• facebook
  • twitter
Thursday, 9 April, 2026

আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারি সাজিয়া…

খাদ্য আন্দোলনের পর এই ভোটটা হওয়ায় নিম্নমানের খাবারদাবারের বিরুদ্ধে প্রচারটা বেশি হয়েছিল। কংগ্রেসেও দমে যাওয়ার পাত্র নয়।

প্রতীকী চিত্র

ধ্রুবজ‍্যোতি মন্ডল

নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই মিটিং মিছিলে মুখোরিত হয়ে উঠছে কলকাতা ও শহরতলি। অন্যদিকে গ্রামবাংলাও বসে নেই। সেখানেও টক্কর চলছে সমানে সমানে। সবচেয়ে চোখ টানছে রাজনৈতিক দলগুলির ছড়াযুদ্ধ। লোকের বাড়ির দেওয়াল জুড়ে যেন এক একটা রণাঙ্গন আর মানুষ তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে। এমনিতেই বোলচালের এই শহরে পাবলিক কিছু না কিছু নিয়ে মেতে থাকে। কখনও ক্রিকেট কখনও ফুটবল, কখনও বা সিনেমা। রাজনীতি তো কমন ব্যাপার। কিন্তু ছড়া আসে ভোট মরশুমে। নানান রঙে হরেক ছড়ায় সেজে ওঠে বাড়ির পাঁচিল। মুহূর্তের জন্য তাদের মুখেও ফোটে বোল। দেখার মত সে পরিবেশ। তবে আজ বলে নয়, ভোটে ছড়া লেখার ইতিহাস বহুদিনের। সে প্রায় দাদাঠাকুরের আমল থেকে। ষাটের দশকে ‘দাদাঠাকুর’ নামে সিনেমা হয়েছিল। তখন শরৎপণ্ডিত বেঁচে আছেন। তিনি ‘বিদূষক’ নামেই পরিচিত ছিলেন। এই সিনেমায় ছবি বিশ্বাস ছিলেন নাম ভূমিকায়। গীতিকার হিসেবে কাজী নজরুলের সঙ্গে ছিলেন শরৎপণ্ডিত নিজে। তিনিই লিখেছিলেন, ‘ভোট দিয়ে যা আয় ভোটাররা/ যদুর কপালে তোরা ভোট দিয়ে যা/ মাছ কুটলে মুড়ো দিব/ ধান ভাঙলে কুঁড়ো দিব/ গাই বিয়োলে বাছুর দিব/ দুধ খাবার বাটি দিব’ বা ‘আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারি সাজিয়া/ ফিরিনু দ্বারে দ্বারে…’। ভোটের ছড়া লেখার প্রথম প্রচলন করেন এই দাদাঠাকুর। ১৯৫২ সালে সাধারণ নির্বাচনের সময় দেয়াল লিখন ছিল না। ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন থেকে দেয়াল লেখা শুরু হয়। তখন কবি সাহিত্যিকদের কবিতা কোট করে ভোটের সময়‌ দেয়ালে লেখা হত।

Advertisement

রবীন্দ্রনাথের কবিতাই সে সময় বেশি চলত। বিশেষ করে এই কবিতাটি— ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস/ শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস/ বিদায় নেবার আগে তাই/ ডাক দিয়ে যাই/ দানবের সাথে সংগ্রামের তরে/ প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।’ আবার অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়াও সেই সময় লেখা হত। ‘জেলখানায় যায় যেই/ গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই।…’‌ আগে কমিউনিস্ট পার্টি বলতে ছিল সিপিআই। তারা লিখত, ‘ভোট দেবেন কিসে/ কাস্তে ধানের শিষে’৷ ‘জোড়া বলদে দুধ নেই/ কংগ্রেসের ভোট নেই’, পাল্টা কংগ্রেস লিখত, ‘জোড়া বলদে টানছে মই/ উড়কি ধানের মুড়কি খই।’ ভোট দেবেন কোথায়/ জোড়া বলদ যেথায়’।

