• facebook
  • twitter
Wednesday, 11 February, 2026

স্পেনের গৃহযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ও জওহরলালের ভূমিকা

সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে League against Fascism awd War নামে একটি সংঘ গঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথকে এর সভাপতি করা হয়। সম্পাদক হন সৌম্যেন্দ্রনাথ।

বিমলকুমার শীট

স্পেনের গৃহযুদ্ধ ইউরোপের আকাশে কাল মেঘের সঞ্চার করে যা ছিল বিশ্ববাসীর কাছে এক অশনি সংকেত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে একে ‘ক্ষুদে বিশ্বযুদ্ধ’ বলে অভিহিত করা যায়। ইউরোপ মহাদেশে এর সূচনা হলেও ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাহিত্যিকরা এ বিষয়ে নীরব ছিলেন না। বুদ্ধ ও গান্ধীর দেশ, শান্তির দেশ ভারত এর প্রতিবাদে সামিল হয়ে ছিল এবং তা বহু ভারতীয়কে নাড়া দিয়ে ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও জওহরলাল নেহেরু স্পেনের গৃহযুদ্ধে পপুলার ফ্রন্টকে সমর্থন জানিয়ে ছিল। কিন্তু পপুলার ফ্রন্টের পতন হয়। জেনারেল ফ্রোঙ্কো ক্ষমতা দখন করে।

Advertisement

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্পেনে দক্ষিণপন্থী রাজতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের বিরোধ দেখা দেয়। রাজা আলফোনসো জমিদার শ্রেণী ও সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করে। কিন্তু ১৯৩১ সালে প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীরা নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে। ২৩ বছর বয়স্ক সকল স্প্যানিশ নরনারী ভোটাধিকার পায়। চার বছর অন্তর সাধারণ নির্বাচন দ্বারা পার্লামেন্ট গঠনের বিধান দেওয়া হয়। এই নবজাত প্রজাতন্ত্র বহু বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয়। প্রজাতন্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রপতি জামোরা ও প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল অজানার নেতৃত্বে নানাবিধ প্রগতিশীল গনতান্ত্রিক সংস্কার প্রবর্তন করে। ১৯৩৫ সালে সাধারণ নির্বাচনের ফলে পার্লামেন্টে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীদের প্রাধান্য বাড়লে, প্রজাতন্ত্রী সরকার কৃষকদের জমির অধিকার দেয় এবং গীর্জা প্রভৃতির জাতীয়করণ করে। স্পেন থেকে জেসুইট ও ফ্যাসিবাদীদের বহিষ্কার করা হয়। যে সকল সরকারি কর্মচারী ফ্যাসিবাদী মনোভাবের অনুরাগী ছিল তাদের নির্বাসিত করা হয়। জেনারেল ফ্রাঙ্কো ক্যানারি দ্বীপে নির্বাসিত হন।

