ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এই মুহূর্তে কার্যত তলানিতে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি যাদের যুক্ত করে রেখেছিল, সেই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র আজ এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যা কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয়— ভবিষ্যতের জন্যও গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক হামলা, মন্দির ভাঙচুর, সম্পত্তি দখল এবং সামাজিক নিপীড়নের যে খবর সামনে এসেছে, তা যে কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যই লজ্জার। এই ঘটনাগুলির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাব ভারতীয় জনমনে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি করেছে। কিন্তু এই ক্ষোভ ক্রমে যেভাবে সামগ্রিক বাংলাদেশ-বিরোধিতায় রূপ নিচ্ছে, সেটিও কম বিপজ্জনক নয়।
Advertisement
পরিস্থিতির মোড় ঘুরেছে মূলত শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ভারতের এই সিদ্ধান্তকে ঢাকায় একাংশ সরাসরি ‘হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখছে। সেই ধারণা থেকেই তীব্র ভারত-বিদ্বেষ ক্রমশ রাষ্ট্রীয় স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তারই ফলশ্রুতি, ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও উপদূতাবাস কার্যত বন্ধ, ভারতীয় পর্যটকদের জন্য ভিসা স্থগিত এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রায় স্তব্ধ।
Advertisement
কূটনীতিতে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের এই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা কোনও সমস্যার সমাধান করে না— বরং ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনাকেই পুষ্ট করে। দুই দেশের সীমান্তে কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে সম্পর্ক ছিন্ন করার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের উপরই আঘাত হানে।
ভারতের দিকেও পরিস্থিতি মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা কখনও কখনও অযৌক্তিক ও আত্মঘাতী রূপ নিচ্ছে। শাহরুখ খানের মালিকানাধীন কেকেআর দলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে নেওয়ার সম্ভাবনায় তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়া— এই উগ্র জাতীয়তাবাদের নিদর্শন। খেলাধুলোকেও যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা হয়, সেখানে যুক্তিবোধের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়। শেষ পর্যন্ত মুস্তাফিজুরকে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত যে কেবল ক্রিকেটীয় নয়, রাজনৈতিক চাপের ফল— সে কথাও অস্বীকার করা কঠিন।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভারতে না আসার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও বিষিয়ে তুলেছে। খেলাধুলা যেখানে বহু দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যের সেতু হিসেবে কাজ করেছে, সেখানেও যদি অবিশ্বাস ও বয়কটের রাজনীতি ঢুকে পড়ে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রইল কী?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই টানাপোড়েনের মাঝে উভয় দেশেই সংখ্যালঘু ও সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে হিন্দুরা যেমন অনিরাপদ, তেমনই ভারতের সাধারণ বাঙালি মুসলমানদের প্রতিও বিদ্বেষ বাড়ছে। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে রক্ষা করা—প্রতিশোধের রাজনীতি উসকে দেওয়া নয়।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনও সাধারণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, শরণার্থী গ্রহণ, ভাষা ও সংস্কৃতির অদ্ভুত মিল— এই সম্পর্ক আবেগের, ইতিহাসের। সেই সম্পর্ককে যদি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের জন্য ভেঙে ফেলা হয়, তবে ক্ষতি দু’দেশেরই। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্কের কিছুটা হলেও উন্নতি হবে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু তা দেখা গেল না।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন সংযম, সংলাপ এবং দায়িত্বশীল কূটনীতি। ভারতকে যেমন স্পষ্ট ভাষায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রশ্ন তুলতে হবে, তেমনই বাংলাদেশকেও বুঝতে হবে— ভারত-বিরোধিতা দিয়ে অভ্যন্তরীণ সংকট ঢেকে রাখা যায় না। প্রতিবেশীকে শত্রু বানিয়ে কোনও দেশই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকতে পারে না।
দুই দেশের সম্পর্ক এই অন্ধকার গলি থেকে বেরোবে কি না, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই সম্পর্ক ভাঙার বিলাসিতা ভারত ও বাংলাদেশ—কেউই বহন করতে পারবে না।
Advertisement