Advertisement

রাজ্যে তখন কংগ্রেস শক্তিশালী দল। তাদের নির্বাচনী প্রতীক জোড়া বলদ। কমিউনিস্ট দলের- কাস্তে ধানের শিষ, ভারতীয় জনসংঘ দলের প্রতীক- প্রদীপ, স্বতন্ত্র পার্টির— তারা, প্রজা সোস্যালিস্ট দলের— কুঁড়েঘর, সংযুক্ত সোস্যালিস্ট পার্টির— ঝুরি নামা বটগাছ, ফরওয়ার্ড ব্লকের— সিংহ। এছাড়া নির্বাচনে থাকত ওয়ার্কাস পার্টি, সাধারণতন্ত্রী দল, বলশেভিক পার্টি, আরসিপিআই (সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর পন্থী), পুরুলিয়ার গান্ধীবাদী লোকসেবক সংঘ। এই সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর অসাধারণ বক্তৃতা করতেন। এখন অনেক দলই লুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৫২-৬২ সাল পর্যন্ত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের ছাপানো পোস্টারে মাথায় সাদা টুপি বুকে লাল গোলাপ জওহরলাল নেহেরুর হাসি মুখ দেখা যেত। প্রচারের জন্য বৈদ্যুতিন মাইক ছিল না। ছিল লম্বা-লম্বা চোঙ। ওই নির্বাচনগুলিতে কংগ্রেস জয়লাভ করে সরকার গড়েছিল। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে ডা. বিধানচন্দ্র রায় বউবাজার কেন্দ্রে সিপিআই প্রার্থী মহম্মদ ইসমাইলকে ৫০০ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে আবারও মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৬৬ সালটা বাংলার পক্ষে সুখকর ছিল না। খাদ্য আন্দোলনে শহিদ হয়েছিল অনেক কৃষক, ছাত্র যুব। ফলে ১৯৬৭র নির্বাচনে কংগ্রেস কোনঠাসা হল। এই নির্বাচনে কংগ্রেস বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দুটি ফ্রন্ট করে ভোটে লড়েছিল। বাংলা কংগ্রেস, সিপিআই, পিএসপি, গোর্খা লিগ, ফরওয়ার্ড ব্লক, বলশেভিক পার্টি, লোকসেবক সংঘ মিলে তৈরি হল একটি ফ্রন্ট আর অন্য একটি ফ্রন্টের শরিকরা হল সিপিআইএম, মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক, আরসিপিআই, বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল, এসইউসি, ওয়ার্কাস পার্টি, সংযুক্ত সোস্যালিস্ট পার্টি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে শুরু হল দারুণ লড়াই। অবশ্যই গনতান্ত্রিক যুদ্ধ। কংগ্রেসিরা লিখল, ‘গড়তে দেশ রুখতে চীন কংগ্রেসকে ভোট দিন’। বা ‘চীনের চিহ্ন কাস্তে হাতুড়ি/ পাকিস্তানের তারা/ এখনও কি বলতে হবে/ দেশের শত্রু কারা?’ প্রত্যুত্তরে কমিউনিস্টরা ব্যাক্তি আক্রমণে মূখর হল। প্রফুল্ল সেন, অতুল্য ঘোষদের বিরুদ্ধে খাদ্য আন্দোলনকে সামনে রেখে তারা দেয়ালে লিখল, ‘দু’আনা সের বেগুন কিনে, মন হল প্রফুল্ল/ বাড়িতে এসে কেটে দেখি, সব কানা অতুল্য’। কিংবা ‘এক যে ছিল মজার দেশ, সব রকমের ভালো/ চালের বদল ক্ষুদ দেয়, ক্ষুদের বদল মাইলো।/ মাইলোর বদল পচা গম, গমের বদল গুলি/ ভেবেছে বুঝি বাংলাদেশ সব গিয়েছে ভুলি।’