Advertisement

প্রজাতান্ত্রী সরকারের সমাজবাদী নীতিতে অখুসী হয়ে দক্ষিণপন্থীরা এই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। স্পেনের শ্রমিক ও কৃষকরা যারা প্রজাতন্ত্রের সমর্থনে ভোট দেয় তারাও প্রজাতন্ত্রী সরকারের ধীর গতি সংস্কারে বিরক্ত হয়। স্পেনের উপনিবেশ মরক্কোয় অবস্থিত স্পেনীয় সৈন্যদল পপুলার ফ্রন্ট বা প্রজাতন্ত্রীক প্রধানমন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধ্বজা তুলে। জেনারেল ফ্রাঙ্কো ক্যানারি দ্বীপ থেকে চলে আসেন এবং বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। তিনিও একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার ঘোষণা করেন। প্রজাতন্ত্রী সরকারের পক্ষে ছিল বামপন্থীরা, কিছু স্বেচ্ছাসেবক ও শ্রমিক সেনা। ইতিমধ্যে জার্মানী ও ইতালি ফ্রঙ্কো সরকারকে সমর্থন দেয়। ফলে স্পেনে গৃহযুদ্ধ (১৯৩৬-১৯৩৯) শুরু হয়ে যায়। প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রধান ম্যানুয়েল অজানার পতন ঘটে এবং ফ্যাসিস্ট নেতা জেনারেল ফ্রাঙ্কো জয়লাভ করে হিটলার ও মুসলিনির সহযোগিতায়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও স্পেনের গৃহযুদ্ধের বিরোধীতা শুরু হয়ে ছিল। ভারতের পক্ষ থেকে নেহরুর উদ্যোগে স্পেনে ফ্যাসিস্ট বিরোধী সংগ্রামীদের ওষুধপত্র সহ অন্যান্য সাহায্য পাঠানো হয়। তিনি ঘোষণা করেন আজ স্পেনে আমাদেরই লড়াই চলছে। আমরা শুধুমাত্র বাইরে থেকে বন্ধুত্ব মূলক সহানুভূতি নিয়ে এই সংগ্রামকে দেখছি না, এই লড়াইয়ে যুক্তদের দেখছি বেদনাদায়ক উৎকণ্ঠা নিয়ে। জওহরলাল নেহরু তাঁর আত্মচরিতে লিখেছেন ‘চিন, আবিসিনিয়া, প্যালেষ্টাইন এবং স্পেনের জনসাধারণের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করিবার জন্য কংগ্রেস কর্তৃক অনুষ্ঠিত সহস্র সহস্র সভা ও শোভাযাত্রা জনসাধারণের আগ্রহকে উদ্দীপ্ত রাখিল। চিনে ও স্পেনে খাদ্য ও ঔষধ পাঠাইবার জন্য আমার কিছু চেষ্টা করিলাম। আন্তর্জাতিক ব্যাপারে এই উদার আগ্রহ আমাদের জাতীয় সংঘর্ষকে উচ্চতর স্তরে লইয়া গেল এবং জাতীয়তাবাদের স্বাভাবিক লক্ষণ সঙ্কির্ণতা কতকাংশে শিথিল হইল’। তিনি ইউরোপ ও ব্রিটেনে স্পেনের গৃহযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করেন এবং লণ্ডনে এক বিশাল সমাবেশে ভাষণ দেন। জাতিসংঘের ভূমিকারও তিনি সমালোচনা করেন। ১৯৩৮ সালের গ্রীষ্মে জওহরলাল ও কৃষ্ণ মেনন স্পেনে যান এবং সেখানে ট্রাফালগার স্কোয়ারে পাঁচ হাজার মানুষের সভায় ভাষণ দেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও স্পেনের গনতান্ত্রিক সরকারের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি দেখিয়ে ছিলেন। ‘মানবতার বিবেকের প্রতি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘স্পেনে, বিশ্ব সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে এবং পদদলিত করা হচ্ছে। স্পেনীয় জনগণের গনতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে, ফ্রাঙ্কো বিদ্রোহের মানদণ্ড উঁচু করে তুলেছেন। আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ বিদ্রোহীদের সাহায্যে মানুষ এবং অর্থ ঢেলে দিচ্ছে— আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদের ধ্বংসাত্মক জোয়ার অবশ্যই ঠেকাতে হবে— স্পেনীয় জনগণের এই চরম পরীক্ষা এবং যন্ত্রণায় মুহুর্তে, আমি মানবতার বিবেকের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। স্পেনের জনগণের ফ্রন্টকে সাহায্য করুণ, জনগণের সরকারকে সাহায্য করুন, লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে চিৎকার করুন ‘থামুন’!— গনতন্ত্রের সাহায্যে, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সহায়তায় লক্ষ লক্ষ মানুষ এগিয়ে আসুন’।

রবীন্দ্রনাথের আলমোড়ায় লিখিত (মে ১৯৩৭) ‘চলতি ছবি’ কবিতা (সেঁজুতি) এই স্পেনীয় যুদ্ধের কথা শোনা যায়— যুদ্ধ লাগল স্পেনে,
চলছে দারুণ ভ্রাতৃহত্যা শতঘ্নীবাণ হেনে।
সংবাদ তার মুখর হল দেশ মহাদেশ জুড়ে,
সংবাদ তার বেড়ায় উড়ে উড়ে
দিক দিকে যন্ত্রগরুড় রথে
উদয়রবির পথ পেরিয়ে অস্তরবির পথে।

