতিটি বড় প্রকল্পের আগে পরিবেশগত ঝুঁকি, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ এবং হিমবাহের পরিবর্তন সম্পর্কে আরও কঠোর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি।
নেপাল-তিব্বতের এই বিপর্যয় তাই শুধু শোকের নয়, সতর্ক হওয়ারও বার্তা। এখন দোষারোপের রাজনীতি নয়— প্রয়োজন তথ্যের স্বচ্ছতা, প্রতিবেশী দেশগুলির সহযোগিতা, আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং প্রকৃতির সীমাকে সম্মান করে উন্নয়নের পথ খোঁজা। হিমালয়ের বিপদ কোনও সীমান্ত মানে না। তাই তাকে মোকাবিলা করতেও সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।