সুদীপ ঘোষ
পশ্চিম এশিয়ার মরুভূমিতে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠলে তার আলো শুধু আকাশ লাল করে না; তার দীর্ঘ ছায়া ধীরে ধীরে পৃথিবীর ধানক্ষেতেও পড়ে। যুদ্ধের সংবাদ আমরা সাধারণত দেখি ধোঁয়া, ধ্বংস আর অস্ত্রের ভাষায়। কিন্তু আধুনিক পৃথিবীতে যুদ্ধের প্রকৃত অভিঘাত অনেক সময় দৃশ্যমান নয়—তা প্রবাহিত হয় বাণিজ্যের পথ ধরে, জ্বালানির বাজারে, আর শেষ পর্যন্ত মানুষের থালায়। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সেই অদৃশ্য শিরাগুলোর একটিকে স্পর্শ করেছে— হরমুজ প্রণালী। এই সরু জলপথ কেবল তেলের পথ নয়; এটি আধুনিক কৃষির জীবনরেখাগুলোর একটি। ভূগোলের পাঠে আমরা শিখি যে পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু কিছু সংকীর্ণ পথ অস্বাভাবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুয়েজ খাল, মালাক্কা প্রণালী, বসফরাস— এসব কেবল জলপথ নয়, সভ্যতার ধমনী। হরমুজ প্রণালীও তেমনই এক ধমনী। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এবং রাসায়নিক শিল্পের উপকরণ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়। যদি এই পথ একদিন থেমে যায়, তবে তা কেবল জ্বালানি বাজারেই নয়, পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থায়ও কম্পন সৃষ্টি করতে পারে।
Advertisement
আধুনিক কৃষির ইতিহাস আসলে এক ধরনের নীরব বিপ্লবের ইতিহাস। মানুষ হাজার বছর ধরে কৃষিকাজ করেছে, কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞান সেই প্রাচীন চর্চাকে এক নতুন শক্তি দিয়েছে। জার্মান বিজ্ঞানী ফ্রিটজ হাবার এবং কার্ল বশ যখন বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনকে শিল্পপ্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, তখন তারা মানবসভ্যতার খাদ্যব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথ খুলে দেন। এই পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয় অ্যামোনিয়া, আর সেই অ্যামোনিয়া থেকে তৈরি হয় ইউরিয়া— যা আজ বিশ্বের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সার।
Advertisement
এই সারের গুরুত্ব বুঝতে হলে শুধু একটি তথ্য মনে রাখলেই যথেষ্ট। পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যা এত বেশি যে ঐতিহ্যগত কৃষিপদ্ধতি দিয়ে তাদের খাদ্য জোগানো সম্ভব হতো না। আধুনিক কৃষির উচ্চ উৎপাদনক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে রাসায়নিক সারের ওপর। অর্থাৎ মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য অনেকাংশে নির্ভর করছে সেই শিল্পপ্রক্রিয়ার ওপর, যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস ও বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন একত্রিত হয়ে কৃষির জন্য নতুন শক্তি তৈরি করে।
এই বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার। সেই গ্যাসকে কেন্দ্র করে কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো দেশগুলো বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া উৎপাদন করে। বিশ্বের বাজারে যে বিপুল পরিমাণ নাইট্রোজেন সার বাণিজ্য হয়, তার একটি বড় অংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। আর সেই সারের যাত্রাপথের প্রধান দরজা হলো হরমুজ প্রণালী।
যদি যুদ্ধের কারণে এই দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার প্রভাব প্রথমে বোঝা যাবে জ্বালানির দামে। কিন্তু তার প্রকৃত অভিঘাত দেখা যাবে কয়েক মাস পরে কৃষিক্ষেত্রে। অর্থনীতিবিদেরা এই সম্ভাবনাকে একটি নতুন নামে ডাকছেন— ‘সার অভিঘাত’। অর্থাৎ এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে সারের সরবরাহ কমে যায় এবং দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
সারের সংকটের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। এটি তেলের সংকটের মতো তাৎক্ষণিক নয়। পেট্রোলের দাম রাতারাতি বাড়তে পারে, কিন্তু সারের প্রভাব দেখা যায় সময় নিয়ে। কৃষকেরা বপনের আগে সার কিনে রাখেন। যদি সেই সময়ে সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে তার প্রভাব ফসলের মাঠে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। কয়েক মাস পরে যখন ফসলের ফলন কমে যায়, তখন বোঝা যায় এই নীরব সংকট কত গভীরে পৌঁছেছে।