এই সময়ে সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে League against Fascism awd War নামে একটি সংঘ গঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথকে এর সভাপতি করা হয়। সম্পাদক হন সৌম্যেন্দ্রনাথ। অন্যান্য সদস্য ছিলেন সাজ্জাদ জাহীর, জওহরলাল নেহরু, ডাংগে, কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়, জয়প্রকাশ নারায়ণ, রঙ্গ প্রভৃতি। তরুণ লেখক মূলকরাজ আনন্দ যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক বছর আগে ১৯৩৫ সালে মাদ্রিদে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব লেখক কংগ্রেসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে ছিলেন। স্পেনেই তিনি তার উপন্যাস ‘অক্রস দ্য ব্লাকওয়ার্টস’ রচনা করেন। পরে ১৯৩৮ সালে তিনি ভারতের ফিরে আসেন। কলকাতা দ্বিতীয় অল ইণ্ডিয়া প্রগ্রেসিভ রাইর্টাস অ্যাসোসিয়েশন (AIPWA) এর এক ভাষণে তিনি তাঁর স্পেনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন এবং লেখকদের অন্যায় ও শোষণ প্রকাশের জন্য তাদের নৈপুন্য ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। মার্কসবাদী তেলেগু কবি শ্রীরঙ্গম শ্রীনিবাস রাও স্পেনের প্রজাতন্ত্রী সৈন্যদের সম্মানে তাঁর প্রথম কবিতা ‘জয়ভেরী’ লিখেছিলেন। ইংল্যান্ডে বসবাসকারী বহু ভারতীয় স্পেনের প্রজাতন্ত্রীদের পক্ষে আন্দোলনে অবতীর্ণ হন। ‘ভারত স্পেন কমিটির’ উদ্যোগে ১৯৩৭ সালে ১২ মার্চ লন্ডনে ‘স্প্যানিস প্রজাতান্ত্রিক তহবিল’ গঠন করা হয় এই উপলক্ষে ‘স্প্যানিশ ইণ্ডিয়ান সান্ধ্য নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে সেরি সাকাওয়ালা মীরা দেবী নামে ভারতীয় ধ্রুপদি নৃত্যশিল্পী ও স্পেনের জাতীয় নৃত্যশিল্পী অ্যাণ্ড্রী ইভা। শান্তা গান্ধী, অর্কেস্ট্রা বাদক-এ ভট্টাচার্য ও ঘোষিকা বেবী ভট্টাচার্য ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী, কৃষ্ণ মেনন ওই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্পেনীয় প্রজাতন্ত্রের তহবিল বৃদ্ধির জন্য ইন্দিরা গান্ধী ‘ভারত স্পেন কমিটি’-কে নানাভাবে সাহায্য করে ছিলেন। তিনি তাঁর ৫০ পাউণ্ড মূল্যের ব্রেসলেটটি ওই তহবিলে উন্নতি কল্পে দান করে ছিলেন। স্পেনের বার্সেলোনা থেকে সংবাদিক কৃষ্ণ মেনন স্পেনের নানা ঘটনার কথা ৫০টি সংবাদপত্রে লিখেছেন। তিনি ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনগুলির সঙ্গে সহযোগিতা করে প্রধানমন্ত্রী চেম্বার লেইননের তোষণ নীতির বিরুদ্ধে সভা এবং প্রতিবাদ মিছিল করেন। সমর্থন করেন প্রজাতন্ত্রের লক্ষ্যকে। এই ‘স্প্যানিশ ইণ্ডিয়া কমিটি’ ভারত ও শ্রীলঙ্কার গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স দান করে লেন। ১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে লণ্ডনে ‘ইন্ডিয়া লীগ’ অনুষ্ঠিত এক সভায় গান্ধীজি ও জওহরলালের ছবি-সহ প্রজাতন্ত্রী স্পেনের পক্ষে বিক্ষভ দেখানো হয়। গান্ধীজিও স্পেনের প্রধানমন্ত্রীকে এক বার্তায় জানান, আমার সমগ্র হৃদয়ের সহানুভূতি আপনাদের দিকে, আপনাদের নিদারুণ উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার পরিণামে প্রকৃত স্বাধীনতা আসুক। ভারতীয় ছাত্ররাও স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না। নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের ডাকে ‘স্পেন দিবস’ পালিত হয়। লাহোর ছাত্র ইউনিয়ন ‘স্পেন সংহতি সপ্তাহ’ উদযাপন করে (মে, ১৯৩৬)। সপ্তাহ জুড়ে স্কুল, কলেজে, স্পেনে যুদ্ধরতদের সমর্থনে বক্তৃতামালার আয়োজন করা হয়।

রিপাবলিকানরা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ একটি প্রজন্মকে ফ্যাসিবাদী প্রতিরোধে অনুপ্রাণিত করেছিল। স্পেনে সংঘাতের অভিজ্ঞতাগুলি মাত্র এক দশক পরেই স্বাধীন ভারতের কল্পনাকে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে ছিল। স্পেনে ফ্যাসিস্ট শক্তির জয় হলেও ভারতে প্রগতিশীল শক্তি যেভাবে স্পেনের গণতন্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তা বিশ্ববাসীর কাছে এক নজির স্থাপন করেছিল।

Advertisement