খাদ্য আন্দোলনের পর এই ভোটটা হওয়ায় নিম্নমানের খাবারদাবারের বিরুদ্ধে প্রচারটা বেশি হয়েছিল। কংগ্রেসেও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তারা লিখল, ‘যবের আটা ফাটাফাটি/ অজয়-জ্যোতি আস্ত পাঁঠা/ প্রফুল্ল সেন বাপের ব্যাটা/ সে খাইয়েছিল গমের আটা’। আসলে ১৯৬৭ সালটা ছিল বাংলার রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। কেননা স্বাধীনতার পর থেকে এতদিন কংগ্রেসেই একতরফা নির্বাচনে জিতে আসছিল। কিন্তু খাদ্য আন্দোলন এবং তার পরিণতি হাওয়া ঘুরিয়ে দিল। মানুষ কংগ্রেসের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। আর সেই ক্ষোভের আগুন সম্বল করে ক্ষমতায় এল চোদ্দ দলের যুক্তফ্রন্ট। রাজ্য বিধানসভায় গঠিত হল প্রথম অকংগ্রেসি মন্ত্রিসভা। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনী ফলাফলে যেদিন জানা গেল প্রফুল্ল সেন এবং অতুল্য ঘোষ দু’জনই পরাজিত হয়েছেন সেদিন কাতারে কাতারে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। তখন সিপিআই(এম) দলের কর্মীরা লিখেছিল ‘আরামবাগের হারামখানায় কাঁদছে বসে প্রফুল্ল/ অজয় নদের বানে এবার ভাসল কানা অতুল্য। জলের শত্রু কচুরিপানা/ দেশের শত্রু অতুল্য কানা’৷ তবে ফ্রন্ট বেশিদিন টিকল না। নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটিতেই প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটল মাত্র নয় মাসেই। রাজ্যপালের দ্বারা বরখাস্ত হয়েছিল এই মন্ত্রিসভা। সে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক অস্থিরতা। মন্ত্রিসভা গঠন‌ অল্প সময়ের ব্যবধানে মন্ত্রিসভা ভেঙে যাওয়া এবং আবারও নির্বাচনের প্রস্তুতি। জঙ্গলরাজ বলতে যা বোঝায় পরিস্থিতি সে দিকেই গিয়েছিল। অবশ্য এর আসল কারন শুধুমাত্র ঝগড়াঝাটি নয়, ছিল খাদ্য আন্দোলন যা কোন পক্ষই ঠিকমত সামলাতে পারেনি। হয়তো সম্ভবও ছিল না। ১৯৬২ সালে চিন ও ৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ সঙ্গে পাকিস্তান থেকে আগত বিপুল শরণার্থীর বোঝা সে সময় স্বাভাবিক ভাবেই খাদ্যভান্ডারে টান পড়ল। বাজারে খাদ্যশস্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠলো। এই অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলি পরস্পরের মধ্যে দোষারোপে সোচ্চার হল। তাই অল্প সময়ের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় কংগ্রেস জবাব দিয়েছিল, ‘অনেক দেখেছি ঢের হয়েছে/ ভেঙেছে তোদের জোট/ লজ্জা যদি থাকে তবে আর/ চাসনি কো তোরা ভোট’। তারা আরও বলেছিল, ‘যেখানে জ্যোতি/ সেখানে ক্ষতি।’ ‘দেহের শত্রু পাঁচড়া খোস/ দেশের শত্রু জ্যোতি বোস’। পরবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেস তাদের জনসভায় উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত শাপমোচন ছবির বিখ্যাত গানটির প্যারোডি করেছিল, ‘শোন বন্ধু শোন / ফ্রন্টের ওই ন’মাসের ইতিকথা/ চোদ্দ দলের গোঁজামিলের/ সে এক বীভৎসতা।’

সে সময় বামপন্থীরা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাও প্রচারে আনতেন। ‘শোন রে মালিক শোন রে মজুতদার/ তোদের প্রাসাদে জমা হলো কত মৃত মানুষের হাড়/ হিসেব কি দিবি তার।’

আবার প্রথম যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার সময় জনগণকে একটাকা কেজি চাল দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যখন রাখতে পারল না তখন কংগ্রেস লিখলো, ‘একটাকা কেজি চাল কোথায় গেল/ অজয় নদে ভেসে গেল’। ‘চাল দিয়ে চাল মারলো কারা/ অজয়-জ্যোতি-কোঙার-ধাড়া (ধাড়া মানে সুশীল ধাড়া)। এই ভাবেই সময়ের তালে তাল মিলিয়ে নানান ইস্যুতে অনেক ছড়া লেখা হয়েছে। আজও তা অব্যাহত আমাদের রাজ্যে এই ছাব্বিশের নির্বাচনে। এখন দেখার কার ছড়া ভোটারদের মন জয় করে।

Advertisement