ভারতের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এই প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের অর্থনীতি আজ বহুমাত্রিক হলেও দেশের খাদ্যব্যবস্থা এখনও কৃষির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ধান, গম, ডাল, তেলবীজ— এই ফসলগুলো শুধু অর্থনীতির অংশ নয়; এগুলো কোটি মানুষের জীবনের ভিত্তি। কিন্তু এই বিপুল উৎপাদনের পেছনে যে রাসায়নিক সারের ভূমিকা রয়েছে, তা প্রায়ই আমাদের আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
ভারত নিজে ইউরিয়া উৎপাদন করলেও সেই উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আসে, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ফলে হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী কোনও অচলাবস্থা তৈরি হলে ভারতের সার সরবরাহ ও উৎপাদন— দুটোই চাপে পড়তে পারে।
ভারতের কৃষকরা সাধারণত বপনের আগে সার সংগ্রহ করেন। যদি সেই সময়ে সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে তাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত আসে। তারা হয় বেশি দাম দিয়ে সার কিনবেন, নয়তো কম সার ব্যবহার করবেন। কিন্তু কৃষিবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো— নাইট্রোজেন সারের পরিমাণ সামান্য কমালেও ফসলের উৎপাদন অনেক বেশি কমে যেতে পারে। ফলে সারের সংকট সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের ওপর আঘাত হানে।
এই প্রভাব এক দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। ব্রাজিল তার বিশাল সয়াবিন ও ভুট্টা উৎপাদনের জন্য বিদেশি সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আফ্রিকার বহু দেশে সারের ব্যবহার আগেই কম; দাম বাড়লে কৃষকেরা আরও কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত কৃষি অর্থনীতিও সম্পূর্ণ স্বনির্ভর নয়। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের কথাও মনে রাখতে হয়— সালফার বা গন্ধক। উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য এটি অপরিহার্য। কিন্তু এই উপাদান মূলত তেল ও গ্যাস শোধনের একটি উপপণ্য। ফলে যদি জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে সালফারের সরবরাহও কমে যায়। অর্থাৎ সারের সংকট তখন আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে।
এই ঘটনাগুলো আমাদের আধুনিক সভ্যতার একটি মৌলিক সত্যের দিকে নিয়ে যায়। পৃথিবীর অর্থনীতি আজ এমন এক জটিল ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জ্বালানি, কৃষি এবং খাদ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমরা প্রায়ই তেলের দাম বাড়াকে বড় সংকট হিসেবে দেখি। কিন্তু খাদ্যের দাম বাড়লে সমাজে তার অভিঘাত আরও তীব্র হয়।
ভারতের মতো জনবহুল দেশে তাই পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ কেবল দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক নাটক নয়। তার প্রতিধ্বনি ভারতের কৃষিক্ষেত্রেও পৌঁছাতে পারে। কারণ আধুনিক পৃথিবীতে যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বাজারে খাদ্যের দামে গিয়ে ধরা দেয়।
বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবী শিখেছিল তেল অবরোধের ভয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা হয়তো আরেকটি নতুন শিক্ষা দিচ্ছে— সারের সরবরাহও এক ধরনের ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কারণ তেল গাড়ি চালায়, শিল্প চালায়; কিন্তু নাইট্রোজেন সার চালায় পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থা।
আর যদি কোনও একদিন হরমুজ প্রণালীর মতো একটি সরু জলপথ থেমে যায়, তখন হয়তো পৃথিবী উপলব্ধি করবে— সভ্যতার স্থিতি অনেক সময় নির্ভর করে সেই অদৃশ্য রাসায়নিক চক্রের ওপর, যার মাধ্যমে মাটি আবার শস্যে ভরে ওঠে। যুদ্ধের আগুন তখন কেবল মরুভূমিতে নয়, মানুষের ক্ষুধার ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় লিখতে শুরু করে।
Advertisement



