সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবার ভারতের সামাজিক বাস্তবতা, আইন এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মোনালিসা ভোঁসলে এবং ফরমান খান— উত্তরপ্রদেশের দুই তরুণ-তরুণীর বিবাহ সেই বিতর্কের কেন্দ্রে। দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে বিয়ে, যা স্বাভাবিক ও আইনসম্মত, তাও আজকের ভারতে অনেক সময় রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক প্রচারের শিকার হয়ে পড়ছে।
এই তরুণী প্রথম আলোচনায় আসেন ২০২৫ সালের মহাকুম্ভ মেলায় উপস্থিত থাকার পর। পরে তিনি অভিনেতা ফারমান খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চান। কিন্তু তাঁদের এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকেই কিছু গোষ্ঠী ‘লাভ জিহাদ’ বলে প্রচার করতে শুরু করে। অভিযোগ তোলা হয় ধর্মান্তরের, এমনকি কনের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। অথচ দু’জনেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন— কেউ ধর্ম পরিবর্তন করেননি। মোনালিসা হিন্দুই রয়েছেন, ফরমান মুসলিমই রয়েছেন। অর্থাৎ তাঁদের সম্পর্কের ভিত্তি ধর্ম নয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত।
Advertisement
ভারতের আইন এই ধরনের বিবাহকে স্বীকৃতি দেয়। বিশেষ করে স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্টের অধীনে ভিন্ন ধর্মের দুই প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ধর্মান্তর ছাড়াই বিবাহ করতে পারেন। এই আইন ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনারই এক বাস্তব রূপ। স্বাধীন ভারতের অন্যতম শক্তি এখানেই— ব্যক্তির স্বাধীনতা, পছন্দ এবং আইনের সমান সুরক্ষা।
Advertisement
কিন্তু বাস্তব সমস্যা অন্য জায়গায়। উত্তরপ্রদেশের মতো কিছু অঞ্চলে এখনও আন্তঃধর্মীয় বিবাহকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। বিশেষত যখন হিন্দু নারী এবং মুসলিম পুরুষের সম্পর্কের কথা ওঠে, তখন কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘লাভ জিহাদ’ তত্ত্ব সামনে এনে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, এমন সম্পর্কের কারণে তরুণ-তরুণীদের হুমকি, হয়রানি এমনকি শারীরিক আক্রমণের মুখেও পড়তে হয়। লক্ষ্য করা যায়, অভিযোগের মূল নিশানা প্রায়শই মুসলিম যুবকটি।
মোনালিসা ও ফরমানের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি এড়াতে এবং পারিবারিক অস্বস্তি ও সম্ভাব্য সামাজিক উত্তেজনার আশঙ্কায় তাঁরা শেষ পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশ ছেড়ে দক্ষিণের রাজ্য কেরলে চলে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা আইন অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন। মোনালিসার ইচ্ছায় প্রথমে একটি মন্দিরে হিন্দু আচার অনুযায়ী বিয়ের অনুষ্ঠানও হয়। তারপর আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁদের বিবাহ নথিভুক্ত করা হয়।
এই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী দিক রয়েছে। কেরল দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে উদার সামাজিক পরিবেশ এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার জন্য পরিচিত। সেখানে এই তরুণ দম্পতিকে স্বাগত জানানো হয়েছে এবং তাঁরা নিজেদের নিরাপদ বলে অনুভব করেছেন। জানা গিয়েছে, বিবাহের সময় কেরলের দুই বামপন্থী নেতা তাঁদের পাশে উপস্থিত ছিলেন, যা এক ধরনের সামাজিক সংহতির ইঙ্গিতও বহন করে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে— ভারতের এক প্রান্তে যে সম্পর্ককে ঘিরে ভয়, সন্দেহ ও হুমকি তৈরি হয়, অন্য প্রান্তে সেই সম্পর্কই কেন আইনের স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের দিকে তাকাতে হয়।
ভারত একটি বহুধর্মী, বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক দেশ। এই বৈচিত্র্যই তার শক্তি। কিন্তু যখন ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সেই বৈচিত্র্যই বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘লাভ জিহাদ’-এর মতো তত্ত্ব বহুবার আদালতে প্রমাণের অভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তবু তা রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক সহাবস্থানের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানে মূল প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল— দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেদের ইচ্ছেয় বিয়ে করলে তাতে অন্যের আপত্তির অধিকার কোথায়? রাষ্ট্রের আইন যদি সেই সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয়, তবে সমাজের কোনও গোষ্ঠী কি সেই সিদ্ধান্তের উপর আক্রমণ চালাতে পারে?
মোনালিসা ও ফরমানের ঘটনাটি তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত গল্প নয়। এটি আজকের ভারতের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সন্দেহ, অন্যদিকে সংবিধান, আইন এবং মানবিকতার মূল্যবোধ। এই ঘটনায় কেরল যে ভূমিকা নিয়েছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে— আইন ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজকে পরিচালিত করা সম্ভব। ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই দায়িত্ব। সম্ভবত সেই কারণেই এই তরুণ দম্পতি এখন কেরলেই স্থায়ীভাবে বসবাস করার কথা ভাবছেন। তাঁদের সিদ্ধান্তের মধ্যে এক ধরনের প্রতীকী বক্তব্য রয়েছে— যেখানে মানুষ নিজের পরিচয়, বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে নিরাপদ মনে করে, সেখানেই সে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়।
ভারতের সংবিধান যে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তার বাস্তব পরীক্ষা এই ধরনের ঘটনাতেই হয়।
Advertisement



