• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 29 August, 2026

নেপালের বন্যার অভিঘাত সুদূর ব্রহ্মপুত্রেও

তিব্বতের অত্যন্ত ভঙ্গুর হিমালয় অঞ্চলে চিন একের পর এক সামরিকীকৃত কংক্রিটের গ্রাম ও শহর গড়ে তুলছে

নেপালের বন্যার অভিঘাত সুদূর ব্রহ্মপুত্রেও

Image: IANS

তিব্বতে ভয়াবহ হিমবাহধসের ফলে বিপুল জল ও কাদার স্রোত নেমে এসে প্রতিবেশী নেপালের ভোটেকোশী নদীর সরু গিরিখাতগুলিকে ডুবিয়ে দিয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা হিমালয়ের ‘ছাদ’ বলে পরিচিত তিব্বতে চিনের নির্মাণ ও বাঁধ তৈরির কর্মকাণ্ডের দিকে নতুন করে নজর ঘুরিয়ে দিয়েছে।
অত্যন্ত ভঙ্গুর হিমালয় অঞ্চলে নির্বিচারে নির্মাণকাজের ফলে মাটি ক্ষয় হতে পারে, ভূমিকম্প ও ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়তে পারে এবং তার সূত্র ধরে একের পর এক পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।
হিমবাহ ভেঙে পড়া থেকে তুষারধস— এ ধরনের ঘটনা শেষ পর্যন্ত নীচের দিকে প্রবল বন্যা ও ধ্বংসের স্রোত বয়ে আনতে পারে। তিব্বতের অত্যন্ত ভঙ্গুর হিমালয় অঞ্চলে চিন একের পর এক সামরিকীকৃত কংক্রিটের গ্রাম ও শহর গড়ে তুলছে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি, সংযোগকারী সড়ক এবং সামরিক বিমানবন্দর। উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়া অসংখ্য তথ্যপ্রমাণেও এই নির্মাণকাজের ছবি স্পষ্ট হয়েছে।

গত বছর চিন ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তের কাছে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর প্রায় ১৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা। এটি হবে বিশ্বের বৃহত্তম একক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।কিন্তু কোনও দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে এই বাঁধ নীচের দিকে যে বিপুল বিপদ ডেকে আনতে পারে, সে বিষয়ে নদীর জল যে সব অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাদের প্রত্যেকেরই সতর্ক থাকা দরকার।

আরও পড়ুন: নেপালে মৃত বেড়ে ৬১৬, নিখোঁজ প্রায় ১৯২৪, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ৩২০ ভারতীয়র সঙ্গেইয়ারলুং সাংপো নদী অরুণাচল প্রদেশের গেলিং অঞ্চলে এসে সিয়াং নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রবাহিত হয়। পরে আরও কয়েকটি নদীর জলধারা তার সঙ্গে মিশে অসমে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়। হিমালয়ের সমগ্র অঞ্চলই ভূমিকম্পের দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যালটেক এবং ইসরোর বিজ্ঞানীরা প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হিমালয় পর্বতশ্রেণির চারটি নির্দিষ্ট অংশ চিহ্নিত করেছেন, যেখানে ভূগর্ভে ভূকম্পনজনিত বিপুল চাপ জমা হচ্ছে। সেই চাপ থেকে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে।

উচ্চ হিমালয়ে এই বিপুল নির্মাণকাজের ফলে যদি কোনও বড় ভূমিকম্প ঘটে, তা হলে তার পরিণতি হতে পারে একের পর এক বিপর্যয়ের শৃঙ্খল। এমন একটি ভূকম্পন বাঁধের ওপর বিপর্যয় ডেকে এনে শেষ পর্যন্ত বাঁধ ভেঙে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। আর তার অভিঘাত নেমে আসতে পারে ভারতের অসম ও অরুণাচল প্রদেশ হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত—অর্থাৎ নিম্ন অববাহিকার দেশগুলিতে তার প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ।

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা এমনিতেই বিপুল পলি বহন, নদীর খাড়া ঢাল এবং নিজস্ব ভূমিকম্পপ্রবণতার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর সঙ্গে যদি উজানে অবস্থিত কোনও বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বা বাঁধের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে আকস্মিক বন্যার জল নেমে আসে, তা হলে অসম, অরুণাচল প্রদেশ এবং আরও নীচের দিকে বাংলাদেশের বিপন্নতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুন: নেপালের উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে ভারত, চাপে পড়ে আন্তর্জাতিক সাহায্য নিতে রাজি নেপালচলতি বছরের গোড়ায় প্রকাশিত South China Morning Post-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি একটি ভূমিকম্পপ্রবণ ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত বলে চিনের নিজস্ব ভূতত্ত্ববিদরাই সতর্ক করেছেন। চিনের ভাষায় প্রকাশিত Sedimentary Geology and Tethyan Geology জার্নালেও প্রকৌশলীদের ভূমিধস এবং পাহাড়ধসে কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরও কয়েকজন গবেষক ‘রিজার্ভয়ার-ট্রিগার্ড সিসমিসিটি’ বা জলাধার-সৃষ্ট ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ, বিশাল জলাধারে জমা জলের বিপুল ওজন নিজেই ভূগর্ভের ফল্ট বা চ্যুতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং তার ফলে ভূমিকম্পের সূত্রপাত হতে পারে।

ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য, “বাঁধ ভেঙে না পড়লেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর প্রবাহের একটি বড় অংশের ওপর চিন উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে। পরবর্তী সময়ে জলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

ভারতের জন্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে আরেকটি বিষয়। তিব্বত থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো-সহ অন্যান্য নদীর জলপ্রবাহ সম্পর্কিত তথ্য চিন নিম্ন অববাহিকার দেশগুলির সঙ্গে ভাগ করে নেয়নি। এই দেশগুলির মধ্যে রয়েছে ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশ। এমনকি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বাংলাদেশও এই তথ্য থেকে বঞ্চিত।

ফলে নেপালের এই ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহধসকে নিছক একটি স্থানীয় বিপর্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হিমালয়ের উজানে প্রকৃতির কোনও বড় পরিবর্তন কিংবা মানুষের নির্মাণকাজের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় নদীর প্রবাহপথ ধরে বহু দূরের অঞ্চলকে প্রভাবিত করতে পারে। নেপালের বন্যার অভিঘাত তাই সুদূর ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই সম্ভাবনাই ভারত, বাংলাদেশ এবং গোটা নিম্ন হিমালয় অঞ্চলের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।