• facebook
  • twitter
Wednesday, 8 April, 2026

এসআইআর বিতর্ক

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ট্রাইব্যুনালগুলির কার্যকারিতা। ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলেও এখনও পর্যন্ত মাত্র দু’টি বিশেষ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল একটাই— ভোটার তালিকাকে শুদ্ধ করা, যাতে কেবলমাত্র প্রকৃত ও বৈধ নাগরিকরাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া কি বাস্তবে এক বৃহৎ বর্জন প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে? পরিসংখ্যান এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সেই সংশয়কেই আরও ঘনীভূত করছে।

তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর আওতায় আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৭ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে খসড়া তালিকা থেকে মৃত, অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত বা ডুপ্লিকেট হিসেবে বাদ পড়া আরও প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম। সব মিলিয়ে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, যা এক বিশাল সংখ্যা। এত বিপুল পরিমাণ বাদ পড়ার ঘটনা নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফল, না কি এর পেছনে অন্য কোনও প্রবণতা কাজ করছে— এই প্রশ্নই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।

Advertisement

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই বর্জনের প্রভাব সব জেলায় সমান নয়। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলায় ১১ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লক্ষকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এই অনুপাত স্বাভাবিক নয় বলেই মনে করছেন অনেকেই। আবার নন্দীগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে দেখা যাচ্ছে, যেখানে মুসলিম ভোটার প্রায় ২৫ শতাংশ, সেখানে বাদ পড়া নামের মধ্যে মুসলিমদের অংশ ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই ধরনের বৈষম্যমূলক পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে— এসআইআর কি নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়েছে?

Advertisement

গণতন্ত্রে ভোটাধিকার কেবল একটি আইনি অধিকার নয়, এটি নাগরিকের অস্তিত্বের স্বীকৃতি। সেই অধিকার থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বঞ্চিত করার আশঙ্কা তৈরি হলে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায় না, এটি হয়ে ওঠে সাংবিধানিক সংকট। বিশেষত যখন বহু ভোটার দাবি করছেন যে, তাঁরা বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তখন এই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়।

এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। ‘ম্যাপড’ ভোটারদের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা চাওয়া হয়েছিল— যাঁরা ২০০২ সালের এসআইআর-পরবর্তী সময়ে নিজেদের বা তাঁদের পূর্বপুরুষদের নাম ভোটার তালিকার সঙ্গে সংযুক্ত করতে পেরেছিলেন। এই শ্রেণির ভোটারদের নাম হঠাৎ বাদ পড়া অনেকের কাছেই অন্যায্য বলে মনে হয়েছে। কিন্তু শীর্ষ আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। যদিও আদালত আশ্বাস দিয়েছে যে ট্রাইব্যুনালগুলি সাংবিধানিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে, তবুও বাস্তবে সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং মামলার বিপুল সংখ্যা এই আশ্বাসকে কতটা কার্যকর করবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ট্রাইব্যুনালগুলির কার্যকারিতা। ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলেও এখনও পর্যন্ত মাত্র দু’টি বিশেষ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এই গতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। নির্বাচনের আগে এত বিপুল সংখ্যক আপত্তি নিষ্পত্তি করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে বহু মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারাতে পারেন, যা কার্যত ‘ডি-ফ্যাক্টো’ ভোটাধিকার হরণের সমান।

এসআইআর-এর পক্ষে যারা সওয়াল করছেন, তাঁদের যুক্তি— ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ অত্যন্ত জরুরি, কারণ ভুয়ো ভোটার গণতন্ত্রকে বিকৃত করে। এই যুক্তি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু শুদ্ধিকরণের নামে যদি প্রকৃত ভোটাররাই বাদ পড়েন, তবে তা গণতন্ত্রকে রক্ষা নয়, বরং দুর্বল করে। গণতন্ত্রের শক্তি তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে, সেখানে বর্জনের প্রবণতা বিপজ্জনক।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে তাদের দায়িত্ব কেবল নিয়ম প্রয়োগ নয়, বরং সেই নিয়মের ন্যায্যতা এবং প্রভাবও বিবেচনা করা। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি— এই তিনটি উপাদান ছাড়া এমন একটি বৃহৎ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
সবশেষে, এই বিতর্ক আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়— গণতন্ত্র কি কেবল প্রক্রিয়ার নাম, না কি মানুষের অধিকার রক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য প্রতিশ্রুতি? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে এসআইআর-এর মতো প্রক্রিয়াকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে কোনও বৈধ নাগরিক তাঁর ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। অন্যথায়, এই ‘শুদ্ধিকরণ’-এর দাবিই একদিন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

Advertisement