মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মহল ও শিল্প সংগঠন। বিশেষ করে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি, জ্বালানি আমদানি এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড়সড় চাপে পড়তে পারে বলে উঠে এসেছে এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানি করা পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহ শৃঙ্খলেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।
Advertisement
বাংলাদেশ কনটেনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ জানিয়েছেন, ‘ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব সময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। কারণ আমরা একটি আমদানিনির্ভর দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অস্থির হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের পরিবহণ ও বাণিজ্যে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার এবং অর্থপ্রদানের ভারসাম্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। কারণ বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি আমদানির উৎস মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল।
Advertisement
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ সুয়েজ খালের ভৌগোলিক অবস্থান ইরানের কাছাকাছি হওয়ায় ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পরিবহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, যা দেশের রপ্তানির প্রধান স্তম্ভ। বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির প্রধান মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের ব্যয় কমে যেতে পারে। এর ফলে পোশাকের মতো অপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, ডেল্টা এলপিজি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক সতর্ক করে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়াবে এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।’ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবর্ষে বাংলাদেশ ইরানের প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বাজারে প্রায় ১০.৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে পোশাক এবং ওষুধ প্রধান। ফলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
এদিকে, সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইজরায়েলি ঘাঁটিতে নতুন হামলার ঘোষণা করেছে। এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অতীতের মতোই স্বল্পমেয়াদি সংঘাতও জ্বালানির দাম এবং সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
Advertisement



